আজ আমার বাবার প্রথম প্রয়াণ দিবস। সবাই বাবার পরলোক জীবনের মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করবেন। আজ ২০ শে ডিসেম্বর ২০১৫, বছরের এই দিনটি আমার জন্য ও আমার পরিবারের জন্য অনেক কষ্টের। গত বছর ঠিক এই দিনে অর্থাৎ ২০ শে ডিসেম্বর ২০১৪, আমার বাবা পৃথিবীরর সমস্ত মায়া ত্যাগ করে পরলোক গমন করেন। আমি আমার এতটুকু বয়সে মানুষের কাছ থেকে অনেক ভাবে কষ্ট পেয়েছি, অপমানিত হয়েছি, খেয়ে না খেয়ে এই পর্যন্ত এসেছি এবং এখনো কষ্ট করি। কিন্তু এখন মনে হয় বাবাকে হারানোর কষ্টটা সব কিছুর তুলনায় অনেক অনেক গুন বেশি। বাবার কোনো অর্থ সম্পদ ছিল না, বাবা কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন না। কিন্তু উনি অনেক বড় মনের মানুষ এবং শিক্ষা অনুরাগী ছিলেন। বাবা গ্রামের ছোট বাচ্চাদের বাড়িতে ডেকে ফ্রি পড়াতেন। এই বয়সেও ওনার পড়ানোর সিস্টেম আমাদের থেকেও অনেক ভাল ছিল। বাবা ক্লাস থ্রি, ফোর পর্যন্ত স্কুলে গিয়েছিলেন। কারণ ছিল অনেক, তার মধ্যে বড় কারণ হল আমার ঠাকুর দাদা খুবই তাড়াতাড়ি পরলোকে পাড়ি জমান। ৪ ভাই, ১ বোন, ঠাকুর মার সংসারে, বাবা ছিলেন বড়ভাই। বাবার বয়স তখন খুবই কম ( ১১ বছর) ছিল। বাবা ওই কম বয়স থেকে সংসার হাতে নিয়েছিলেন। ছোট বয়সেই বাবা আমাদের গ্রামের এক বুড়ির ( সরজীতের দিদিমা) সাথে খুলনায় আটা, ময়দা, গম, চাল কিনতে যেতেন এবং এই গুলো লোকাল বাজারে ঘাড়ে করে নিয়ে বিক্রি করতেন। তাছাড়া বাবা মাছ মারার কৌশলও ভালো জানতেন এবং বিল থেকে মাছ ধরে তা ৮ কি.মি. হেঁটে নোয়াপাড়া বাজারে গিয়ে বিক্রি করতেন। তখন খুলনায় ( ৪৩ কি.মি. দূরত্ব) যাবার জন্য তেমন কোনো ভাল ব্যবস্থা ছিল না। বাড়ি থেকে ৮ কি.মি. হেঁটে নোয়াপাড়া গিয়ে তারপর ট্রেনে উঠতে হত। খেয়ে না খেয়ে বাবা তিল তিল করে ছোট ভাইবোনদের বড় করেছেন। তাদের বিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের আগে পরে জমিজমা টাকা ভাগ করে সবাই ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমার কাকারা সবাই খুবই ছোট ছিলেন যখন আমার ঠাকুর দাদা মারা যান। যেমন ছোট কাকুর বয়স ৩ মাস, মেজ কাকুর ৬ বছর, সেজ কাকুর বয়স ৩ বছর এবং পিসির ১৩ বছর বয়স ছিল। আজ কাকাদের ছেলেমেয়েরা অনেক বড় বড় হয়ে গেছে। কারো ছেলেমেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। পিসির ছেলে চাকরি করে, মেয়েদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু আমার বাবার কষ্ট করা পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত শেষ হয় নি। এখন বাবা পৃথিবীতে নেই, তাই আমার কাকারা, আত্মীয়রা, বন্ধুরা সবাই বাবাকে ভুলে গেছেন। যাদের খাইয়ে পরিয়ে বাবা বড় করেছিলেন, তারাই এক সময় বাবাকে বলেছে কি করেছ আমাদের জন্য? বাবা ছিলেন বাঘের মত, কিন্তু কাকাদেরকে কিছু বলতেন না, কারণ তাদেরকে ছেলেমেয়ের মত বড় করেছেন। আমার বাবা গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটা মানুষকেই ভালবাসতেন। মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতেন। আজ বাবার অনুপস্থিতিতে আমাদের বাঘ বংশের দাপট বা নামডাক অনেক কম হয়ে গেছে।

আমার প্রথম হাতে খড়ি আমার বাবার কাছে। আমি প্রাইমারীতে পড়ার সময় ইংরেজিতে বেশ ভাল ছিলাম, কারণ আমার বাবা। আমি যখন বেবী বা ক্লাস ওয়ান এ পড়তাম বাবা তখন প্রত্যেক মাসে ৮ টাকা দিয়ে সুন্দলী বাজারের অরুন্দামের দোকান থেকে ওয়ার্ড বুক কিনে দিতেন। তিনি নিজেই আমাকে পড়াতেন আর আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন। আমি বই ছিড়ে ফেলতাম আর বাবা বারবার বই কিনে দিতেন। চক বা কলম হারালে মা মারলেও বাবা কোনোদিন মারেন নি। বাবা বলতেন ছোটদের মারলে ব্রেনে ক্ষতি হয়। আমার মা কোনো লেখাপড়া জানেন না, তাই বাবাই আমাকে বই পড়াতেন। দাদা ছোট থেকেই মামা বাড়িতে (ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত) বড়। আমার মনে পড়ে, আমি যখন ক্লাস টু তে পড়তাম মা আমাকে একদিন মেরেছিলেন , বাবা আমার মাকে বলেছিলেন ছোট মনি ( আমি) একদিন ইঞ্জিনিয়ার হবে। আমি ছোট বেলায় জোরে কথা বলার জন্য মা আমাকে মারতেন। আর বাবা বলতেন বঙ্গবন্ধু জোরে কথা বলতেন, আমার ছেলে একদিন তার মত হবে। বাবা সত্যিই আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন। আমি যে বিদেশে আসব তা আমার বাবার কাছে ছোট থেকে শুনতাম। আমি যখন বি এস সি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তাম, তখন আমি নেভীতে পরিক্ষা দিয়েছিলাম। আমার বাড়িতে ইন্টার্ভিউয়ের কাগজ আসলে বাবা বলেছিলেন ভেবেছিলাম তুই বি এস সি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিদেশে লেখাপড়া করবি। আমি যখন পাস করার পর ঢাকায় চাকরি করতাম তখন বাবা আমাকে বিদেশে পড়ার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। বাবা-মার ইচ্ছা পূরণ করতে তাই আমি জার্মানিতে এম এস সি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার আবেদন করেছিলাম। আমি চাকরি ছেড়ে বাড়িতে অনেকদিন ঘোরাঘুরি করি। মানুষ আমাকে নিয়ে মজা করত, ঘরে নেই চাল বিদেশ যাবে! হা হা হা হা। আমাকে আমার বাবা মা ছাড়া কেউ বিশ্বাস করত না। আমাকে বলত আমি নাকি বিদেশ যাওয়ার মিথ্যা কথা বলে মানুষের টাকা ধার নিয়ে তা মেরে খাব। গ্রামের শিক্ষিত শয়তানেরা এই অপঃপ্রচার চালাত। আমার কথা বলত, ও কোথায় পাস করেছে, ভুয়া ইঞ্জিনিয়ার। ঢাকায় থেকে চিটারি করে, এখন গ্রামে আসছে। মানুষ আমাকে নিয়ে উপহাস করত। এখন আমাকে দেখলে ওই শিক্ষিত অমানুষেরা দূর দিয়ে হাটে। কে জানে এখন হয়ত অন্য কিছু বলে।

মা লেখাপড়া না জানলেও গ্রামের ১০০% মানুষ বলবে আমাদের দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার পেছনে মায়ের অবদান বাবার থেকেও বেশি। মা সারা রাত বসে থেকে আমাদের পড়া দেখত, ভাবত কখন না ঘুমিয়ে পড়ি। মা বই দেখে বলে দিতে পারতেন কোনটা বায়োলজি বই, কোনটা ক্যামিস্ট্রি বই। আজ আমার মা রাত জেগে শুধুই চোখের জলে বালিশ ভেজায়। আমার মা জীবনে কোনোদিন জ্বরের ঔষধ খাননি। আজ ১ বছরে কয়েকবার তাকে হসপিটালে নিতে হয়েছে।

আজ মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করছে অনেক। মাকে একটু পর কল দিব। মায়ের কান্না আমি সহ্য করতে পারি না। আমিই শুধু মাকে সব কিছু ভুলিয়ে রাখতে পারি।

আজ বাবার প্রথম প্রয়াণ দিবস আমাদের বাড়িতে ক্ষুদ্র আয়োজনে পালিত হবে।সবাই বাবার পরলোক জীবনের মঙ্গল কামনা করবেন। সবাই ভাল থাকেন।

পিলাপ মল্লিক
ডুইসবুর্গ, জার্মানি