মানুষ যে কত বিচিত্র রকমের হতে পারে! আমার বেশী মানুষের সাথে সখ্যতা নেই, তবুও কয়েকদিনের এই জীবনে এত বিচিত্র বিচিত্র চরিত্রের মানুষের দেখা হবে ভাবিনি! জীব বৈচিত্রের মতো মানব বৈচিত্র নিয়েও হয়ত বিশাল বড় সায়েন্স এডুকেশান থাকা উচিত (অলরেডী তা আছে কিনা আমার জানা নাই!)!

১)
প্রথমেই শুরু করি আমার বাবা-মা কে নিয়ে। আমার বাবা বড়ই আজব এক মানুষ! কথিত আছে যে, আমার জন্মের সময় আমার বাবা নাকি কর্মক্ষেত্রেই ছিলেন! প্রথম পুত্রের পর ২য় সন্তানটিও যখন পুত্র হয়ে জন্মালো সেই শোকে (!) নাকি একদিন পড় আমাকে দেখতে এসেছিলেন! মা বাবার বড়ই শখ ছিল দ্বিতীয় সন্তানটি মেয়ে হবে! ভগবানের আশীর্ব্বাদে আমি ছেলে হয়েই জন্মালাম! বাবা পরে মানিয়ে নিয়েছিলেন ব্যাপারটা! এটি বুঝেছিলাম কারন, উনার সাথে দ্বিতীয় ব্যাক্তি হিসেবে আমার মা জননীর পরে আমারই সবচেয়ে বেশী সখ্যতা! তবে মা জননী ছাড় দেন নাই এক বিন্দুও। বড় ভাই আমার থেকে একটু নাদুস নুদুস সাইজের হওয়ায় গৃহস্থালী কাজে আমিই কাজের বুয়ার ট্রেনিং নিলাম প্রফেসর মা থেকে! ঘরের হেন কাজ নাই যেগুলো করিনি সেই ছোট কালেই! (তবে আজকাল সেই আর্মি ট্রেনিং ভালই কাজে লাগছে পরবাসে এসে) সাথে রুটি বেলুনীর আর খুন্তির বাড়ি, ঝাড়ু আর হেঙ্গারের দাবড়ানী তো ফ্রী ছিলই!

আমার মা’র হালকা শুচিবায়ু রোগ আছে। বাসার ফ্লোর ঝাড়ু দিতে আর মুছতে মুছতে সেখানে নিজের চেহারা দেখার মতে চকচকে থাকা চাই! প্রতিটি ঘর গুছানো আর পরিপাটি হওয়া চাই। নিজের পোষাকেও সেইরকম চলনসই। সেই দিকে আমি হইলাম একদম আমার বাপের মত, চরম ক্ষেত! একদিন তো কলেজে থাকতে মা’র সাথে বের হয়ে এক প্রিয় বান্ধবীর হাতে কট খেলাম, আমার মা’র পাশে আমাকে দেখে মা’র সামনেই বোল্ড আউট করল আমাকে ক্ষেত বলে! যাই হোক, আমি কিছু মনে করিনি তখন!

মা’কে নিয়ে এমন এহেন যন্ত্রণা থেকে বাঁচলাম চট্টগ্রামে মামার বাড়ীতে এসে। মামী আর দিদার আদর আর পিচ্চি দুইটা মামাতো ভাইবোনের সাথে মারামারি আর শাসন করে ৬টা বছর যে কিভাবে কেটে গেল টেরই পাইনি। দিদা রান্না করে দিত আমার জন্য, মামী বিছানা আর ঘর গুছায়ে দিত। আর আমি জমিদারের মতো খাইতাম আর ঘুমাইতাম! মাঝে মাঝে দিদা আর মামীকেও কেন জানি বড়ই আজব মনে হইত তাদের এহেন ভলান্টিয়ারি দেখে!!!

২)
জীবনে কম গালি খাইনি আমি! আমাকে গালি দেওয়ার দিকে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন আমার উচ্চমাধ্যমিকের শ্রদ্ধেয় কেমিস্ট্রি শিক্ষক! সঙ্গত কারনেই উনার নাম প্রকাশ করলাম না। আরে সেই কি গালি, আর কি হাই ভোল্টেজ অপমান! আমি না হয়ে অন্য কেউ হলে নিশ্চিত তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হইত হাই ভোল্টেজ শকের পর! প্রিয় প্রিয় বান্ধবীদের সামনেই মুন্ডিত মস্তক করে ছাড়তেন উনি আমাকে! তবে উনার গালি শুনেই বান্ধবীদের সামনে নিজের ইমেজ (!) রক্ষার্থে আমি কিছুটা হলেও পড়ালেখায় মনযোগী হতাম! আর গালি দিবেনই না বা কেন? দুনিয়ার চরম অদ্ভুত সব প্রশ্ন চরম অদ্ভুত সময়ে জিজ্ঞাসা করতাম। শুনে যে উনি শুধু ‘সামান্য’ গালি দিতেন, তাতেই আমি খুশি ছিলাম। এইসব গালি যে প্রথম প্রথম আমার খুব ভাল লাগত তা নয়, তবে পরবর্তিতে উনার গালিগুলো মধুর লাগত। তাই আমি উনার কাছে আসলেই কৃতজ্ঞ, কারন উনি উনার জীবনের শ্রেষ্ঠ চেষ্টাটাই করেছিলেন আমাকে পড়ার টেবিলে বসানোর জন্য। তাই এখনো (দেশে থাকার সময়) মৌলভীবাজারে গেলে উনার সাথেই সবার আগে দেখা করি। উনার পড়ার ঘরে বসে যখন দেখতাম ছোট ছোট ভাইরাও আমার মতই ‘সুমধূর ধ্বনিতে’ শরিক হচ্ছেন, তখন মনের অজান্তেই আমার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে যাইত!

৩)
চট্টগ্রামে আসার পর তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘অতি শালীন’ ভাষার সাথেও কিছুটা পরিচয় হল। শুধু যে ‘অতি শালীন’ তাও না, সেই সাথে চরম দুর্বোদ্ধও! জার্মান ভাষার থেকেও দুর্বোদ্ধ! চাঁটগাতে আমার আজব দুই বন্ধু হচ্ছে সৃজন আর আশফাক। পালোয়ান সাইজের ইয়া মোটা দুইটা। আর সেই কি ‘শালীন’ ভাষা রে বাবা তাদের! কান-মন একদম জুড়িয়ে যায়! বাসা থেকে প্রতিদিন টেক্সিতে করে আমরা তিন জন রওয়ানা দিতাম বহদ্দারহাটের উদ্দেশ্য, আর আমাকে বসতে হইত তিন জনের সিটের মধ্যিখানে। মধ্যিখানে ‘মধ্যমনি’ আমাকে পেয়ে তারা যেন আরও জৌলুস সহকারে চাটগা ভাষার প্রাকটিস করত! আমার ডান-বাম দুকানের হায়াত কমাই দিত! প্রতিদিন সাত সকালে এরূপ চরম অভিজ্ঞতার পরেও যে এখনো চাটগা ভাষাটা আমার আয়ত্ব করা হয়নি সেটাই দুর্ভাগ্যজনক লাগে আমার কাছে!!

৪)
আজব মানুষ হিসেবে ‘ইয়াং ছেলে’ রা’ই বা কম কিসে! যে কোন ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেই প্রেমে পড়ুক আর নাই পড়ুক, গার্লফ্রেন্ড থাকুক আর নাই থাকুক, বিবাহিত হউক আর নাই হউক (!), সুন্দরী মেয়েদের দেখলেই যে তাদের প্রেমিক সত্তা বেড়ে যায় আর ব্রেইনের বুদ্ধিও (!) এক্সপোনেনশিয়ালি কমে যায় তা একদম সঠিক বলে আমার মনে হয়! তবে, ভার্সিটি থেকে পাশ করার পর তারা এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে গিয়েও একদম ব্রেইনলেস হয়ে যায়, অর্থাৎ বিবাহিত (!) হয়ে যায়! উদারহণ স্বরূপ আমার রোবটিক্স গ্রুপমেটের কথাই বলি (সঙ্গত কারনেই নামটি বললাম না!)| ভার্সিটিতে পড়ার সময় চক্ষুর সামনে এমন কোন যুবতী মেয়ে নাই যাকে দর্শনমাত্রই মিলিসেকেন্ডের মধ্যে সে ‘ধুম’ মুভির উদয় চোপড়ার মতো শুধু বিয়ে নয়, এক ডজন ছেলেমেয়ে সহ পরিবার পরিকল্পনার করে ফেলে নাই! তবে সেই ছেলেই আজকে আমাদের ভাবীকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে (!) জেলখানায় দুখী জীবনযাপন করছে!

৫)
ডর্টমুন্ড শহরে আসলাম ১বছর এর উপরে হয়ে গেল। ৩ মাস ছিলাম একটা শেয়ার ছাত্র হোস্টেলে আফ্রিকান চাইনিজ জাপানীজ দের সাথে। ৮ মাস ছিলাম একটা জার্মান ছেলের সাথে শেয়ার এপার্টমেন্টে। তাদের সাথেও অদ্ভুত কান্ডকীর্তির বিস্তারিত তথ্য আমি গত এক বছর ধরে যথেষ্ট পরিমান পোষ্ট করেছি। আশাকরি সবাই জানেন!
বর্তমানে ৪ মাস ধরে আছি সিঙ্গেল রুমে, ভার্সিটির নিজস্ব ডর্মিটরিতে। আশে পাশে বিভিন্ন দেশের ছেলে মেয়েরা রয়েছে। তান্মধ্যে আমার পাশের রুমের দিল্লীর ছেলেটি উল্লেখযোগ্যহারে অদ্ভুত! ছেলে শিবভক্ত। কিন্তু ‘দারু’ ও ‘লাড়কী’ স্পেশালিস্ট! প্রায় প্রতি উইকএন্ডেই তার নাইটপার্টিতে গিয়ে অশালীন সব কার্যকলাপের গল্প শুনতে শুনতে প্রায় বিরক্ত আমি! সারারাত দুনিয়ার সব আকাম কুকাম করে এসে পরদিন আমাকে (কৃষ্ণভক্ত!) পেয়ে বলত, ‘‘আরে ইয়ার ম্যায়নে এক গলদ কাম কিয়া! মুঝসে গিল্টি ফিল হোরাহা হ্যায়! শিবজীকো ক্যায়সে বাতাউঙ্গা? তু মুঝে কুছ গাইড কার ইয়ার! ক্যায়া কারু আভি?’’ !!!
একদিন কোন এক উইকএন্ডে সে তার রুমে যাওয়ার পথে আমার দরজায় নক দেয়! তাকে উইকএন্ড রাতে এত জলদি ফিরে আসতে দেখে আমিও হতবাক! বুঝলাম যে আজকে তার নাইট মিশন ফেইলড! অতপর সে শুরু করল তার ‘বিফল কাহিনী’র বর্ণনা! হায়রে সেই কি দুর্বিষহ বর্ণনা! অবশেষে অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে বুঝিয়ে সুজিয়ে মন ‘ভাল’ করে কোন রকমে তাকে তার রুমে পাঠিয়িই আমি দুই রাউন্ড কৃষ্ণনাম জপ করতে বসে গেলাম নিজেকে বিশুদ্ধ করার জন্য!

হায়রে বিচিত্র মানুষ!

পাদটীকা: দেশ থেকে বিদেশে, সব জায়গাতেই চরম বৈচিত্র মানুষের মন, কালচার, ব্যবহার ইত্যাদিতে। ভাল খারাপ মিশানো এই দুনিয়াটাই। বিশেষ কেউকে কটাক্ষ বা বিশেষ কোন জাতিকে বিষেদাগার করার জন্য এই লেখা নয়। এটি শুধু আমার ন্যাশনাল আর ইন্টারন্যাশনাল এক্সপেরিয়েন্স গুলোর ছোটখাটো একটি বর্ণনা মাত্র! সবাইকে অনুরোধ, কেউ এই লেখার দ্বারা প্রভাবিত/উত্তেজিত হবেন না!

“গরু প্রেম”
জার্মান প্রবাসে ম্যাগাজিন – সেপ্টেম্বর ২০১৫ – “বন্ধুত্ব”
ভবঘুরে আর ইতালিয়ান বৃদ্ধের গপ্পো