করপোরেট অফিসের এটিকেট মেনে ফরমাল পোশাকে ফুলবাবু সেজে আসতে হয়। বিরাট অস্বস্তি নিয়ে সারা দিন গলায় ফাঁসের মতো টাই বেঁধে রাখি। টি-শার্ট, জিনসের আরাম জীবন থেকে নাই হয়ে গেছে একরকম। তার ওপর কাজের চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা অবস্থা। দম ফেলারও সময় মিলছে না। বাধ্য হয়ে লতার কাছ থেকে লুকিয়ে বাঁচিয়ে পালিয়ে চলা হচ্ছে এই মাসখানেক। মাঝে ওদিক থেকে বার কয়েক আগ্রহ দেখানো হলেও এদিক থেকে ‘হ্যাঁ, হু, আচ্ছা, দেখি’ করে পাশ কাটানো হয়েছে। আর ছুটির দিনে লতা ইদানীং বাড়ি চলে যায় মায়ের কাছে। তাই হাজার ইচ্ছে থাকলেও ব্যাটে-বলে মিলছে না।

এভাবেই ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো নিজ থেকে উল্টে পাল্টে গিয়ে কখন যে ডিসেম্বরে এসে থামল, বুঝতেই পারিনি। কিন্তু একদিন সময় বের করতেই হলো। অনুরোধটা লতার ভাই ম্যাক্সিমিলিয়ানের। লতার ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। পায়ের রিপোর্ট দেখে কী একটা সিদ্ধান্ত জানাবার কথা। ম্যাক্সের খুব ইচ্ছা ছিল আসার। কিন্তু কাজে আটকে গেছে। আর খবরে সে পড়েছে, মিউনিখ শহর নাকি গলা বরফে ডুবে গেছে। কথা সত্য না। হাঁটু বরফ পড়েছে মাত্র কোথাও কোথাও। তবে ‘গ্লাট আইস’ মানে পিচ্ছিল বরফে ঢাকা পথঘাট এখন বেজায় বিপজ্জনক। ম্যাক্সের ভয়, লতা কোথাও ডিগবাজি খেয়ে উল্টে পড়ে গেলে আবার কী বিপদ হয়। তাই আমি যদি খুব ঝামেলা মনে না করি, তাহলে যেন লতার সঙ্গে যাই। এমনিতেই কাজের চাপে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। তাই সানন্দেই রাজি হয়ে গেলাম। অফিস থেকে একদিনের ছুটি নিয়ে নিলাম। আর লতা এই কয় মাসে চুল পেকে, দাঁত পড়ে কী রকম খিটখিটে বদরাগী বুড়ি হয়ে গেছে, সেটা দেখার ইচ্ছেটাও মনের ভেতর বড় হতে হতে তিমি মাছের আকার নিয়েছে।

কপাল এমন যে দিনটার শুরুই হলো হুলুস্থুল তুষারপাতের ভেতরে। ভারী টুপি, মাফলার আর ওভারকোটে মোরব্বা হয়ে ছাতা মাথায় রওনা হলাম লতার বাসার পথে। পৌঁছে কলিং বেল টিপে দুরুদুরু বুকে দাঁড়িয়ে আছি। এই মাইনাস সাতেও হাত ঘামছে। হতাশ করে দিয়ে দরজা খুললেন ফ্রাউ কেলনার। আর খুলেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে কী সব বলতে বলতে এই পাঁচ ফুটি ভদ্রমহিলা শূন্যে লাফিয়ে ছয় ফিট উঁচুতে টুপির আড়ালে লুকানো চুলগুলো হ্যাঁচকা টানে নামিয়ে এনে গালে চকাম্ করে চুমু খেয়ে ফেললেন। তারপর টালমাটাল আমি কোনোমতে সিধে হয়ে দাঁড়াবার আগেই শুরু হলো গালাগালের তুবড়ি। আমি নাকি একটা আলসের ডিপো আর কুলটুর (কালচার) না জানা ভূত। চেহারা রাসপুতিনের মতো হলে হবে কী, মনটা ঠিক রোমের নীরোর মতো পাথর। নইলে কেন এত দিনে তাকে একবারও দেখতে এলাম না। বাংলাদেশের ছেলেরা এমন ‘মিনসে’ টাইপ হতে পারে সেটা তার জানা ছিল না। জবাবে আমি বৃথাই কাজের দোহাই পাড়ছি আর অসহিষ্ণুর মতো খুঁজছি যেন কাউকে। কিন্তু সে কই?

‘অনীক!’ ডাক শুনে চেয়ে দেখি লতা। মুখ থেকে এক মুহূর্তের জন্য কথা হারিয়ে গেল। ফ্রাউ কেলনারের ড্রইংরুমটা আলো করে নেমে এসেছে কোনো আকাশের পরি। দিঘল সোনালি বেণি কাঁধ বেয়ে নেমে এসে লুটিয়ে পড়েছে টকটকে লাল কোটের ওপর। ঠোঁটে হালকা রঙের আভা। সবুজ চোখে গাঢ় কাজল। লাল-সোনালির-সবুজের অপূর্ব তরঙ্গে অভিভূত হয়ে পড়লাম। আকাশের পরিদের ক্রাচ থাকে না। আর এই পরিটা জগৎ–সংসারের সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। চোখ ফিরিয়ে নেয় সাধ্য কার। মুগ্ধতার অতলে, মনের গভীরে শুরু হলো আরেক তুষারপাত। ফ্রাউ কেলনারকে আজকে মারাত্মক সুন্দর লাগছে। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। সে কী রাসপুতিনের রানি হবে নাকি ইত্যাদি বলে বুড়ির মুখে হাসি ফুটিয়ে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। যাকে বলার, সেই সাহস নেই দেখে এই চালাকি।

লতাকে নিয়ে বরফ ঢাকা মসৃণ ফুটপাথ ধরে হাঁটছি খুব সাবধানে। আর দম ছাড়ছি তার থেকেও সাবধানে; পাছে লতা ধুকপুকানি শুনে ফেলে। চোরের মন পুলিশ পুলিশ। আবোলতাবোল ভাবার বেখেয়ালে পা হড়কে পিছলে পড়ার জোগাড় হলো। কিন্তু লতা খপ করে কোটের হাতা ধরে ফেলায় মাথাটা এ যাত্রায় চৌচির হওয়া থেকে বাঁচল। কে যে কাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে বোঝা মুশকিল। ম্যাক্স আর লোক পেল না।

বাস পাওয়া গেল না। স্টপেজের ডিজিটাল স্ক্রিনে একটা লাইনই ভেসে যাচ্ছে, ‘পরবর্তী বাসের সময়সূচি অনিশ্চিত…পরবর্তী বাসের সময়সূচি অনিশ্চিত…।’ লতা মাথা নেড়ে প্রস্তাব করল, ‘চল হেঁটেই যাই।’ রাজি হলাম না। কারণ পথ আসলেই ভীষণ পিচ্ছিল। খামোখা যেচে পড়ে বিপদ ডেকে আনার মানে হয় না। দুশ্চিন্তা ঘুচিয়ে পাঁচ মিনিটের মাথায় বাস চলে এল। হাজার দুর্যোগেও এ দেশে সব সচল। সময়ের হেরফের হয় বটে, এই যা।

বাসে চড়ে দেখি, ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট সে তরী’ অবস্থা। হরেক লোকের ভারে একেবারে গিয়েছে ভরি। ভিড় ঠেলে দেখি একটাই মাত্র আসন খালি। দ্রুত লতাকে বসিয়ে বাদুড়ঝোলা হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম। লতা কৃতজ্ঞতার হাসি ছুড়ে দিল। আমিও শূন্য থেকে হাসিটা মুঠোয় পুড়ে পকেটে রাখলাম। লতা দুষ্টুমি করে চোখ টিপি দিল। আমিও ভ্রু কুঁচকে মিথ্যে রাগ দেখালাম। এই নির্বাক খুনসুটিতে লতার পাশে বয়স্ক ভদ্রমহিলা রীতিমতো বিরক্ত মনে হলো। মারকুটে চাহনি স্পষ্ট বলে দিচ্ছে তার মনের কথা, ‘আমাদের মেয়েটার সঙ্গে এই হ্যাংলা ঢ্যাঙা বিদেশি ছেলেটা কী করছে? খুব ইটিশ-পিটিশ, অ্যাঁ?’ বুঝলাম, ব্রহ্মাস্ত্র বের করতে হবে। টুপি খুলে ফেললাম। মুক্তি পেয়ে কপাল ঢেকে নেমে এল অবাধ্য কালো চুল। এলোমেলো আঙুল চালিয়ে চুলগুলো শাসনে এনে ক্লিন শেভড গালে গভীর টোল ফেলে, যতখানি সম্ভব কিশোরীমোহন ভঙ্গিমায় হাসা যায়, তেমনি করে হাসলাম। আর সামান্য মাথা হেলিয়ে বললাম, ‘দুঃখিত, এই চুপ করছি আমরা।’ উত্তরে, বিরক্তি মুছে প্রচ্ছন্ন প্রশংসা খেলে গেল ভদ্রমহিলার চোখে। যাক বাবা, ব্রহ্মাস্ত্র কাজে দিয়েছে তাহলে। সব সময় দেয় না। কিন্তু আজকে দেখি এক ঢিলে দুই পাখি কুপোকাত। পাশের সিটে বসা লতা ক্রাচ ছেড়ে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছে। ধড়াম শব্দে ক্রাচ ছিটকে পায়ের কাছে পড়তেই আরক্ত মুখে সেটা তুলে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পুরো ব্যাপারটা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম।

জায়গামতো এসে বাস ছেড়ে নেমে পড়লাম। এরপর পাঁচ-সাত মিনিটের হাঁটা পথ। লতা টুক টুক করে কথা বলে যাচ্ছে। গভীর মনোযোগে শোনার ভান করে এই মানবীর পাশাপাশি চলছি। সে বলে যাচ্ছে, তাদের দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার বন্দোবস্ত সব হয়ে এসেছে। আজকে ডাক্তার যদি বলে দেয়, যে আর ক্রাচ লাগবে না, পা ঠিক হয়ে এসেছে, তাহলে সে বাসায় ফিরেই টিকিট কেটে ফেলবে। তারপর চট করে ক্রাচটা হাতে ধরিয়ে দুই কদম হেঁটে দেখাল, আসলেই ক্রাচের প্রয়োজন তার ফুরিয়েছে। আনন্দে হতবাক হয়ে গেলাম। লতার পা ভালো হয়ে গেছে তাহলে। এখন সে যেখানে ভালো লাগে ঘুরে আসুক। সেদিনের মতো আর রাগ লাগল না। বরং একটা হতবিহ্বল ভালো লাগা বুকের ডান থেকে দৌড়ে বামে হৃৎপিণ্ড বরাবর আছড়ে পড়ল।

ওয়েটিং রুমে কোট না খুলে বসে আছি। এদের হিটার বন্ধ নাকি। ঠান্ডা লাগছে। অনেক অপেক্ষার পর লতার ডাক পড়েছে। কিন্তু সেও কতকাল আগে। সেই যে ভেতরে ঢুকেছে, আর বেরোবার লক্ষণ নেই। নাকি সে আমাকে বসিয়ে রেখে পেছনের দরজা দিয়ে চম্পট দিয়েছে? ইতং বিতং ভাবছি। এমন সময়ে দরজা খুলে দুরদার করে বেরিয়ে এল লতা। ফরসা মুখটা লাল হয়ে গিয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে লিফটের কাছে পৌঁছে বোতাম টিপে দিয়েছে। তারপর মত পাল্টে ক্রাচে ভর দিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে সিঁড়ি ভেঙে নামতে থাকল। আমিও ছুটলাম পিছু পিছু। কিন্তু ঘাবড়ে গেছি। ঘটনা পুরো মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। থামতে বললেও এই জেদি মেয়ে শুনছে না। বাইরে এসে ধরে ফেলেছি লতাকে প্রায়, কিন্তু অসাবধানে বরফে পিছলে হোঁচট খেলাম। লতা সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করল না। ধাতস্থ হয়ে আবার লতাকে পাকড়াও করতে ছুটলাম। লতা বেহিসাবির মতো রাস্তা পার হচ্ছে। বিরক্ত লোকজন গাড়ি থেকে হর্ন চেপে মাথা বের করে গালি দিচ্ছে। আর না পেরে এবার চিৎকার করলাম, ‘শার্লট, থামো প্লিজ!’

নিজেও কয়েকটা গালাগাল খেয়ে ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে লতাকে ধরে ফেললাম। কোনো কিছুর পরোয়া না করে লতার কাঁধ দেয়ালে ঠেসে গর্জে উঠলাম, ‘এসব পাগলামির মানে কী, হ্যাঁ? মরার শখ জেগেছে খুব, না? যত্তসব নাটুকেপনা!’ লতা কোনো কিছু না বলে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। লম্বা একটা দম নিয়ে দেখি লতা চোখের সীমানায় টলমল সাগর আটকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টায় ঠোঁট কামড়ে রেখেছে। দপ করে আমার রাগ জল হয়ে গেল। কাঁধ ছেড়ে দিলাম। লতা অস্ফুট স্বরে যান্ত্রিক গলায় বলে গেল, ‘অনীক, আমি আর কোনো দিন হাঁটতে পারব না। ডাক্তার বলে দিয়েছে।’ তারপর ভেঙে ভেঙে আরও যা যা বলল, তার মানে দাঁড়ায়, হাঁটতে গেলে হাড়ে মারাত্মক চাপ পড়বে। জটিল অপারেশনও কাজে আসবে না। তখন বাকি জীবন হুইল চেয়ারে কাটাতে হবে। তাই যত সহজে এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া যায়, সেটাই মঙ্গল।

নিশ্চল আমি লতার এই কঠিন বাস্তবতার সামনে কী বলা উচিত ভেবে পেলাম না। লতার হাত দুটো ধরলাম আলতো করে। চমকে উঠলাম। বরফের মতো শীতল। এই প্রথম খেয়াল হলো, লতার গায়ে কোট নেই। সব সে ফেলে এসেছে তাড়াহুড়ায়। শীতে কাঁপছে মেয়েটা। নিজের ওভারকোট, মাফলার, টুপি খুলে পরিয়ে দিলাম জোর করে। লতা আর পারল না। অতলান্তিক মহাসাগর দুই চোখের কূল ছাপিয়ে উপচে পড়ছে। পেঁজা তুলোর মতো তুষারকণা তাতে মিশে বৃষ্টি হয়ে নামল ঝরঝরিয়ে। আঙ্গুলের ছোয়ায় সযত্নে মুছে দিলাম প্রতিটা মুক্তোদানা। কাছেই কোথাও বিকট শব্দে বাজ পড়ল। ভয়ে কেঁপে উঠল লতা। আর আমি? বুকের সমস্তটা উষ্ণতা দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম এই ব্যথাতুর মানবীকে। (চলবে)

ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানি।