প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ হতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণবাবদ অঢেল অর্থ গচ্চা জার্মানিকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। এটি বিশের দশকের মাঝামাঝির ঠিক আগে আগে ১৯২৩ সালের দিকে। অসম্ভব উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেতে পেতে আকাশ ছুঁয়েছে। ১৯২৩ সালে মাত্র দশ মাসের ব্যবধানে একটা ব্রেডের দাম ১৬৫ মার্কস হতে বেড়ে এক বিলিয়ন হয়েছিল। মুহুর্তের মধ্যে অঠেল সম্পদের মূল্য একেবারে কানাকড়িতে এসে ঠেকল। লক্ষ লক্ষ জার্মান কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়লো। সামাজিক আর রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। সুযোগ বুঝে ফ্রান্স আর বেলজিয়াম দখল করে নিল জার্মানির সবচেয়ে শিল্পায়িত অঞ্চল রুহর (Ruhr)। ভাইমার গভার্নমেন্টের ত্রাহি অবস্থা। এটি প্রায় পতনের দ্বারপ্রান্তে। হিটলার এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করতে থাকলেন। 

কৈশোরে ভিয়েনা হতে তিনি শিখেছিলেন সহিংসতাই সর্বোত্তম পন্থা। প্রতিশোধপরায়ণতা আর কঠোরতায় বিশ্বাসী হিটলার জার্মানিকে পুনরায় মহান জাতিতে পরিণত করার অভিপ্রায়ে গণতন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাবার রাস্তায় না হেঁটে বিপ্লবের পথে হাঁটলেন। অস্ত্রের মুখে ক্ষমতাশালীদের হটিয়ে ক্ষমতা দখলের দুঃসাহসী পদক্ষেপ নিতে থাকলেন। ১৯২১ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রায় তিনশ সৈন্য নিয়ে তিনি গঠন করলেন এস এ(জার্মানঃ Sturmabteilung, আর ইংরেজিঃ Storm Section) প্যারামিলিটারি বাহিনী। এই বাহিনীর কাজ ছিল বহুমাত্রিক। প্রথমত, দলীয় জনসভার নিরাপত্তাপ্রদান, বিক্ষোভের সময় ভাংচুর ও সহিংসতা, বিরোধীমতের রাজনৈতিক জনসভা ভণ্ডুল করা, বিশেষ করে কমিউনিস্ট ও ইহুদিদের যেকোন জমায়েতে উপস্থিত হয়ে গোলমাল বাধানো, মারামারি ইত্যাদি ছিল এই বাহিনীর মূল কাজ। বিশের দশকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিটলারকে রাজপথ হতে ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বাহিনীর ভূমিকা অপরিসীম। এই এস এ বাহিনীকে নিয়েই হিটলার ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করলেন। এক্ষেত্রে তিনি প্রেরণা হিসেবে নিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিপক্ষ শক্তি ইতালির  ক্ষমতা দখলকারী মুসোলিনীকে। 

ইউরোপের দুই স্বৈরশাসক। কিংডম অব ইতালির বেনিতো মুসোলিনী ও জার্মানির চ্যান্সেলর হিটলার

ইউরোপের সবচেয়ে সফল ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিতো মুসোলিনী ব্যাপক জনসমর্থন ও প্রায় তিরিশ হাজার সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে রাজধানী রোমের দিকে মার্চ করতে করতে ক্ষমতা দখল করেছিল ১৯২২ সালের অক্টোবরে। হিটলার ও তার সহচরেরা এই ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে একই পন্থায় আপাতত ব্যাভারিয়া রাজ্যের ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করলেন। তারা ভাবলেন এর মাধ্যমে পুরো জার্মানিকেই একটা বার্তা প্রেরণ করা যাবে যে, নাৎসি বাহিনীই জার্মানির ভবিষ্যৎ আর এটি শীঘ্রই পুরো জার্মানিকে শাসন করতে এগিয়ে আসছে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। মুসোলিনী ছিলেন ব্যাপক পরিচিত আর জনগণ দ্বারা সমর্থিত স্বৈরশাসক। কিন্তু মিউনিখের বাইরে হিটলারের তেমন পরিচিতি নেই বললেই চলে। বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করতে পারলেও হিটলারকে জনগণ মেনে নিতে নাও পারে। একারণে প্রয়োজন এমন এক পরিচিত মুখপাত্রের, বিপ্লবপরবর্তী সময়ে যিনি ব্যাভারিয়া রাজ্যের প্রধান হবেন এবং যাকে মানুষ শ্রদ্ধা করবে। পরিশেষে যার মাধ্যমে নাৎসি দলের রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়ন করা যাবে। তারা বেছে নিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেনানায়ক জেনারেল এরিখ লুডেনডর্ফকে যিনি একাধারে এক সফল কমান্ডারই ছিলেন না, জার্মান জনগণের মাঝে তিনি ছিলেন সম্মানিত ও পরিচিত ব্যক্তিত্ব। 

নভেম্বর ১৯২৩, হারম্যান গোরিং এর নেতৃত্বে উগ্র ডানপন্থীদের প্যারামিলিটারি ট্রূপ এসএ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা তখন ১৪৩০৩ জন। হিটলার ও আশেপাশের সঙ্গীরা প্রস্তুত। যখন তারা শুনলেন নভেম্বরের ৮ তারিখের সন্ধ্যায় ব্যাভারিয়ান রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী গুস্তাভ কার সকল ব্যবসায়ীদের নিয়ে মিউনিখের বিয়ার হলে মিটিং ডেকেছেন, তখনই হিটলার তার বাহিনী নিয়ে ছদ্মবেশে সেই বিয়ার হলে ঢুকে পড়ে। অস্ত্রের মুখে গুস্তাভ কার তাদের বিপ্লবকে সমর্থন দিবে বলে অঙ্গীকার করে। ব্যাভারিয়া রাজ্যের পুলিশ প্রধান ও সেনাপ্রধানও হিটলারের বিপ্লবকে সমর্থন করতে বাধ্য হয়। আগে থেকে প্রস্তুত চিত্রনাট্য অনুযায়ী এসময় সেখানে হাজির হয় লুডেনডর্ফ যিনি হিটলারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন রাজ্যের প্রধান হবেন। গুস্তাভ কার লুডেনডর্ফের কাছে ওয়াদা করেন যে পরদিন কোন ঝামেলা ছাড়াই তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। আপাতত দৃষ্টিতে বিপ্লবের সফল সমাপ্তি হল।

ঠিক এসময়টায় ওই মিউনিখ শহরেই কোন এক বারে মদ্যপানরত ডিত্রিক একার্ট, যিনি নাৎসি দলের প্রতিষ্ঠাতা, হিটলারের রাজনৈতিক গুরু এবং হিটলারকে যিনি তিলে তিলে তৈরি করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে হিটলারের কারণেই তিনি দলচ্যুত হন এবং ক্ষমতাহীন একাকী জীবনে হতাশা আর ব্যর্থতায় নিমজ্জিত হয়ে মদের কাছে নিজেকে সমর্পিত করেন। তিনি জানতে পারলেন হিটলার একটি সফল বিপ্লব করতে সক্ষম হয়েছে এবং গুস্তাভ কার লুডেনডর্ফের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে। সবাই গুস্তাভ কারকে বিশ্বাস করলে দূর হতে  ডিত্রিক একার্ট তাকে বিশ্বাস করতে পারলেন না এবং নাৎসি বাহিনীর আসন্ন বিপর্যয় যেন তিনি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেলেন। পরদিন ভোর বেলা তিনি দলের হেডকোয়ার্টারে গেলেন সবার সাথে দেখা করে সবাইকে সতর্ক করতে। কিন্তু ডিত্রিক একার্টকে কেউ পাত্তাও দিল না।  


বিয়ার হলে  লুডেনডর্ফ ও হিটলারের কাছে পরদিন ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকার করে ফিরেই গুস্তাভ কার পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে সে রাতেই প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এটি শুনে হিটলার ও তার দল হতবাক হয়ে পড়ে। নিজেদের তারা প্রতারিত মনে করতে থাকে। সুর্য উঠার সাথে সাথে লুডেনডর্ফ ও হিটলার প্রায় তিন হাজার সমর্থক নিয়ে মিউনিখের রাস্তায় মিছিল বের করলেন। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে ১৬ জন নাৎসি আর ৩ জন পুলিশ নিহত হয়। ডিত্রিক একার্ট সামান্য দূর হতে দাঁড়িয়ে তারই গড়া দলের বিপর্যয় নিজ চোখে দেখলেন। সবাই আহত, গুলিবিদ্ধ। আগের রাতের সফল বিপ্লব পরদিন সকালে বিদ্ধ্বস্তরুপে বেহাত হয়ে গেল।  

এস এ বাহিনীর প্রধান গোরিং ও রুডলফ হেস মারাত্মক আহত হয়ে অস্ট্রিয়া পাড়ি জমান, হাইনরিশ হিমলার যিনি ছিলেন হিটলারের দলের সবচেয়ে শিক্ষিত ভদ্র মৃদুভাষী ও কিছুটা অপরিচিত তরুণ নেতা পালিয়ে গেলেন মায়ের কাছে, যিনি পরবর্তীতে আবির্ভুত হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ঠাণ্ডা মাথার গনহত্যাকারী হিসেবে, আর্নস্ট রোম ও হিটলার গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলেন। বিচারে হিটলারের পাঁচ বছরের সাজা হল। 

বিধ্বস্ত পরাজিত খণ্ড বিখন্ড নাৎসি দলের প্রথম বিপ্লবের চেষ্টা এভাবেই অঙ্কুরেই থেমে গেল। ওই অবস্থায় ওই সময় কারো পক্ষেই সামান্য অনুমান করাও সম্ভব ছিল না যে এরা সবাই, একেবারে সবাই মিলে একদিন রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করবে, এবং তা জার্মান জনগণের পূর্ণ সমর্থন নিয়েই।  জেলে বসে হিটলার সেই দীক্ষাই যেন নিলেন। গনতন্ত্রকে হত্যা করে একটি মনোলিথিক (monolithic) রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সেটা গণতান্ত্রিক পন্থায়ই করতে হবে। 

 
ডিত্রিক একার্ট, যিনি নিজ হাতে গড়া দলের নির্মম পরাজয় পরিলক্ষ করলেন, বিপ্লবের ছয় সপ্তাহ পর অতিরিক্ত মদ্যপানে তিনি মৃত্যুশয্যায়। দেহত্যাগ করার আগে তিনি বলেছিলেন, “তোমরা হিটলারকে অনুরসণ কর। সে সুরের তালে নৃত্য করবে, যে সুর আমিই তৈরি করেছিলাম। আমার জন্য শোক করোনা। জার্মানির ইতিহাসে আমার থেকে বেশি প্রভাব আর কারো থাকবে না।”

নাৎসি দলের চুর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া আর একার্টের মৃত্যুর মধ্যদিয়েই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে তেমন নয়। উগ্রবাদ পরম্পরার মাধ্যমে ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয়। এক্ষেত্রেও তাই হবে। আজকের এই বিপর্যয়ের মাত্র দশ বছরের মাথায়ই সেটি প্রমাণিত হবে নতুন জার্মানি গড়ার মাধ্যমে।  

ধন্যবাদান্তে
জাহিদ কবীর হিমন
বার্লিন থেকে
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯


আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুনঃ
পর্ব ১ঃ গ্লানি থেকে ঘৃণা
পর্ব ২ঃ অপমানের চুক্তি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জার্মান প্রবাসের এই ধারাবাহিক আয়োজন নিয়ে আপনার কোন মতামত বা পরামর্শ আমাদের জানাতে পারেন এখানেঃ [email protected]