আমার বড় হয়েছি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার একটি গ্রামে। আমার বাবা অনেকদিন প্রবাস জীবন যাপন করে গভীর দেশ প্রেম থেকে ফিরে এসে একেবারে কৃষি কাজে মনযোগী হবেন বলে ঢাকায় না থেকে গ্রামে চলে গেলেন। আমি নিজেকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে করি সেজন্য যে আমি এত ভাল একটা শৈশব পেয়েছিলাম। পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু, আর গোলা ভরা ধান। আমার বাবা প্রবাসের ভাল চাকরী চাকচিক্যময় জীবন ছেড়ে গ্রামে এসে একেবারে কাদামাটির জীবনে মিশে গেলেন। আমাদের বাড়িত পালা করে মুরগির বাচ্চা হয়, হাসের বাচ্চা, আর গরুর বাছূড় জন্মায়। আমার প্রকৃতি আর এই হাস, মুরগি, গরু সম্প্রদায়ের সাথে ছোটবেলা থেকেই গভীর প্রেম শুরু ছিল। গরুর বাছুর জন্মাবার আগে মনে প্রানে দুয়া করতাম যেন তখন কোন পরিক্ষা না থাকে।

একটা গরু পরিবারে নতুন সদস্য আসা মানে কি যে আনন্দ। পরীক্ষা থাকলে খুব দুঃখ হত কেন পরীক্ষার সময় এত আনন্দের সমাবেশ। আমাদের বাড়িতে জন্মানো গরুগুলো বাড়িতেই বড় হতে লাগলো। আমি রোজ দুপুরে খাবার পরে সবাই যখন ঘুমাতে যায় আমি অনেক্ষন ওদের সাথে গায়ে মাথায় হাত দিয়ে আদর করে গল্প করতাম। মাঝে মাঝে খুনসুটিও করতাম ছাদে দাঁড়িয়ে গাছের পাতা ছিড়ে দেখাতাম এই যে আসছি কিন্তু। আমাদের বাড়ির মেয়ে গরুর চোখ খুব সুন্দর দেখতেও খুব মায়া মায়া ছিল। এ ছিল আমার রোজকার রুটিন ওদের সাথে গল্প আদর মান অভিমান। নাম ধরে ডাকতাম চোখ তুলে তাকাত।

নিষ্ঠুর বাস্তবতা আমাদের তিন ভাইবোনের স্কুল শেষ। বড় দুই ভাই ঢাকায় গিয়ে নটরডেম কলেজে পড়ত ওরা আমাদের একটা পুরনো বাড়ি ছিল ঢাকায় সেখানে দুরসম্পরর্কের এক চাচা চাচির সাথে থাকত। আমি মেয়ে এরপরে আমার পালা। আমার বাবামা সব ছেড়ে আমাদের নিয়ে ঢাকা চলে আসলেন। বাড়িতে এত গুলো গরু একে একে সব বিক্রি করে দেওয়া শুরুর হল। একবার দুটো বাছুর হলও ছেলেটা খুব দুষ্টু আর কম সুন্দর ছিল ওর নাম দিয়েছিলাম পণটি আর মেয়েটা খুব সুন্দর সাদা ওর নামছিল বিধু। আমি মেয়েটাকে কখন গায়ে হাত দিয়ে আদর করলে ছেলে গরুটার চোখদিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তো। কেনার আগে কেউ দেখতে আসলেও বুঝে যেত ওদের চোখে টপটপ করে পানি পড়তো।

আমি এক এক দিন গরুদের দুঃখে সারাদিন কেঁদে কেঁদে বেড়াতাম। মাঝে মাঝে খুব অস্থির হয়ে আমার মাকে বলতাম আমি ওদের দেখতে যেতে চাই যেভাবেই হোক নিয়ে যাও। এর পরে একটা গরু আমাদের পাড়ায় এক বাড়িতে বিক্রি করা হল। বাড়ির সামনে দিয়ে যে মহিলা ওদের দেখাশোনা করতো তাকে দেখলেই গরুটা ডেকে উঠত। আমি মাঝে মাঝে সে বাড়িতে গিয়ে তাকে দেখতে যেতাম।

অনেক আদরের মেয়ে বিয়ে দিয়ে অন্য বাড়িতে গেলে, বাবা মা যখন দেখে ছোট্ট মেয়েটা অনেক ভারি কাজ করছে, ছল ছল চোখে বাবামার দিকে তাকাতে লজ্জা পায়। আরও বেশী কাজে কাজে মনোযোগী হয়, ব্যস্ততার ভান করে চোখের পানিটা আড়াল করার জন্য তাকে দেখলে বাবা মা ভাইদের যেমন অনুভুতি হয়, আমার ওই গরুকে ওদের বাড়িতে দেখে ঠিক একিভাবে বুকের ভেতর দুমড়ে মুচড়ে যেতো। আমি মাঝে মাঝে আমার মাকে বলে উঠতাম ওকে নিয়ে চল আবার আমাদের বাড়ি। আমার মনে হত এ বাড়ি তার না ওকে এখানে মানায় না।আমার চোখে টপটপ করে পানি পড়তো সেই সাথে ওদেরও।

ভবঘুরে আর ইতালিয়ান বৃদ্ধের গপ্পো
জার্মান প্রবাসে ম্যাগাজিন – মার্চ ২০১৫ – “উত্তরণে নারী”
বিচিত্র মানুষ!
জার্মান প্রবাসে – “Room-বিলাস”!