প্রায় ১৩ বছর আগে ফেব্রুয়ারীর শেষার্ধে আমার জার্মানিতে আসা। স্বদেশ থেকে সহস্রাধিক মাইল দূরের দেশে আসার কারণ ছিল না নিছক অভিযান, আরও অনেকের মত আমারো লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষার সফল সমাপ্তি আর তারপর একটা যথার্থ চাকরীর। এই লক্ষ্যের পরিক্রমায়, সাফল্য আর ব্যর্থতার দ্বৈততায়, আমি সমৃদ্ধ হয়েছি অভিজ্ঞতায়। তারই কিছুটা আমি চেষ্টা করছি এই লেখায় সবার সাথে ভাগ করে নিতে। আজকের এই লেখার বিষয় চাকরি বিষয়ক কিছু টিপস।

১) ব্যক্তিত্ব আর সামাজিক যোগ্যতাঃ চাকরির যোগ্যতা বলতেই প্রাথমিকভাবে আমরা শিক্ষাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতাকেই বুঝি, কিন্তু পাশাপাশি ব্যক্তিত্ব আর সামাজিক যোগ্যতার গুরুত্বটা আমরা অনেক সময়ই অনুধাবন করি না। প্রকৃতপক্ষে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব আর সামাজিক গুণাবলীই গড়ে তলে আসল ব্যবধান। ভেবে দেখুন – আপনি যে সময়ে কোন একটা পদের জন্য আবেদন করছেন ঠিক একই সময়ে একই শিক্ষাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার আরও কমপক্ষে একজন প্রার্থীর একই পদে আবেদন করাটাই স্বাভাবিক, সেক্ষেত্রে আবেদনকারীদের মধ্যে তার প্রার্থীতাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যিনি ব্যক্তিত্ব আর সামাজিক গুণাবলীর বিবেচনায় সবচেয়ে এগিয়ে। তাই যেমন দরকার জীবনবৃত্তান্তে তার উল্লেখ তেমনি ইন্টারভিউ এর কথোপকথনে ও তার প্রতিফলন ঘটাটা আবশ্যক।

কিন্তু কীভাবে? প্রথমতঃ জানা দরকার কি কি মানবিক/সামাজিক গুণাবলী কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কিংবা পছন্দনীয়, দ্বিতীয়তঃ তার কোনটির অধিকারী আপনি। মানবিক/সামাজিক গুণাবলীর তালিকা পাওয়া যাবে ইন্টারনেটেই, খুঁজে নিতে হবে বিভিন্ন keyword দিয়ে, যেমন ‘soft skill’ হতে পারে এজন্য প্রযোজ্য অন্যতম একটি keyword, নেটে খুঁজলেই পেয়ে যাবেন বিভিন্ন ‘soft skill’ তথা মানবিক/সামাজিক গুণাবলীর তালিকা। এরপর সেই তালিকার কয়েকটি (৩ থেকে ৭ টি) গুণাবলী বেছে নিন যেগুলো দিয়ে আপনি আপনার ব্যক্তিত্বকে বর্ণনা করতে পারবেন বলে মনে করেন। এই দ্বিতীয় ধাপটিতে আপনার একটু চিন্তাশীল হওয়া প্রয়োজন, প্রতিটি গুনের বিপরীতে একটি যুক্তি অথবা দৃষ্টান্ত বেছে নিন আপনার জীবন থেকে। ইন্টারভিউ এর কথোপকথনে এই যুক্তি বা দৃষ্টান্তগুলিই কাজে লেগে যেতে পারে। যেকোনো আবেদনপত্রে এই গুণাবলীর তালিকা থেকে ৩ থেকে ৫ টি বেছে নিয়ে ব্যবহার করতে পারেন, সেক্ষেত্রে দুএকটি অথবা সবগুলোই হয়তবা চাকরির প্রয়োজনীয় যোগ্যতার সাথে মিলে যেতে পারে। মিলটা যত বেশি স্বভাবতই ইন্টারভিউতে আমন্ত্রণ পাবার এবং সর্বোপরি চাকরি পাবার সম্ভাবনাও ততটা বেশি।

২) নেটওয়ার্ক, ফোরাম, সাংগঠনিক যোগসাজশঃ সোশাল নেটওয়ার্ক এর মতই পেশাজীবীদেরও রয়েছে নেটওয়ার্কিং প্লাটফর্ম, যেমন LinedIn, Xing। এছাড়া চাকরির সন্ধানীদের জন্য Monster, StepStone ইত্যাদি প্লাটফর্ম রয়েছে যেখানে তৈরি করে রাখা যায় নিজের প্রোফাইল, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি এখানে খুঁজে পেতে পারে যোগ্য প্রার্থীকে। কিন্তু চাকরিদাতার নজরে পরার জন্য চাই যথাযথ প্রোফাইল, বিশেষত যেহেতু প্রার্থী খোঁজার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রচলিত উপায় keyword দিয়ে খোঁজা, আপনাকে প্রোফাইলএ ব্যবহার করতে হবে অধিক ব্যবহৃত keyword গুলো।

এই প্লাটফর্মগুলোর আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে জানা যায় আপনার প্রোফাইল দিনে, সপ্তাহে বা মাসে কয়বার কারো দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এই পরিসংখন এর ভিত্তিতে আপনি প্রতিনিয়ত আপনার প্রোফাইল আপডেট করে নিতে পারেন। এর বাইরেও আছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, ইন্টারনেট ফোরাম ইত্যাদি। যেকোনো বিষয়ে তথ্য জানার ক্ষেত্রে যেমন এইসব সংগঠনগুলো সহায়ক, তেমনি অনেক সংগঠন প্রায়ই আয়োজন করে বিভিন্ন ফেয়ার, সেমিনার ইত্যাদি অনুষ্ঠানের। এর মাধ্যমে অনেক সময় অনেক চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে সরাসরি জানার সুযোগ হয়, এই ব্যক্তিগত পরিচয়ই পরবর্তীতে বিশেষ সুফল বয়ে আনতে পারে চাকরি পাবার ক্ষেত্রে। এছাড়া কোন পেশাজীবী সংগঠনে আপনি সক্রিয়ভাবেও যুক্ত থাকতে পারেন, তাতে আপনার সাংগঠনিক যোগ্যতার চর্চা হবে, হয়তবা অন্য কোন ‘soft skill’ এর সংযোজনও হতে পারে আপনার ব্যক্তিত্বে। সর্বোপরি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আপনার পরিচয়ের গণ্ডিও হবে সমৃদ্ধ।

৩) ব্যর্থতা থেকে শেখাঃ প্রথম চেষ্টাতেই কেউ কেউ চাকরির সন্ধান পেয়ে যান, কিন্তু অধিকাংশের ক্ষেত্রেই হয়ত এটা ঘটে না। তাই, কিছুটা ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই  হয়, ব্যর্থতায় কোন গ্লানি নেই, গ্লানি আছে ব্যর্থতা থেকে না শেখায়। হোক কোন আবেদনের উত্তর না পাওয়া কিংবা  ইন্টারভিউ-এর প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ধাপ থেকে বাদ পরা, যেকোনো ব্যর্থতার পরেই একটু নিরপেক্ষভাবে ভেবে দেখুন কি করা উচিত ছিল, কি করলে হয়ত আরও ভাল হতে পারত। নিজে বুঝতে না পারলে কারো সাহায্য নিন, এমনকি প্রয়োজন হলে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেও জেনে নিতে পারেন আপনার ব্যর্থতার কারণ। হোক তা কারিগরি বা শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি, ভাষার দক্ষতা কিংবা ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা চেষ্টা করুন নিজেকে আরও সবল করে তোলার, আরও যোগ্য করে তোলার।

কোন কোন দুর্বলতা হয়তবা সহজে দূর করা সম্ভব নয়, কিন্তু অন্ততঃ নিজের দুর্বলতা ও সক্ষমতাকে চেনার মধ্যে আছে নিহিত আছে সাফল্যের চাবিকাঠি। প্রকৃষ্ট উদাহরণ – ২০০৪ এ ইউরোকাপজয়ী গ্রীস, রক্ষণের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তারা ঢেকে রেখেছিল আক্রমনের দুর্বলতা।