• আপনি কি ডয়েচ ভিসুম পেয়ে গেছেন এবং জার্মানী আসার জন্য মনটা আনচান করছে?
  • আপনি কি জার্মান ভিসার আশায় দিনরাত এম্বাসীর ওয়েবসাইটে ঢু মারছেন, কিন্তু ভিসার কোন হদিস পাচ্ছেনা না?
  • “দোস্ত, হইয়া গেলি তো জার্মান। এবার ওয়েস্টিনে খাওয়া !!!” এইসব বলে কি আপনার বন্ধুরা আপনাকে অনবরত পেইন দিচ্ছে?
  • “ভাইয়া, আপনার কি জার্মান পাসপোর্ট হয়ে গেছে?” আপনি কি দুরসম্পর্কের আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে, এই ধরণের উদ্ভোট প্রশ্নের সম্মুখিন হচ্ছেন।
  • আপনার গার্লফ্রেন্ড কি আপনার সামনে অনবরত ন্যাকা কান্না কানতেছে আর বিলাপ করতেছে, “তুমি তো জার্মানী গিয়ে সুন্দরী একটা জার্মান মেয়েকে বিয়া করে ফেলবা ! এখন আমার কি হবে রে !!!”
  • আপনি কি ফেইসবুকের ইনবক্সে, প্রায়-ই অচেনা অজানা আইডি থেকে এই রকম মেসেজ পাচ্ছেন, “ভাইয়া আমি অমুক-তমুক। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা শামুক-ঝিনুক। আমি জার্মানীর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের, কোন সাবজেক্টে পড়ালেখা করলে, জীবনে উন্নতি সাধন করতে পারব ! একটু বলবেন ভায়া। প্লিজ ! প্লিজ ! প্লিজ ! এড মেহ !”

উপরের ব্যাপারগুলো যদি আপনার জন্য সত্য হয়ে থাকে, তাহলে লেখাটা আপনার জন্য। এই লেখায়, প্রথমবারের মত বিদেশ ভ্রমণের ব্যাপারে বিস্তারিত বয়ান দেয়ার চেস্টা করেছি। আশা করি আপনাদের উপকারে আসবে।

মানসিক প্রস্তুতিঃ

প্রথমবারের মত পরিবার আর স্বদেশ ছেড়ে আসার ব্যাপারটা আসলে খুব বেশী সহজ না। তখন শারীরিক এবং মানসিক, এই দুই প্রকার দূর্বলতা-ই, খুব ভয়ঙ্করভাবে কাজ করে। জিজ্ঞেস করতে পারেন, শারীরিক দূর্বলতা কোত্থেকে আসল? আসার আগে আগে, যে পরিমাণ দৌড়াদৌড়ি করতে হবে, তাতে এমনিতেই দূর্বল হয়ে পড়বেন, ফর শিওর।

আর পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুবান্ধবেরাও এই সময় খুব ইমোশনাল হয়ে যায়। তাই সবাইকে ঠিক রাখার জন্য, আপনাকে অন্তত শক্ত থাকতে হবে। শক্ত মনে সকল ইমোশনকে দমন করতে হবে।

আর নতুন পরিবেশে, নতুন কালচারের সাথে খাপ খাওয়ানোটাও প্রথম প্রথম কঠিন হয়ে যায়। তাই একটা কাজ করতে পারেন। জার্মান কালচারের উপর কিছু ডকুমেন্টারী দেখতে পারেন কিংবা আর্টিকেল পড়তে পারেন। আর আপনার কোর্সে কারা কারা যাচ্ছে, তাদের সাথে ফেইসবুক কিংবা অন্য কোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগের চেস্টা করতে পারেন। এতে নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোটা, অনেকটাই ইজি হয়ে যাবে।

আরেকটা অনুরোধ। যদিও এটা আমার একটা ব্যাক্তিগত আর্জি বলতে বলতে পারেন। একটা বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে যাবার চেস্টা করবেন প্লিজ। ছোট হলেও সমস্যা নাই। মাঝে মাঝে এই জিনিসটা, আমাদের মনের মাঝে অনেক বড় অনুপ্রেরণার জন্ম দেয়। এতকিছুর ভিড়ে, এইটুকু তো নেয়াই যায়। তাই না। 🙂

বাজার-সদাইঃ
বাজার-সদাই নিয়ে আমি একটা বিশদ লেখা লিখেছিলাম, কোন এক কালে।

শপিং টিপস (কি কিনব, আর কি কিনব না ) এবং ভ্রমণ টিপস (Tousif Bin Alam)

যদি সময় হয়, তাহলে লেখাটা পড়ে নেবেন। এখানে মোটামুটি সব ব্যাপারেই বিশদ আলোচনা করা আছে। তারপরেও কিছু কথা বলি।

শপিং শুরুর আগে অনেকেই, ২ কেজি আলু, ৩ কেজি পটল, ৬ টা তিব্বত বল সাবান টাইপের লিস্ট করে ফেলে। এটা অবশ্য খারাপ না। কারণ, এতে করে জিনিসপত্রের ট্র্যাক রাখতে সুবিধা হয়।

তবে একটা ইম্পর্টেন্ট জিনিস। প্রতিটা জিনিস কেনার পরে, অবশ্যই জিনিসটার ওজন করে লিখে রাখবেন। যদি ওজন করার কিছু না থাকে, তাহলে একটা রাফ ওয়েট লিখে রাখবেন। এতে করে শেষ মুহূর্তে ওজন নিয়ে ঝামেলায় পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়। আর অবশ্যই লাগেজের ওয়েট কাউন্ট করতে ভুলবেন না। পরে দেখা যাবে, জিনিস পত্রের ওজন-ই ৩০/৪০ কেজি হয়ে গেছে। আর লাগেজের ওজন ৮/১০ কেজি। তখন নিজের মাথার চুল নিজেই ছিড়বেন।

আর যে জিনিসটার বাপারে আবারও রিমাইন্ডার দিতে চাই, তা হল, কোন ইলেকট্রনিক্ গেজেট বাংলাদেশ থেকে কেনার দরকার নাই। আর শপিং করার আগে, আপনি যে শহরে যাচ্ছেন, ওই শহরে বা তার আশেপাশের শহরে যদি কোন পরিচিত বাংলাদেশী থাকে, তার/তাদের পরামর্শ নিতে একদম-ই ভুলবেন না। কারণ জার্মানীর সব শহরে কিন্তু, আমাদের দেশী প্রোডাক্ট এভেইলেবেল না। যেমন, বার্লিন কিংবা মিউনিখের মত সিটিতে রুটির বেলন থেকে শুরু করে বালতি-বদনা সহ সবকিছুই পাওয়া যায়। আবার অনেক ছোট সিটিতে, সুপার মার্কেট-ই অনেক দূরে থাকে। তাই অগ্রজদের থেকে পরামর্শ নেয়াটা খুব-ই জরুরী।

কাগজপত্রের ব্যাপারে এক্সক্লুসিভ টিপসঃ
আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “জার্মানী গিয়ে কি করবা?”, তাহলে আপনি কি উত্তর দেবেন?

অনেকেই বলবেন, “পড়াশোনা শেষ করে জব করব”, “কেউ বলবে আরও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করব”।

কিন্তু বাস্তবে আমরা যে কি করব, সেটা মহান স্রষ্টা ছাড়া আর কেউ-ই বলতে পারে না। তাই সব পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। আপনার হয়তো পিএইচডি বা উচ্চতর ডিগ্রী নেয়ার একদম-ই ইচ্ছে নাই। কিন্তু অনিচ্ছা স্বত্বেও এপ্লাই করতে হচ্ছে। তখন আপনার অনেক ডকুমেন্টসের-ই প্রয়োজন হবে। (অনেকেই আবার, জার্মানী এসেও সাবজেক্ট/ইউনিভার্সিটি চেঞ্জ করে। তাদের জন্য ও ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ।) আমার মনে হয়, ইচ্ছে থাকুক আর না-ই থাকুক, কিছু ডকুমেন্ট প্রিপেয়ার করে আনা, সবার জন্য মঙ্গলময়।

এখন দেখা যাক, কি ধরণের ডকমেন্ট প্রিপেয়ার করে আনতে হবে।

  • ব্যাচেলর/মাস্টার্সের ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট এবং অন্যান্য কাগজপত্রের নোটারাইজড/সিলড কপি।
  • আপনার ব্যাচেলর/মাস্টার্সের  প্রফেসরদের কাছ থেকে কিছু রিকোমান্ডেশান লেটার।
  • আপনার পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, বিবাহ সনদ (যদি থাকে), ভোটার আইডি সহ পার্সোনাল ডকুমেন্টগুলোর নোটারাইজড কপি।
  • আপনার কোন জব এক্সপেরিয়েন্স/রিসার্চ এক্সপেরিয়েন্স থাকলে, সেগুলোর ভ্যালিড/নোটারাইজড কপি
  • আইইএলটিএস/জিআরই/টোফেল এবং সমমানের এক্সাম ডকুমেন্টের ভ্যালিড/ নোটারাইজড কপি।
  • এসএসসি, এইচএসসি এবং সমমানের পরীক্ষার সনদ এবং মার্কশিটের নোটারাইজড কপি।

সবগুলো ডকুমেন্ট-ই ৫-১০ কপি করে নিয়ে আসলে ভাল। কারণ পরবর্তীতে এগুলো বাংলাদেশ থেকে পাঠানোটাও ঝামেলা। আর আপনার জন্য দৌড়াদৌড়ি করে এগুলা যোগাড় করে দেবে, এমন লোক খুজে পাওয়াও মুশকিল। তাই প্রথমবারেই নিয়ে আসাটাই উত্তম।

টিকেট কাটাকাটিঃ

প্রথমবারের মত প্রবাসে আসার সময়, লাগেজের ওজনটা একটা বিশাল ফ্যাক্ট থাকে। তাই, যেই এয়ারলাইন্সে লাগেজ এলাওয়েন্স বেশী দেয়, সেটা্কেই চুজ করা উচিত। এক্ষেত্রে ৩-৪ হাজার টাকা বেশী ভাড়া গুনতে হলেও, আপত্তি করা উচিৎ নয়। মাঝে মাঝে এজেন্সীগুলোরও লাগেজ এলাওয়েন্স বাড়িয়ে দেয়ার সুযোগ থাকে। তাই টিকেট কাটার সময়, এজেন্সীর কর্মকর্তাদেরকে এই ব্যাপারে একটু অনুরোধ করবেন।

আপনি যদি পরবর্তী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ভ্রমণের প্ল্যান করে থাকেন, তাহলে একসাথে রিটার্ণ টিকেট কেটে নিতে পারেন। তাহলে খরচ কম পড়বে। এক্ষেত্রে একটা এপ্রোক্সিমেট ডেইট দিয়ে রাখতে পারেন এবং পরে ডেটটা চেঞ্জ করতে কত খরচ পড়তে পারে, এই ব্যাপারে অবশ্যই জেনে নেবেন।

নিচে একটা ছোটখাট এয়ারলাইন্স রিভিউ দিলাম (নিজের এবং বন্ধুবান্ধবদের মতামতের ভিক্তিতে)। তবে বিভিন্নজনের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্নও হতে পারে। তাই, এটাকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে নেবেন না প্লিজ।

টার্কিশ এয়ারলাইন্সঃ বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে চমৎকার ফ্লাইট দেয় টার্কিস এয়ারলাইন্স। ওদের এয়ারবাস এ-৩৩০ আসলেই জোস (বাংলাদেশ থেকে ফ্লাই করা ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বেস্ট)। কিন্তু Istanbul এ এয়ারপোর্ট সার্ভিস খুব-ই বাজে। তার ওপরে ফ্রি ওয়াইফাই নাই। পুরো সময়টা-ই প্যাথেটিক কাটে। কিন্তু লাগেজ এলাওয়েন্স বেশী দেয়। ৪০ কেজি। এটা একটা পজিটিভ দিক।

এমিরেটসঃ এই এয়ারলাইন্সের ফুটানি খুব বেশী। দাম রাখে সোয়া সের। কিন্তু কামের কাম কিছু নাই। বাংলাদেশ থেকে দেয় বোয়িং -৭৭৭। প্লেনের সার্ভিস মোটামুটি। কিন্তু এয়ারপোর্ট সার্ভিস খুব একটা ভাল না। ৩০ মিনিটের জন্য ফ্রি ওয়াইফাই দেয়। বাকি সময় ফক্কা। মাছি মারবেন আর ক্যান্ডি ক্রাস খেলবেন। কিন্তু দুবাই থেকে জার্মানীর বেশ কিছু বড় শহর পর্যন্ত অফার করে, একটা অসাধারণ জিনিস। পৃথিবীর সবচেয়ে লাক্সারিয়াস এবং বিগেস্ট ফ্লাইট এয়ারবাস এ-৩৮০। কারও যদি ডাবলডেকার এয়ারবাস, এ-৩৮০’র এক্সপেরিয়েন্স নেয়ার ইচ্ছে থাকে, তাহলে এমিরেটস চুজ করতে পারেন। কিন্তু লাগেজ এলাওয়েন্স দেয়, মাত্র ৩০ কেজি।

কাতার এয়ারলাইন্সঃ আমার প্রথম পছন্দ। বাংলাদেশ থেকে দোহা পর্যন্ত প্লেনটা খুব একটা ভাল না। এয়ারবাস এ-৩৩০ এর পুরাতন ভার্সন। কিন্তু এয়ারপোর্ট সার্ভিস খুব-ই ভাল। অল টাইম ওয়াইফাই। দোহা থেকে জার্মানীর প্লেনটাও সেইরকমের। এয়ারবাস এ-৩৫০। লাগেজ এলাওয়েন্স দেয় ৪০ কেজি। সব মিলিয়ে কাতার আমার কাছে সেরা।

ইতিহাদঃ ফ্লাইট মোটামুটি দুই রুটেই ভাল। কিন্তু এয়ারপোর্ট সার্ভিস ভাল না। আর এয়ারপোর্টের কর্মচারীরা নাকি, বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদেরকে প্রায়ই হেরাস করতে চায়। একজনের কাছে নাকি আইইএলটিএসের সার্টিফিকেটও দেখতে চেয়েছিল !!! ভাড়া কম। কিন্তু লাগেজও কম দেয়। মাত্র ৩০ কেজি। মাঝে মাঝে সেই এলাওয়েন্স নাকি ২৩ কেজি পর্যন্তও নেমে যায় । কিভাবে সম্ভব, আল্লাহ মালুম।

সৌদি এয়ারলাইন্সঃ প্রচুর লাগেজ এলাওয়েন্স। ভাড়াও রিজোনেবেল। কিন্তু ট্রানজিট টাইম, এয়ারপোর্ট সার্ভিস, ফ্লাইট- সব-ই নাকি ফালতু। এবং মাঝে মাঝে বাংলাদেশী হিসেবে, বেশ রেসিজমের ও শিকার হতে হয় (অনেকের অভিজ্ঞতা থেকে বলে)। একদম-ই রিকোমান্ডেড না।

ওমান, কুয়েত এয়ারলাইন্সঃ আই ন জানি !!! (আমি জানি না)

আশা করি উপরের রিভিউ গুলো আপনাকে কিছুটা হলেও ফ্লাইট বেছে নিতে সহায়তা করবে।

 

লাগেজ টিপসঃ

যদি আপনার টোটাল লাগেজ এলাওয়েন্স ৩০ কেজি হয়, তাহলে আপনি ১ টা লাগেজ নিতে পারবেন। আর ৪০ কেজি হলে, ২ টা। কিন্তু কোনটাতেই ৩০ কেজির বেশী নিতে পারবেন না।

সাথে হ্যান্ড লাগেজ। ৭-৮ কেজি। কিন্তু মনে রাখবেন। আপনি হ্যান্ড লাগেজ নিতে পারবেন, “দুইটা”। একটা ল্যাপটপের ব্যাগ(যেটা পিঠে নেবেন)। আরেকটা ট্রলি অথবা ক্যারিং লাগেজ।

ইম্পোর্টেন্ট টিপসঃ সাধারণত এয়ারপোর্টে কিন্তু ল্যাপটপের ব্যাগের ওজন চেক করা হয় না। তাই ওইটা নিয়ে চিন্তার কিছু নাই। অন্য যেই হ্যান্ড লাগেজটা নেবেন, ওটার ওজনটা-ই ঠিক রাখার চেস্টা করবেন। সাধারণত, ওটার ওজন-ই চেক করা হয়।

একটা ছোট পাসপোর্ট ক্যারিং ব্যাগ নেয়া ভাল। এতে আপনার পাসপোর্ট, এয়ার টিকেট, বোর্ডিং পাস এবং প্রয়োজনীয় কাগজ গুলো সবসময় সাথেই থাকবে। বার বার পিঠের ব্যাগ থেকে কাগজ বের করার ঝামেলা পোহাতে হবে না।

আর হ্যান্ড লাগেজে আপনার অফার লেটার, এনরোলমেন্ট লেটার, আইইএলটিএসের সার্টিফিকেট সহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো অবশ্যই অবশ্যই রাখবেন। কারণ প্রথমবার আসার সময়, এই জিনিসগুলো অনেক জায়গায়-ই দেখতে চায়।

আরেকটা ইম্পোর্টেন্ট জিনিস। মাঝে মাঝে ট্রানজিটে গোলমালের কারণে, মেইন লাগেজ ডেস্টিনেশানে পৌছাতে দেরী করে (১-২ দিন)। তাই হ্যান্ড লাগেজে অবশ্যই এক সেট কাপড় রাখবেন, যেন বিপদে পড়লে পরতে পারেন। আর ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইলের চার্জার গুলো অবশ্যই হ্যান্ড লাগেজে রাখতে ভুলবেন না।

আর মেইন লাগেজটা হালকা এবং ভাল চাকাওয়ালা নাকি, তা দেখে নেবেন। সস্তা লাগেজ কিনতে গিয়ে যদি দেখেন পথের মধ্যেই চাকা ভেঙ্গে গেছে, তখন কিন্তু কান্নাকাটি করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। তাই মজবুত এবং হালকা টাইপের লাগেজ কেনার ট্রাই করবেন।

 

হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের টিপসঃ

ব্যাগ গুছানো শেষ। সবকিছু সেট। সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়া শেষ। এখন শুধু বিদায়ের অপেক্ষা।

ভ্রমণের সময় হালকা জামাকাপড় পরবেন। টিশার্ট, জিন্স আর হাল্কা একটা জ্যাকেট রাখাটা-ই এনাফ। কারণ, অনেক এয়ারপোর্টে জুতা মোজা থেকে শুরু করে, গেঞ্জি -প্যান্ট পর্যন্ত খুলতে হয় !!! তাই হালকা কাপড় পরাটাই উত্তম। অনেকেই বাইরে যাওয়ার সময় স্যুট টাইপের ভারী পোষাক পরে। এটা জার্নিতে খুব-ই আনকমফোর্টেবাল। এবং সিকিউরিটি চেকিং এর সময়ও পেড়াদায়ক। তাই, এই ধরণের ভারী পোষাক এভয়েড করাটাই উত্তম।

মহা গুরুত্তবপূর্ণ টিপসঃ এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগে অবশ্যই অবশ্যই অনলাইন চেক ইন করে যাবেন। এতে আপনার এয়ারপোর্টে মিনিমাম দুই ঘন্টা লাইনে দাড়ানোর কষ্ট কমে যাবে।

কিভাবে করবেন অনলাইন চেক ইনঃ আপনার এয়ারলাইন্সের ওয়েবসাইটে ঢুকলেই, অনলাইন চেক ইনের অপশন পেয়ে যাবেন। ওখানে টিকেটের বুকিং রেফারেন্স নাম্বার আর লাস্ট নেইম দিয়ে ‘ওকে’ করলেই, আপনার অনলাইন চেক ইনের কনফার্মেশানটা পেয়ে যাবেন। ওইটা প্রিন্ট করে কিংবা মোবাইলে নিয়ে গেলেই হয়ে যাবে। যেহেতু বাংলাদেশে চাইলেই ঝামেলা করতে পারে, এরকম একটা ব্যাপার আছে। তাই অনলাইন চেক ইন কনফার্মেশানের, প্রিন্ট আউট কপি নিয়ে যাওয়াটা-ই ভাল। এতে ভেজাল মুক্ত এবং নিশ্চিন্ত মনে থাকা যায়।

সাধারণত ফ্লাইট টাইমের ২৪-৩৬ ঘন্টা আগে অনলাইন চেক-ইনের অপশন চালু হয় এবং ৬-১২ ঘন্টা আগে পর্যন্ত চালু থাকে। তাই, সময়টা খেয়াল রাখবেন।

এর পরে কি করবঃ এয়ারপোর্টে পৌছানোর পরে দেখবেন, এয়ারপোর্ট চেক ইনের একটা বিশাল লম্বা লাইন। কম করে হলেও, ৫০-১০০ মানুষ আপনার সামনে থাকবে। আর পাশেই দেখবেন, অনলাইন চেক-ইন। ওই লাইনে থাকবে, ম্যাক্সিমাম ৫-১০ জন। নগদে, ওই লাইনে দাঁড়িয়ে যাবেন। দেখবেন ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই ব্যাগেজ ড্রপ করে আপনি ঝামেলামুক্ত। আর অনলাইন চেক ইন না করলে, ১.৫-২ ঘন্টা ধরে লাইনে দাড়ানোর পেইন। কি দরকার, এত পেইন নেয়ার।

আমি শপিং সংক্রান্ত একটা লেখায় লিখেছিলাম, এয়ারপোর্টে বেশী ওজন নেয়া কোন ব্যাপার-ই না। কিন্তু এখন আর এয়ারপোর্টে সেইরকম শিথিলতা নাই। এয়ারপোর্টে প্রতিটা জিনিস-ই এখন অনেক কড়াকড়ি। তাই লাগেজের ওজন, আগে ভাগে ঠিকমত চেক করে নেবেন। ইদানিং কিছু মামারা সিকিউরিটি চেক ইনের আগে ওয়েট মেশিন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হ্যান্ড লাগেজ মাপার জন্য। এইসব মামা থেকে সাবধান। এরা ৫০০ গ্রাম বেশী পেলেও ঝামেলা শুরু করে। এবং শেষ পর্যন্ত টাকা-পয়সা দিয়ে দফারফা না করে কোন উপায় থাকে না।

ট্রানজিট এয়ারপোর্টের কাহিনীঃ

প্লেন থেকে নেমে সিকিউরিটি চেক ইনের পরে, আপনার পরের ফ্লাইটের গেইট নম্বরটা অবশ্যই দেখে নেবেন। নাহলে শেষ মুহুর্তে দৌড়াদৌড়ি লেগে যাবে। বড় বড় এয়ারপোর্টগুলোতে, গেইট নম্বর খুজে পেতে অনেক সময় ঝামেলা হয়ে যায়। কারণ, এক টার্মিনাল থেকে আরেক টার্মিনাল মেলা দূরে। তাই আগে ভাগে নিজের গেইটটা খুজে নেয়ার চেস্টা করবেন। দরকার হয়, ঐ গেইটের কাছাকাছি কোথায় বসে চিল করেন। নো প্রবলেম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দৌড়ঝাপের কোন দরকার নাই।

আগেই বলেছিলাম, মিডেল ইস্ট ভিক্তিক কিছু এয়ারলাইন্সের এয়ারপোর্ট সার্ভিস খুব-ই বাজে। সাধারণত আমাদের (উপমহাদেশীয়দের) সাথে খুব একটা ভাল আচরণ করতে চায় না। তাই, এদের সাথে একটু কেয়ারফুলি ডিল করবেন।

আর হ্যান্ড লাগেজ সাবধানে রাখবেন। কারণ, এয়ারপোর্টে কে যে চোর, আর কে যে ভাল মানুষ, এটা বোঝার কোন উপায় নাই।

 

জার্মানী পৌছানোর পরঃ

আপনাকে যদি কেউ এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে আসে, তাহলে খুব-ই ভাল হয়। এতে অনেক ঝক্কি ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই ব্যাপারে স্থানীয় বাংলাদেশী কোন ভাই-বোনদের অনুরোধ করতে পারেন। অথবা আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। ওরা অনেক সময়, নতুন ছাত্রছাত্রীদেরকে রিসিভ করার ব্যাবস্থা করে থাকে।

তারপরেও, অনেক সময় বড় বড় এয়ারপোর্টে, একজন আরেকজনকে খুজে পাওয়াটা মুশকিল হয়ে যায়। তাই, এয়ারপোর্ট থেকে আপনার ফাইনাল ডেস্টিনেশানে কিভাবে যেতে হয়, সেই ব্যাপারে আগেভাগে একটু হোম ওয়ার্ক করে নেবেন। দরকার হয়, কাগজে কলমে লিখে রাখবেন অথবা মোবাইলে সেইভ করে রাখবেন। এতে করে, আপনার এটেন্ডেন্টকে কোন কারণে খুজে না পেলেও সমস্যা নাই। কোন না কোন রাস্তা, নিজে থেকেই খুজে বের করতে পারবেন।


শেষ করছি, নিজের কিছু কথা দিয়ে।

নিজের দেশকে ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি দেয়াটা আসলে অনেক কস্টের। এই দূরের পথ পাড়ি দেয়ার জন্য অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা এবং অনেক কঠোর প্রচেস্টা থাকলেও, যাবার মুহুর্তের বেদনাটা আসলেই অন্যরকম।

আমি ভিসা পাবার মাত্র ৩ দিনের মাথায়, জার্মানীতে রওনা হই। আসলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই, একটা ঘোরের মধ্যে প্লেনে উঠে পড়ি। প্রথমবারের মত পরিবার ছেড়ে দেশের বাইরে যাচ্ছি। এয়ারপোর্ট টার্মিনালে অস্রুভেজা কিছু চোখ। অন্যরকম একটা অনুভূতি।

প্লেন রানওয়ে তে ছুটে চলেছে। আমি শেষবারের মত, আমার জিপি নম্বর থেকে কল দিলাম আমার আম্মাকে এবং এরপর নিশিকে। দুজনেরই কান্নায় ভাঙ্গা কন্ঠস্বর। অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্য, ওইদিন তাদের কান্নাভেজা কন্ঠ, আমার দুই চোখে কোন জল-ই আনতে পারেনি।

একসময় প্লেনটা, রানওয়ে ছেড়ে পাড়ি দেয় আকাশপানে। আমি প্লেনের সেই ছোট্ট জানালা দিয়ে, শেষবারের মত চিরচেনা শহরটাকে দেখি। যতই সময় যাচ্ছিল, নিজের চেনা শহরটা আস্তে আস্তে অচেনা হয়ে উঠছিল।

ঠিক সেই মুহুর্তে আমার পুরো বুকটা ডুকরে ওঠে, অজানা এক কস্টে। আবার কবে দেশে ফিরে আসব, জানি না। আদৌ বেচে থাকব কিনা, তাও জানিনা। আর দেশে যাদেরকে যেমনভাবে রেখে যাচ্ছি, তারাও কি ঠিক তেমনি থাকবে? এসব অজানা আশংকার কথা ভাবতে ভাবতে, নিজের অজান্তেই চোখ দুটো বেদনার জলে ভেসেছিল সেদিন।

আজ অনেকদিন পরের কথা, পৃথিবীটা আজও নিজ নিয়মে ঘুরছে। মহাকাশের সব নক্ষত্ররা, আজও একইভাবে ছুটে চলেছে। আমাদের জীবনও কেটে যাচ্ছে, জীবনের নিয়মে। কিন্তু প্রথম যাত্রা, এই জিনিসটা সবসময়েই মনের আকাশে অনন্য হয়ে আছে এবং থাকবে। হয়তো স্মৃতি হয়ে, কিংবা বিস্মৃতি হয়ে।

আপনাদের সকলের যাত্রা শুভ হোক, এই কামনা করি। গুটে রাইজে।


আরো পড়তে পারেনঃ