অনেক দিন ধরেই লিখবো লিখবো ভাবছি। কিন্তু ব্যস্ততা, আলসেমি সবকিছু মিলে কেমন যেন আর লেখা হয় না। বাইরে বৃস্টি পড়ছে , হোম অফিস করছি বলে আজ অফিসেও যেতে হয়নি। ভীষণ অলস লাগছে, সারাদিন প্রোডাকটিভ কিছু করা হয়নি। তাই ভাবলাম আজ লেখাটা লিখেই ফেলি।

আড়াই বছর হতে চললো জার্মান জীবন যাপন। কেমন জার্মান জীবন? খুব একটা খারাপ না। তবে আগে থেকে কিছু প্রস্তুতি নিয়ে আসলে আরো ভালো থাকা সম্ভব। তো আজকের লেখার মূল বিষয় হলো, স্বপ্ন এবং বাস্তবতার পার্থক্য। সেই সাথে দেশ থেকে কি ধরণের প্রস্তুতি নিয়ে আসলে ভালো জীবন যাপন করা যাবে।

দেশে থাকতে যখন এই গ্রুপ আর ওয়েবসাইটের লেখা গুলো পড়তাম, সব কি রকম স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হতো। যেন একবার যেতে পারলেই সব সুখ ধরা দেবে হাতের মুঠোয়। স্বপ্ন ভাঙতে অবশ্য খুব বেশি সময় লাগেনি। বছর ঘুরতেই যখন ব্যাঙ্ক একাউন্ট প্রায় খালি হয়ে গেলো, পড়াশুনার লেভেল বুঝতে বুঝতেই যখন প্রায় সেমিস্টার শেষ হয়ে গেলো। স্বপ্নগুলো দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়ে যেন দুই গালে কোষে চড় লাগালো।

বাস্তব সত্য হলো পড়াশুনার পাশাপাশি কাজ করা বা ওড জব বলতে আমরা যা বুঝি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা মূলত রেস্টুরেন্টের কাজ। ম্যাকডোনাল্ডস, কেএফসি, বার্গার কিং এই ক্ষেত্রে আমাদের ত্রাণকর্তা বলা যায়। অবস্থা আরো খারাপ হবে যদি জার্মান ভাষা না জানেন। কাজ হিসাবে পাবেন হয়তো কোনো রেস্টুরেন্টের ধোয়া মোছার কাজ। বেপারটা যে খারাপ তা বলছি না। এই দেশে কাজ কে কাজ হিসাবে দেখা হয়। এটুকু শিখেছি কোনো কাজই ছোট না, কোনো কাজই অসম্মানের না। তারপরেও বাঙালি স্বভাব বলে কথা, একটু আত্মসম্মানে লাগে বৈকি। হাজার বছরের পুরোনো স্বভাব এক দিনে যাবার নয়।

তো পড়াশোনা, কাজ, রান্না-বান্না, ফাঁকা ব্যাঙ্ক একাউন্ট, ভিসা বাড়ানোর চিন্তা, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সব ছেড়ে আট হাজার কিলোমিটার দূরের এক দেশের কোনো ছোট ফ্ল্যাটের ছোট এক রুমে জীবন বেশ একাকী এবং কষ্ট সাদ্ধ।

আমি আপনাদের ডিমোটিভেটেড করছি না। বাস্তবতা বোঝানোর চেষ্টা করছি কারণ কিভাবে আপনারা এ থেকে মুক্তি পেতে পারেন তা বলাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।

প্রথম কথা জার্মান ভাষা শিখুন। দ্বিতীয়ত যতটা সময় আপনি এই দেশে আসার প্রস্তুতিতে ব্যয় করছেন, ততোটা সময় আসার পর কি করবেন তাতে ব্যয় করুন। একবার যাই তারপর সবকিছু দেখা যাবে, এই ভাবনা চিন্তা ত্যাগ করুন।

যেই সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশুনা করছেন সেই সম্পর্কিত কাজ করার চেষ্টা করুন। নিজে ছোট ছোট প্রজেক্ট করুন। যেই সাবজেক্ট চয়েস করছেন সেই সম্পর্কিত প্রফেসর রা কি কি কাজ করছে জানার চেষ্টা করুন।

যেই ইউনিভার্সিটি পছন্দ করছেন তাদের ওয়েবসাইট ভালো ভাবে চেক করুন, ইউনিভার্সিটিতে কাজ গুলোর বিবরণ দেয়া থাকে এবং কি কি যোগ্যতা লাগবে তাও দেয়া থাকে। এইখানে একটা বেপার হলো আপনাদের বেশির ভাগেরই ( আমি সহ ) এই সব কাজ করার মতো যোগ্যতা থাকে না। আর এটাই আসলে আমি বলতে চাইছি। আমরা আসার আগে এই সম্পর্কিত কোনো রকম প্রস্তুতি নিয়ে আসি না। একটু রিসার্চ করে নিজের একটা নির্দিষ্ট ফিল্ড পছন্দ করুন। এই বার যোগ্যতা গুলো অর্জনের পেছনে সময় ব্যয় করতে শুরু করুন।

আপনার সাবজেক্ট সম্পর্কিত স্টুডেন্ট জব এর জন্য de.indeed.com চেক করুন। যেই সব যোগ্যতা গুলা আপনার নেই , সেই গুলো নিজে নিজে অর্জনের চেষ্টা করুন। আশা করি আপনাদের জার্মান জীবন সুন্দর হবে।

আর একটা ব্যাপার হলো, অনেকেই রান্না – বান্না পারেন না। আপনি ছেলে হন বা মেয়ে, জেনে রাখবেন এই দেশে কাজের বুয়া নেই। অতএব রান্না – বান্না শিখে আসবেন। যদি ভাবেন ওখানে গিয়ে পড়াশুনা , রান্না – বান্না , কাজ সব একবারে শিখবেন তাহলে বাঁশ কত প্রকার ও কি কি উদাহরণ সহ বোঝার জন্য আর একটু জায়গা ব্রেন এ খালি রাখবেন দয়া করে ।

আর একটা তিতা সত্য হলো এই সব কিছুর চাপে দেশ থেকে রঙ্গিন স্বপ্ন নিয়ে আশা ছেলে – মেয়ের একটা বিশাল অংশ তাদের দুই বছরের মাস্টার্স কোর্স শেষ করতে ৪-৫ বছর লাগায়। কিছু অংশ পাশই করতে পারে না। অতএব সাধু সাবধান হও আগে থেকেই।

Jahid

Kiel University of Applied Science

Kiel, Germany