জার্মানী থেকে এক মাসের ছুটি নিয়ে দেশে ছুটে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, বয়স বেড়ে চলেছে তাই উপযুক্ত সময়ে বিয়ে টা সম্পন্ন করা ৷ তখন ধরতে গেলে জার্মানীতে আমার নতুন চাকুরী ৷ মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লাইড সাইন্স এ পলিমার ইংঞ্জিনিয়ারিং গবেষনা সেক্টরের বৈজ্ঞানিক গবেষক (পি এইচ ডি) ৷ তখনো গবেষনায় আমার মেধা অপরিপক্ক ৷ প্রফেসরের কাছ থেকে এক মাসের ছুটি ও নিয়ে ছিলাম, ছুটির কারন দেখিয়েছিলাম ভ্যাকেশান ফর ওয়েডিং ৷ আমার প্রফেসর আবার খুব মিশুক মানুষ, সুশ্রী মহিলার বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ বছর ৷ প্রফেসরের সাথে মাঝে মধ্যেই অনলাইনে চ্যাট হতো, আমার দেশ ও দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কৌতুহলী মানুষ তিনি ৷ আমাকে অনেক স্নেহ করেন ৷ কাজেই ছুটি পেতে খুব একটা অসুবিধা হলোনা ৷

প্রায় তিন বছর পর আমার দেশে ফেরা ৷ ঢাকায় বড় ভাইয়ের বাসায় নেমেই খুব সখ হলো ঢাকা শহর টা ঘুরে দেখবো ৷ দেশের মানুষ দেখবো, ব্যস্ত রাস্তা দেখবো, মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকান দেখবো, চায়ের দোকানের চা পান করা মানুষ গুলো দেখবো, ফুটপাথের দোকান দেখবো ৷ যা ভাবা তাই কাজ, ট্যাক্সি ক্যাবে করে চলে গেলাম কাওলার রেলগেট থেকে কারওয়ান বাজারের কাছে, ট্যাক্সি থেকে নামার সময় অজ্ঞাতে ট্যাক্সিতে আমার সখের স্যামসাং এস সেভেন মোবাইল ফোন টা রেখেই নেমে গেলাম, যখন পকেট হাতড়ে টের পেলাম পকেটে ফোন নেই ততক্ষনে ট্যাক্সি বহুদুরে চোখের সীমানা পেরিয়ে চলে গেছে, আমার তখন কিংকর্তব্য বিমুঢ় অবস্থা, চোখ তখন শূন্যে, দীর্ঘ পনেরো ঘন্টা প্লেন জার্নি করে শরীর তখনো ক্লান্ত, চোখে মুখে ঘুম ঘুম ভাব ৷ চোখের সামনে দিয়ে সাই সাই করে ছুটে চলা সিএনজি আর প্রাইভেট কারের দিকে তাকাতে মনে হচ্ছিল এক একটা অসপ্ষ্ট জেট বিমান ছুটে চলেছে ৷ আশে পাশের মানুষ গুলা সবাই ব্যস্ত, কারো দিকে ফিরে তাকাবার সময় নেই ৷ পকেটে তখনো আমার হাত ঢোকানো, কি করবো? ট্যাক্সি যেদিকে গেছে দৌড় দিবো, নাকি ফোনের আশা ছেড়ে দিবো? ফোন টা জার্মানীতে কন্ট্রাকে কেনা, এখনো দাম শোধ করতে পারিনি, পুরোটা শোধ করতে দু’বছর লেগে যাবে ৷ হঠাৎ কি মনে করে ফুটপাথ ছেড়ে মেইন রোড ধরে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আশে পাশের সিএনজি, মিনিবাসের সাথে পাল্লা দিয়ে জোরে দৌড় শুরু করলাম, আশে পাশের মানুষদের লক্ষ্য করলাম, তারা এবার ব্যস্ততা ভেঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে, তারা আজ হয়তো নতুন কিছু দেখছে, অদ্ভুত কিছু দেখছে ৷ তখন আমি জিন্স টিশার্ট পড়া উসাইন বোল্ট ৷ সৃষ্টিকর্তা সেদিন কপাল টা হয়তো ভালো রেখেছিলেন, ঢাকার দুর্বিসহ ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে এটা ছিল একটা ভালো দিক, চুরি করে পালিয়ে যাবার পথ বের করা বড়ই শক্তের কাজ ৷

দৌড়ে অনেক দুরে যেতেই দেখি অনেক গুলো ট্যাক্সি, মিনিবাস, সিএনজি জ্যামে আটকে আছে, ঘুরে ঘুরে ট্যাক্সির সন্ধান করছিলাম ৷ ড্রাইভারের চেহারা আমার মনে নেই, দুই একবার লুকিং গ্লাসে দেখে ছিলাম, গায়ের রং কালো, চেহারার গড়ন ভুলে গেছি, আসলে পৃথিবীতে মনে রাখার মত গুরুত্বপূর্ন জিনিস অনেক কিছুই আছে তার তুলনায় ট্যাক্সির ড্রাইভারের চেহারা মনে রাখার ব্যাপার টা আমার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ন কাজ মনে হয়নি, গায়ে হলুদ চেক টি শার্ট, তার টিশার্টের রং আর গাড়ীর বাহ্যিক চেহারা মেলানোর অক্লান্ত চেষ্টা করছিলাম, গোটা পঞ্চাশেক বিভিন্ন চেহারা ও আকৃতির গাড়ির মাঝে শতভাগ মেলানো সত্যি ই দুষ্কর ছিল ৷ গাড়ি গুলো তখন জ্যাম কাটিয়ে এগুনোর জন্য উৎকন্ঠিত, মিনিট পাঁচেক খোজার পরে, অবশেষে একটা ট্যাক্সি দেখে সন্দেহ হলো, ড্রাইভারের গায়ে লক্ষ্য করলাম হলুদ চেক টি শার্ট ৷ তার সিট বরাবর যেতেই দেখি ড্রাইভার আমার ফোন তার কোলে নিয়ে তৃপ্তি সহ বসে আছে ফোনের তখন পাওয়ার অফ, নিজের পরিচিত ফোন টা চিনতে আমার বেগ পেতে হলোনা ৷ জানালায় টোকা দিতেই বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো, হয়তো বিশ্বাস করতে পারেনি, এত বড় শহরে একলা আমি এতদুরে অলৌকিক ভাবে চলে আসতে পারবো ৷ ভুত দেখার মত চেয়ে রইলো ৷ ঘোর কাটিয়ে ভয়ার্ত চোখে বললো, “ফোন টা নিয়া আপনারেই খুজতা ছিলাম”, লোক টা খুব ভয় পেয়েছিল, হয়তো ভাবছিল পাব্লিক ডেকে ধোলাই টোলাই দেই কিনা ৷ যদিও ভদ্রলোকের কথার সাথে কাজের কোন মিল পেলাম না ৷ যাই হোক তাকে আর কিছু বললাম না, ঐ যাত্রায় কোন রকমে ফোন টা নিয়ে চলে আসলাম ৷

তীব্র শীতের দেশ থেকে ভ্যাপসা গরমের দেশে নেমে এক সপ্তাহ কেটে গেল আবহাওয়া ও প্রকৃতির সাথে শরীর মানিয়ে নিতে ৷ প্রথম কয়েকটা দিন আসলেই অনেক কষ্টের ছিল, রাস্তার অতিরিক্ত ধুলা, রোদের তীব্র উত্তাপ, আর ভ্যপসা গরমে যথেষ্ট কষ্ট পাচ্ছিলাম ৷ আস্তে আস্তে সব মানিয়ে নিয়ে বুঝতে পারলাম, এই চির চেনা আলো বাতাস গায়ে লাগিয়েই আমি ছোট থেকে বড় হয়েছিলাম ৷

আমার বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল ৷ মধ্যবিত্ত পরিবারের মত স্বল্প সীমাবদ্ধতার মধ্যে মোটামুটি আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে টা সম্পন্ন হয়েছিল ৷ বিয়েতে আনুষ্ঠানিকতা বলতে সব কিছুই খুব সাধারন মানের ছিল, তবে উল্লেখ করার মধ্যে যেটা ছিল তা হলো, বিশ জন মত অনাথ শিশু কে আমার নিমন্ত্রন করার সৌভাগ্য হয়েছিল ৷ বিয়ের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রন পেয়ে তাদের নিষ্পাপ মুখের হাসি টা আজো মস্তিস্কে জায়গা করে নিয়েছে, স্বপ্ন আছে তাদের জন্য জীবনে কিছু একটা করার ৷ সাধ্যের মধ্যে কিছু ৷

দেশে ভোগান্তির শুরু টা ছিল বিয়ের পর থেকে ৷ নতুন বউ কে শীঘ্রই জার্মানীতে নিয়ে আসতে হবে ৷ আমি জার্মানী থেকে সকল কাগজ পত্র প্রস্তুত করেই দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম ৷ বড় সমস্যা দেখা দিলো বউয়ের পাসপোর্ট করা নেই ৷ কাল বিলম্ব না করে বিয়ের পর দিন ই কুষ্টিয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ছুটে গেলাম জরুরী ভিত্তিতে পাসপোর্ট করার জন্য ৷ ব্যাংকে জরুরী পাসোপোর্টের অতিরিক্ত টাকা জমা দিয়ে ফরম পূরণ করে জমা দিয়ে সেদিন ই ছবি তুলে পাসপোর্ট করার প্রাথমিক কাজ শেষ করে ফেললাম ৷ তবে জীবনের সবথেকে বড় ভুল টা সেদিন ই করেছিলাম ৷ ভুল টা ছিল বউয়ের দুইটা ঠিকানা ব্যবহার করা ৷ স্থায়ী ঠিকানা নওঁগাতে বউয়ের বাবার বাসা এবং বর্তমান ঠিকানা কুষ্টিয়া চৌড়হাসে আমার নিজ বাসার ঠিকানা ৷ বাংলাদেশে সব থেকে বিরক্তিকর ও হয়রানী মুলক জিনিস টা সম্ভবত পুলিশ ভেরিফিকেশান ৷ কুষ্টিয়ার বাসাতে পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা আসলেন, এসে বাসায় ফ্যানের বাতাসে বসে নানান রকমের গল্প শোনালেন, ঘুষ দূর্নীতির বিরুদ্ধে তার বিভিন্ন প্রতিবাদের গল্প, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সোচ্চারের গল্প ও শোনালেন ৷ তবে সব শেষ করে বিদায়ের মুহুর্তে তিনি আমাকে হতবাক করে তার পুরাতন খাসলত বশত আমার কাছে তার মোটরসাইকেলের তেল খরচ বাবদ কিছু টাকা চেয়ে বসলেন ৷ কথা না বাড়িয়ে তাকে পাচঁশ টাকারো একটা নোট চার ভাজ করে দিয়ে দায় মুক্ত হলাম ৷

ততদিনে দশ টি দিন পেরিয়ে গেছে ৷ পাসপোর্ট জনিত কোন খুদে বার্তা তখনো বউয়ের মোবাইলে আসেনি ৷ কৌতুহল বশত পাসপোর্ট অফিসে ছুটে গেলাম ৷ তারা জানালো পুলিশ রিপোর্ট পৌছেনি ৷ তাহলে কি করতে হবে? এবার খোজ নিতে হবে ডি এস বি অফিসে, নতুন বউয়ের সামনে দুই দফা তল্লাশি ও মেইন গেটের কনস্টেবলের প্রশ্নাত্তর পর্ব শেষে ডি এস বি অফিসের বারান্দায় আধা ঘন্টা অপেক্ষায় থাকলাম, কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাই খুব ব্যস্ত, কেউ গরমে তরমুজ খাওয়ায় ব্যস্ত আবার কেউ পুরাতন ছিড়ে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া ফাইলে গুরুত্বপূর্ন কিছু খোজায় ব্যস্ত ছিল ৷ দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরে জানতে পারলাম নওঁগা থেকে তখনো পুলিশ রিপোর্ট এসে পৌছেনি ৷ নতুন বউয়ের সামনে খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম, বউ হয়তো ভাবছিল, আমার থেকে পুলিশের একজন কনস্টেবল ও বিয়ে করা ভালো ছিল, যেমন কথার তেজ, গুরু গাম্ভীর্য কন্ঠস্বর, সব কথাতেই কেমন যেন হম্বি তম্বি ভাব, দেখলেই মনে হয় এরা পৃথিবীতে ঐশ্বরিক ক্ষমতা নিয়ে জন্ম নিয়েছে ৷ নঁওগা তে তৎক্ষনাৎ ফোন করে জানা গেল কুষ্টিয়া থেকে তদন্ত জনিত কোন ফ্যাক্স তারা পায়নি ৷ অথচ কুষ্টিয়া অফিস থেকে আমাকে ফ্যাক্সের কপি দেখানো হলো যে তারা পাঠিয়েছে ৷ আজ অবধি আমার কাছে অজানা নঁওগা অফিস কেন কোন ফ্যাক্স পায়নি, ফ্যাক্সের কাগজ টা তাহলে কোথায় হারিয়ে গেল? আবারো নওঁগাতে ফ্যাক্স করা হলো আমার চোখের সামনে বসে ৷ এবার ফোন করে জানা গেল হ্যা এবার তারা ঠিক ই ফ্যাক্স পেয়েছে ৷ আবারো অপেক্ষার পালা, ততদিনে বাংলাদেশে আমার থাকার সময় শেষ হয়ে আসছে ৷ ঠিক পনের দিন পরে বউকে সাথে নিয়ে আবারো আমি পাসপোর্ট অফিসে ৷ পুলিশ রিপোর্ট তখনো আসেনি ৷ নওঁগা তে ফোন করা হলো, তারা রিপোর্ট পাঠিয়ে দিয়েছে ৷ বউয়ের সাথে আবারো কুষ্টিয়া ডিএসবি অফিসে ছুটে গেলাম ৷ বউয়ের সামনে আবারো দুই দফা তল্লাশি, নানাবিধ প্রশ্নাত্তর পর্ব ৷ এবার মেইন গেটের কনস্টেবল আমাকে সন্দেহ জনক তালিকাতে ফেলে দিল, হয়তো ভাবছে এই লোক দেখা যায় ঘন ঘন আসে, মতলব টা কি?

ডিএসবি অফিসে মনে হয় বন্ধু, বান্ধবী চাকরী টাকরী করে, আড্ডা মারতে আসে ৷ সে বলে বসলো “অফিসে যার কাছে যাবেন তার কাছে ফোন দ্যান”, আমি বললাম কারো কাছেই যাবোনা, পাসপোর্ট জনিত কাজ আছে ৷ আমি আবার যুক্তি দিয়ে গরু, ছাগল থেকে শুরু করে ঘাড় ত্যাড়া টাইপের মানুষ সহ প্রায় সবই সাইজ করে ফেলতে পারি ৷ তাই কনস্টেবল সাহেব কে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে খুব একটা বেগ পেতে হলোনা ৷ এবার ডি এস বি অফিসে গিয়ে জানা গেল তারা কোন ফ্যাক্স পায়নি ৷ তারা বুদ্ধি দিলো নওঁগাতে ফোন করেন, এখনি ওখান থেকে ফ্যাক্স করতে বলেন ৷ তাদের কথার ভাব দেখে মনে হলো নঁওগার ঐ তদন্তকারী কর্মকর্তা আমার কথায় কান ধরে উঠে আর বসে, বসে আর উঠে ৷ কি করে তাদের বোঝাবো নঁওগার ঐ লোক আমার টাকায় চলেনা ৷ যাই হোক পরবর্তী তে আবারো নওঁগা তে অনুরোধ করা হলো ফ্যাক্স করার জন্য ৷ পরের দিন ফোন করে জানা গেল, তারা ফ্যাক্স করতে যেয়ে এদের নাম্বার ব্যস্ত পায়, আবার বলে লাইন ঠিক নাই ৷ এরা বলে তাদের ফ্যাক্স মেশিন, ফোন লাইন সব ঠিক আছে ৷ এই নঁওগা- কুষ্টিয়ার লড়াইয়ের মাঝে আমি বেচারা বলির পাঁঠা ৷ অবশেষে আশাহত হয়ে বাসায় ফিরে আসলাম ৷ পরদিন নঁওগার তদন্তকারী কর্মকর্তা কে এক হাজার টাকা উপঢৌকন দিয়ে রিপোর্ট নিয়ে আমার শশুর মশায় কতৃক আমার ব্যক্তিগত ইমেইলে মেইল করিয়ে পুলিশ রিপোর্ট নিয়ে প্রিন্ট করে, ডি এস বি অফিসে আবারো দুই দফা তল্লাশি ও প্রশ্নাত্তর পর্ব সেরে জমা দিয়ে আসলাম ৷ ততক্ষনে আমার আনুমানিক হাজার খানেক টাকা রিক্সা ভাড়া বাবদ খরচ হয়ে গেছে, সেটা হয়তো নঁওগা আর কুষ্টিয়ার ডিএসবি অফিস জানে না ৷ তাদের জানার এত ঠেকা ও নাই ৷ তারা ব্যস্ত মানুষ কতদিকে আর খেয়াল রাখা যায় ৷

আবারো ফিরে আসি আমার সখের স্যামসাং এস সেভেন মোবাইল ফোন টাতে ৷ নতুন বউয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলাম, বেড়ানো শেষ করে ট্রেনে করে কুষ্টিয়াতে ফিরবো, সান্তাহার স্টেশনে ভীড় ঠেলে বউ নিয়ে ট্রেনে উঠলাম, আমার সিটে একজন মধ্য বয়সী খারাপ লোক বসা, লোক টা কে খারাপ বললাম এই জন্য, আমি সিট নাম্বার দেখানোর পরেও সিট থেকে সে উঠতে নারাজ ৷ তার সাথে দীর্ঘ পাঁচ থেকে দশ মিনিট তর্ক বিতর্ক, নানান রকম যুক্তি দেখানো ৷ আগেই বলেছি আমি যুক্তি দিয়ে ত্যাড়া ব্যাকা লোক সোজা করে দিতে পারি, এই ত্যাড়া লোক টা আমাকে যুক্তি খাটাবার সুযোগ ই দিচ্ছেনা, আমার যৌক্তিক কথার পিঠে কিছুই বলছেনা, চোখ বন্ধ করে চুপ করে বসে আছে ৷ কতভাবে বোঝাচ্ছি এই দেখেন বগির নাম্বার, টিকেটের নাম্বার ও সিটের নাম্বার কি সুন্দর কাটায় কাটায় মিলে যাচ্ছে কোন ভুল নেই এতে ৷ কাজেই এটা আমার সিট গণিত বইয়ের উপপাদ্য প্রমানের মত প্রমানিত বিষয় ৷ সব যৌক্তিক চেষ্টা ব্যার্থ হলে অবশেষে তার হাতে পায়ে ধরে সিট থেকে তোলার মত অবস্থা ৷ আমার বিশ্বাস ই হচ্ছিলোনা, আমার কেনা সিট নাম্বারে আমি ই বসতে পারছিনা, এই বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝে অজ্ঞাত পকেটমার সাহেব অবিশ্বাস্য ভাবে আমার সখের মোবাইল টা প্যান্টের ডান পাশের পকেট থেকে অলৌকিক ক্ষমতা বলে বের করে নিয়ে চলে গেলো, কি অপূর্ব তার হাতের কৌশল আমাকে টের টুকু পর্যন্ত দিলো না, সেদিন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম ৷ এত সূক্ষ হাতের কাজ মানুষ কিভাবে করে, পশ্চিমারা সূক্ষ কাজের জন্য রোবট হাত ব্যবহার করে, আর আমরা মানুষের হাত দিয়েই এমন সূক্ষ কাজ অবলীলায় করে ফেলতে পারি, আমি বিস্মিত সাথে ব্যাথিত ৷ এদিকে আবার আমার কপাল ভালো ও ছিল, স্টেশনে পৌছেই আমার বউ আমার ওয়ালেট টা তার হাত ব্যাগে নিয়ে রেখে ছিল, যেখানে আমার জার্মানীর রেসিডেন্ট পারমিট কার্ড, মাস্টার কার্ড সহ ছয় সাত রকমের কার্ড ছিল ৷ যেগুলা হারালে হয়তো আমার সাময়িক চিন্তায় আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত ছাড়া বিকল্প পথ ছিলনা ৷ ফোন টার জন্য খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম, করুন চোখে বউ আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ৷ আমার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আছে ৷ নিজের অসহায় অবস্থাতে ফ্যাকাসে মুখ নিয়ে বউয়ের সামনে খুব লজ্জা পাচ্ছিলাম ৷

নিজের পৌরষ ভাব ততক্ষনে টিস্যু পেপারের মত নেতিয়ে গেছে ৷ বউ আমার উচ্চ শ্রেনীর বুদ্ধিমতি ৷ সে প্রাইমারী ক্লাশ টিচারের মত করে বাংলা পড়া বোঝানো শুরু করে দিলো, “কষ্ট পেওনা সামান্য একটা মোবাইল ফোন ই তো গেছে আমাদের আরো তো অনেক বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারতো, তাইনা?” ইত্যাদি মারফতি টাইপের কথাবার্তা ৷ এদিকে কষ্টে আমার বুক ফেটে যায়, তৎক্ষনাৎ ঝোকের মাথায় বলেই বসলাম, “এর থেকে বড় বিপদ মানে? ফোন হারানোর থেকে বড় কোন বিপদ আমার জীবনে হতেই পারেনা ৷” বউ তখন শকড ৷ বউ আসলে বড় ক্ষতি বলতে বোঝাইতে চাচ্ছিলো তার নিজের ও কোন ক্ষতি টতি হতে পারতো ৷ এখন বউয়ের মুখ ফ্যাকাসে আর আমার দুই কান টেনশনে লাল ৷ বিয়ের পর থেকে এমনিতেই বউয়ের কাছে ভালোবাসার পরীক্ষা দিয়ে চলেছি, সে আমার সব ধরনের কাজ এবং কথাতেই নম্বর দিতো, তাকে কতটুকু ভালোবাসি তার নম্বর ৷ আমি পাশ করলে খুশি হতো আর ফেইল করলে আমার জীবনে দশ নম্বর বিপদ সংকেতের লাল ফ্লাগ টানিয়ে দিতো ৷ অন্যবার মোটামুটি পাশ মার্ক পেলেও আজ মনে হয় এক ধাক্কাতে আই এম জিপিএ ফাইভ হয়ে গেছি ৷ মনের দুঃখ খুলে বললাম রেলওয়ে পুলিশ কে ৷ পুলিশের চোখ মুখের ভাব দেখে মনে হলো পাঁচ টাকার ইকোনো বলপেন হারাইছে আর আমি তার শোকে বিবাগী ৷ যাই হোক পুলিশ ডেকে কোন সুরহা হলোনা ৷ সামান্য একটা ফোনের সন্ধান করতে তারা অপারগ, তারা আসলে কোটি কোটি টাকা মুল্যের অবৈধ গাঞ্জা হিরোইন উদ্ধারে ব্যস্ত ৷ আসলে এই যুগে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন গুলা যে কত আপন আর মূল্যবান হতে পারে তা শুধু তারাই বুঝতে পারে ৷ টেনশন হচ্ছিলো ফোনে ব্যাংক একাউন্ট সহ ক্রেডিট কার্ড একাউন্ট সব লগইন করা ছিল ৷ কোন বড় বিপদ না হলেই হয় ৷ এদিকে দেশ ছেড়ে জার্মানীতে আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে, বউয়ের পাসপোর্ট তত দিনে ও রেডি হয়নি, ফোন হারিয়ে দিশেহারা ৷

সবথেকে লজ্জার বিষয় হচ্ছে চৌদ্দই এপ্রিল পয়লা বৈশাখের দিনে বউ সহ বড় একটা সময় কাটাতে হয়েছে থানার বারান্দায় ৷ ফোন হারিয়ে কুষ্টিয়া থানায় জিডি করেছিলাম ৷ সেই দরকারে পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলার জন্য দীর্ঘ দেড় থেকে দুই ঘন্টা থানার বারান্দায় বসে নতুন বউ কে মশার কামড় খাইয়েছি, নিজেও খেয়েছি ৷ সবথেকে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে বিয়ে পরবর্তী দম্পতিদের সময় কাটে আনন্দ বিলাসে সমুদ্রের কাছাকাছি ৷ সত্যি বলতে একটু বড় রকমের সুখের আশায় সেই সখ আহ্লাদ আমরা পূরন করতে পারিনি ৷ বিয়ে পরবর্তী দুই একটা দাওয়াত কপালে জুটে ছিল ঠিকই তবে আমাদের মধু চন্দ্রিমার গন্ডি ছিল পাসপোর্ট অফিস, ডি এস বি অফিস আর কুষ্টিয়া থানা পর্যন্ত ৷ বড় রকমের দূর্ভাগ্য নিয়েই হয়তো দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম ৷

জার্মানীতে প্রফেসরের কাছে ইমেইল করে ছুটি এক মাস মত বাড়িয়ে নিয়ে ছিলাম ৷ সব মিলিয়ে দেশে কাটিয়েছি প্রায় দুই মাস মত ৷ দুই মাসে যতটুকু বুঝলাম বাংলাদেশে প্রশাসনিক কাজ গুলাতে সাধারন মানুষ খুব ই অসহায় ৷ পাসপোর্ট করার সময় আমাকে অনেকেই উপদেশ দিয়ে ছিল দুই নাম্বার লাইন ব্যবহার করার, অর্থাৎ দালাল ধরে করার জন্য ৷ কিন্তু আমি তাদের উপদেশ উপেক্ষা করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে সঠিক পথ ব্যবহার করে নিজে যেমন ভোগান্তি সহ্য করেছি, তেমনি অন্যদের উপহাসের পাত্র ও হয়েছি ৷ আসলে দেশে কিছু কিছু সিস্টেম বদলানো খুব জরুরী ৷ খুব বেশি জরুরী ৷

দেশে আমার শেষ দিন ৷ বউ সহ ঢাকায় পৌছেছি ৷ একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসলো ৷ রিসিভ করলাম, কুষ্টিয়া ডিএসবি অফিস থেকে পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা ফোন করেছেন ৷ রিসিভ করলাম, বউ সহ আমি কোথায় আছি জিজ্ঞেস করলো, বললাম যে ঢাকায় আছি ৷ তখন সে আমাকে বললো শিগগির আপনার বউয়ের কুষ্টিয়ার নাগরিকত্বের সনদ নিয়ে ডি এস বি অফিসে চলে আসেন তো ৷ আমি একেবার শতভাগ হতবাক ৷ বাংলা চলচিত্রের কিংবদন্তি আনোয়ার হোসেনের মত বুক খামচে ধরে পড়ে যাবার মত অবস্থা ৷ এই রকম কান্ডজ্ঞান হীন লোক কি করে পুলিশে চাকরী পায়, নাকি চাকরী পাবার পর কান্ডজ্ঞান লোপ পায় ৷ তাকে আবারো স্মরণ করিয়ে দিলাম আমি ঢাকায় আছি আর আগামীকাল ভোরে আমার ফ্লাইট ৷ তাছাড়া বউয়ের নাগরিকত্বের সনদ কুষ্টিয়াতে থাকলে কেন নঁওগার ঠিকানা ব্যবহার করতে যাবো ৷ তাকে মনে করিয়ে দিলাম আপনি বাসায় এসেছিলেন, তাকে আরো মনে করানোর চেষ্টা করলাম, পাঁচশ টাকার পেট্রল খরচের কথা ৷ সে হয়তো পাঁচশ টাকা পকেটে রাখার কথা টা ভুলে গেছিলো, তার ই বা দোষ দেই কি করে, কত জায়গা থেকেই তো কতকিছু পায় কয়টা ই বা তার মনে থাকে মানুষের মন বলে কথা ৷ যাই হোক যুক্তি দিয়ে মনে হলো এ যাত্রায় তাকে বোঝাতে সক্ষম হলাম ৷ আমার বউ যে মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল না সেটা মেনে নিতে অবশেষে রাজি হলো ৷

আজ আমি জার্মানী থেকে লিখছি ৷ গত বারো দিন হলো আমি দেশ ছেড়েছি ৷ আমার বউ এখনো বাংলাদেশে ৷ আমার কাছে আসবার জন্য সে ব্যকুল হয়ে কখনো সরবে আবার কখনে নিরবে কাঁদছে ৷ প্রতিদানে আমি কাঁদতে পারিনা ৷ পুরুষ মানুষের এই এক বড় সমস্যা, চোখে সহজে পানি আসতে চায়না, আর মেয়েরা চোখের পানিতে বিশ্বাসী ৷ চোখে পানি নেই মানে হচ্ছে মনে কষ্ট দুঃখ নেই ৷ তার ধারনা আমি অনেক ভালো আছি, যত দুঃখ কষ্ট সবই তার ৷ জরুরী পাসপোর্ট আবেদন করার আজ এক মাস বারো দিন পেরিয়ে গেছে, বৈধ ভাবে আবেদন করা জরুরী পাসপোর্ট এখনো সে হাতে পায়নি ৷ আমার সখের মোবাইল ফোন টা আজ কে ব্যবহার করছে আমি তার কিছুই জানিনা ৷ তবে আমার দেশের কোন একজন ব্যক্তি হয়তো বেওয়ারিশ ফোন টা ব্যবহার করছেন ৷ যে দেশের আলো বাতাসে আমি বড় হয়েছি সেই দেশের ই কোন একজন ব্যক্তি আমার ফোন টা ব্যবহার করছেন ৷ ব্যবহারকারী ব্যক্তিটি বেওয়ারিশ নাও হতে পারে তবে আমার ফোন টি এখনো বেওয়ারিশ ৷

মাহবুব মানিক
সাইন্টিফিক রিসার্চার
মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লাইড সাইন্স ৷
হালে, জার্মানী ৷