আজ (23/08/2018) ভিসা হাতে পেলাম। আসলে অনেক কিছুই লিখবার আছে। আমি যেই সাবজেক্ট এ যাচ্ছি তাতে খুব কম মানুষই জার্মানি যায়। তাই কিছুই বাদ না দিয়ে যতটুকু সংক্ষেপে বলা যায় বলবার চেষ্টা করছি। আর কিছু সাহায্যও চাইতে হতে পারে। সেদিকেও নজর দেবেন সিনিয়র বড় ভাই বোনেরা!

আগে প্রোফাইল শেয়ার করছি।

Subject: English and American Studies
University: Otto Friedrich University of Bamberg (আপাতত)
বেশি সম্ভবঃ Philipps Universitat Marburg
Program: Double Degree Masters
German Qualification: 2.3
Alma Mater: Rajshahi University, Dept. of English
Work Experience: 4 years (Senior Lecturer, Green University)
Publication: 2
IELTS: 7.5
German Proficiency: A1

Block Account Opening: 10/07/18 (EBL, Gulshan Branch)
Block Confirmation: 14/07/18
Total Amount: Almost 9 Lac
Visa Date: 21/07/18 (Special Appointment)
Visa Payment and Fingerprint Taking: 28/07/18 (Server Problem)
Visa Decision Email: 21/08/18
Visa Collection: 23/08/2018
Flying: 22/09/2018 (Probable)

প্রথমে আসি জার্মানি ও ভার্সিটি চুজ করার ক্ষেত্রে আমার গল্প আর কিছু সাজেশন ভবিষ্যৎ মানুষদের জন্য যারা এই সাবজেক্ট এ আসবেন। অন্য অনেকের মতো আমিও জার্মানি আসার কথা ভাবি টিউশন ফি ওয়েইভ পাব এটা ভেবে। পরিচয় হয় আমার কর্মক্ষেত্রে এক কলিগের ভাবির সাথে যিনি তার পিএইচডি এর কাজে দেশে এসেছিলেন। Bamberg এর কথা তার কাছ থেকেই জানি। আর daad ঘাটা শুরু হয় এরপর থেকেই। সেটি ২০১৬ সালের কথা। ২০১৭ সালে আসব এটা ভেবেছিলাম। daad এ আমার সাবজেক্ট এরিয়াতে সার্চ করে প্রথম সারিতে পাই Bamberg University। এছাড়া আরও কিছু ভার্সিটি খুঁজে পাই। কিন্তু বোকার মতো বড় শহর গুলোর খোঁজ করা বা যেখানে জব সুবিধা বেশি এই জায়গা গুলো যেমন বার্লিন, মিউনিখ বা ফ্র্যাঙ্কফুর্ট এর মতো শহরগুলোতে কোনো চেষ্টাই করিনি। আর আরেকটি কথা কর্মস্থলে তীব্র ব্যস্ততা আমাকে অনেক কিছুই করতে দেয়নি। কখনও আলসেমিও করেছি। যেগুলো ত্যাগ করা দরকার এইসব ক্ষেত্রে। তবে একটি ভালো কাজ করেছিলাম। ১ বছর গোয়েথে ইন্সিটিটুট জার্মান শিখেছি। প্রথম পরীক্ষা উতরে গেলেও কাজের চাপে পড়াশুনা না করার ফলে দ্বিতীয় পরীক্ষায় গোল্লা। যা পড়েছিলাম তা ঝালাই করলে A2 Level এর ডয়েচ পারব। জানি যথেষ্ট নয়। তবে B1 Level পর্যন্ত শিখে ফেলব প্রথম সেমিস্টারে এই আশা করছি। আশা তো করতেই পারি তাই না??? হাহাহা।

জার্মানিতে কিছু ইউনিভার্সিটি শুধু অনলাইন, কিছু ইউনি অ্যাসিস্ট আর কিছু
অনলাইন আর সরাসরি কাগজ পাঠাতে বলে। গরিমসি করে সবকিছুই আমি করেছি Eleventh hour এ এসে যা প্রচণ্ড বোকামি। খেসারত দুটি ইউনিভার্সিটি রিজেক্ট করেছে টাইম মতো মিসিং ডক পাঠাতে পারিনি ডেডলাইন পার হয়ে গেছে বলে। যেহেতু সব ফর্ম পূরণ করা হয়েছে গভীর রাতে। দুই এক জায়গায় ফর্ম পূরণ করতে ভুল করেছি। ফলাফল আরও এক জায়গায় ধরা খাওয়া। আপিল করতে পারতাম কিন্তু সেটিরও ডেডলাইন ওভার ছিল।

এরপরে এলো ভিসা এপোয়েন্টমেন্ট নেবার বিষয়। জানি অনেকে হাসবেন। কিন্তু সত্য এই যে, আমি জানতাম ভার্সিটি অফার লেটার দিলে তারপর ওটা দিয়ে ভিসা এর জন্য এপোয়েন্টমেন্ট এর ব্যাপার আসবে। এর মধ্যে পরিচয় হয়েছিল ছোট ভাই Mahbub Bhuiyan এর সাথে। অসাধারণ ভালো হৃদয়ের একজন মানুষ ছেলেটা। ও আমাকে বলল যে এই বিষয় অনেক আগে থেকে নিতে হয়। আমি ঢুকে দেখি September পর্যন্ত কোনো ডেট নেই। এদিকে Bamberg শুধু acceptance letter দিয়েছে। আর কিছু নয়। যাহোক আবেগি ইমেইল করে ওই বস্তু দিয়েই Special Appointment চাইলাম এবং পেলাম ২১ জুলাই তারিখে। এদিকে Bamberg এ যোগাযোগ করে জানা গেলো যে অফার লেটার দেরি হবে। এখন কি করি? যাহোক যা থাকে কপালে ভেবে ব্লক এর টাকা গুলশান ইবিএল থেকে করা শুরু করলাম দুইদিন অফিস কামাই দিয়ে। সেখানে তারা আমার acceptance letter আর coordinator Lisa (যার ভুলেই অফার লেটার ভিসা ইন্টার্ভিউ এরও ১৫/১৬ দিন পরে পেয়েছি) এর দেওয়া এক statement কে তারা অফার লেটার হিসেবে নিল। ভদ্রলোক স্লো ছিল কিন্তু কাজে খুব স্মার্ট। টাকা লেগেছে ৮৯৯০০০ প্লাস সব মিলিয়ে। কিন্তু হয়ে গেলো কাজ।

এরপরে আসলো সব কাগজ পত্র গুছাবার পালা। মারবুর্গ ততদিনে অফার লেটার দিয়েছে। কিন্তু আমি ব্যাম্বার্গ দিয়েই করলাম। সব জানার পরেও আমি ফটোকপি করেছিলাম এক সেট। জানি এর থেকে গাধামি খুব কম মানুষই করে থাকে। ২১ জুলাই যখন ভিসা ফেস করতে গেলাম, আবার গিয়েছি ব্যাগ নিয়ে। কি আর করা ব্যাগ বাইরে ফেলে রেখে কাগজ নিয়েই ঢুকে পরলাম। ঢুকে দেখি সত্যজিৎ স্যার কাউন্টার ৪ এ বসা যার কাছে আমি A1 শিখেছি। আর আমার ডাকও পড়ল তার কাছে। তিনি আমাকে চেনেন তেমন ভাব করলেন না। খুব প্রফেসনাল মানুষ। আমাকে বললেন যে পুরো সেট বাইরে থেকে কপি করে নিয়ে আসতে, সময় ১৫ মিনিট। আমি হুকুম পালন করলাম। মাঝখান থেকে আমার ৩ নং সিরিয়াল চলে গেলো মোটামুটি ১৫ জনের পরে। যাহোক অন্যদের ভাইভাতে কি জিজ্ঞাসা করছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। আর আবিষ্কার করলাম যে আমার কোর্স এর ক্রেডিট কত তা আমি ভুলে গেছি। সব মনে আছে এই কোর্স সম্পর্কে শুধু এই জিনিস ছাড়া আর ইহাই প্রত্যেককে প্রথমে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে কারও ক্ষেত্রে বিপদজনক অনেক প্রশ্নও রয়েছে।যতটা পারা যায় ঠাণ্ডা থাকার চেষ্টা করলাম। অনন্তকাল পরে আমার ডাক পড়ল আবার। এবারে স্যার প্রশ্ন করা শুরু করলেন। আমি খুব কনফিডেন্স নিয়ে বলে দিলাম ১২০ ক্রেডিট। মিলে গেলো!!! আর থিসিসে কত এইটা ভুলে গেছি স্বীকার করেছিলাম। সবচেয়ে ক্রুসাল প্রশ্ন ছিল যে আমেরিকান স্টাডিজ পড়ব আমেরিকায় না গিয়ে জার্মানিতে কেন? আমি কিছু গুণগান জার্মানি সম্পর্কে করলাম তবে সত্য বলেছিলাম যে এখানে ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট পাব যেটা অন্য দেশে টাফ। আর বাকিসব প্রশ্ন ছিল খুব সাধারণঃ ক্যারিয়ার, ফিউচার প্ল্যান ইত্যাদি। কোনো সাবজেক্ট স্পেসিফিক প্রশ্ন ছিল না, থাকার কথাও নয় এই সাবজেক্ট এ। তবে একটু বিটলামি আমিও করেছি। যখন বলেছে যে আপনার তো জার্মান প্রফিসিয়েন্সি আছে দেখছি। আমি বললাম,” You taught me, Sir.” আবারও গাম্ভীর্য এবং এড়িয়ে যাওয়া। ইন্টার্ভিউ শেষ। তবে কপাল যেহেতু খারাপ তাই সেদিন আমাদের প্রায় ১০/১২ জনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট আর টাকা নিতে পারলো না কারণ সিস্টেম ডাউন। আমাদের অপেক্ষা করিয়ে রাখল প্রায় ৪ ঘণ্টা। পরে বলল যে আপনাদের ফোন দেওয়া হবে চলে যান। ডাক পড়ল ২৮ তারিখ। সময় মতো টাকা আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েও এলাম। আর তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা!

একে একে গ্রুপের অন্য অনেককেই অল্প দিনের মাঝেই পেয়ে যেতে দেখলাম। কেউ ৩ দিনে, কেউ ১৫ দিনে বা কেউ ২০/২২/২৫ দিনে। এদিকে আমার কিছুই আসেনা। আমি ধরেই নিয়েছি কোনো ঝামেলা হয়েছে আমাকে দেবে না। হতাশা। চাকরীতে নতুন নিয়োগ দিয়েছে আমার জায়গায়। জব রেস্পন্সিবিলিটি পার করার অপেক্ষায়। যদি না যাই সব জায়গায় ওলট পালট হবে। বাসা ছাড়ার কথা বলে দিয়েছি। এদিকে ঈদ চলে আসে বাড়ি ভাড়াও অন্য কাউকে দেওয়া হয়ে গেছে। বোনের বাসায় তল্পি তল্পা গুটিয়ে আশ্রয় নিয়ে এক মাস রিফিউজি থেকে পরের মাসে আবার বাসা ভাড়া নেবো এইসব ভাবছি। আমার পরে যারা ভাইভা দিয়েছে ওরাও পেয়ে গেলো যখন, তখন আমার সব ভরসা শেষ। কোনো মোটিভেশন কাজ করতেছে না।এরকম সময় সৃষ্টিকর্তা ঈদের সালামী হিসেবে ইমেইলের আওয়াজ দিলেন ল্যাপটপে। তবে আমি তো মোবাইল আর ল্যাপটপে ইমেইল যাই আসে তাকে ভিসা ভাবতে ভাবতে ধোঁকা খাওয়ার চরম ভোগান্তিতে শেষ। কিন্তু এবারে দেখি “VISA DECISION” কথাটি লিখে ইমেইল। তারিখ ২১ আগস্ট! খোদা! পুরাই এক মাস!

ঈদ পার করে আজ গিয়েছি ভিসা তুলতে। ২টার দিকে যেতে বলেছে। গেলাম ১.২৮ এ। পৌঁছেই বুঝলুম আমি আমার ভিসা রিসিট সযত্নে বাসায় রেখে এসেছি। কি আর করা পাঠাও ওয়ালা কে বললাম পঙ্খিরাজ ছাড়তে। তিনি মাত্র ১৩ মিনিটে এম্ব্যাসি থেকে মিরপুর ১২ আর ১৫ মিনিটে আবার ফেরত আসা সম্পন্ন করলেন। ঈদের পরেরদিন ফ্যাক্ট! আমি বীরের মতো কাগজ হাতে নিয়ে তাকিয়ে দেখি আবারও সত্যজিৎ রায় স্যার। তিনি ইশারা করে বললেন সব নিয়েই ভেতরে ঢুকতে। ঢুকলাম। দেখি গৌতম স্যার। ইনিও আমার আরেকজন ভাষা শিক্ষক। তারা দুজনে মিলে আমার কাগজের ব্যবস্থা করলেন। এবারে তাদের বিদায় বলার সময় দোয়া দিলেন। সেই চেনা হাসি। অসাধারণ ভালো মানের দুজন শিক্ষক আর ভালো হৃদয়ের মানুষ তারা।

এখন আসি, অন্য প্রসঙ্গে। ভার্সিটি চেঞ্জ করার ওপরে কোনো লেখা পাইনি। যখন আমার কাজ করা হবে এর উপরে আমি একটি লেখা দেব অবশ্যই। মারবুর্গে আমার কোনো থাকার জায়গা নেই। কেউ যদি সাহায্য করতে পারেন তার প্রতি অসম্ভব কৃতজ্ঞ থাকব।

আর গ্রুপের সকলকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাই। দুঃখের সময়ে এই গ্রুপটি ছিল এক মাত্র সাহস নেবার জায়গা। আমার পুরো কাজে রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ছোট বোন আর এখন জার্মানিতে সিনিয়র বড় বোন Samira Jannat Shetu কে আসলে কি বলব বুঝতে পারছি না। এত ভালো মেয়ে! খুব কম আছে। সেতু তুই লাখে না গোটা মালটিভার্সে একজনই আছিস। Mahbub BhuiyanMustazabur Rahman Roktim এর বিভিন্ন অসময়ে আমাকে সহ্য করার প্রশংসা করতেই হয়। তবে সামনে আরও বিরক্ত করব।

আর একটি কথা বলে দীর্ঘ রচনা এখানে শেষ করছি। অনেক সময় আমরা অনেকেই না বুঝে মন্তব্য করি। অন্যের প্রতি সঠিক সম্মান ও মর্যাদা প্রকাশ করিনা। আমাদের একটু ধৈর্যশীল হওয়া উচিত। আমি নিজেকেও একই দলে ফেলছি। ভালো থাকবেন সবাই। আসছি আপনাদের মাঝে যদি আর কোনো উল্টা পাল্টা না করি।