জার্মানির ডুসেলডর্ফ শহরেও দুর্গা পূজা হয়। সবাইকে পূজার নিমন্ত্রণ রইল আমার বাড়িতে । আমি দূর থেকে বেশি আপ্যায়ন করতে পারব না। তবে আমার বাড়িতে গেলে আশা করি কেউই না খেয়ে যাবে না। আমার মা খুবই ভাল রান্না করতে পারে। আমি পূজার সময় মায়ের হাতের সেই মান কচু দিয়ে ইলিশ মাছ রান্না করার কথা বলছি। বাবার সাথে বসে দশমীর সকালে মিষ্টি, দই দিয়ে চিড়া ভিজিয়ে খাওয়ার কথা কোনোদিনও ভুলব না। বাবা পূজার সময় আমাদের নিয়ে কত চিন্তা করত। কখনো বাবা নিজের কথা ভাবতো না। কোন কোন বছর বাবা নিজের জন্য কিছুই কিনত না। তাই মাও কিছুই নিত না। দুজনে মিলে এক সাথে একটু রাত হলে খারাপ কাপড় চোপড় পরে বাজারে গিয়ে কিছু মিষ্টি, একটা ইলিশ মাছ, চানাচুর, পাপর, সিঙ্গারা কিনে আনত। আমারা দুই ভাই খুব খুশি হয়ে বাজার থেকে বাড়ি ফিরে দেখতাম আমাদের জন্য মা ইলিশ মাছ ভাজি করেছে। আমি, বাবা,দাদা তিন জনে মিলে এক সাথে বসে খেতাম। আমার বাবা মা জীবনে অনেক কষ্ট করেছে আমাদের দুই ভাইকে পড়াতে গিয়ে। আমরা দুই ভাই এক সাথে এস এস সি ও এইচ এস সি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাশ করেছিলাম। আজ আমার দাদার পড়াশুনা Master in Mathematics আর আমার Master in Electrical and Electronic Engineering.

আমরা যখন নবম শ্রেণীতে পড়তাম তখন গ্রামের কুটিল লোকেরা বাবাকে বলত তুমি দুই ছেলেকে সায়েন্স নিয়ে পড়াচ্ছ, হা হা হা হা। ঘরে নেই চাল তাদের আবার পড়ালেখা, সময় থাকতে কাজে লাগিয়ে দাও। বাবা ধান কিনে আনত বিভিন্ন গ্রাম থেকে, মা তা ভাপিয়ে ভিজিয়ে রাখত। সকালে উঠে তা সিদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে বস্তা ভরে রাখত। বাবা তা বিকেলবেলা মিলে নিয়ে ভাঙিয়ে সকালে আড়তে নিয়ে যেত। এর আগে বাবা সবজি বিক্রি করত, আমিও বাবার সাথে অথবা আলাদা বিক্রি করতাম। রাতে আমি, দাদা, বাবা মাছ মারতে যেতাম, সকালে বিক্রি করতাম আড়তে। যাই হোক পূজার কথায় আসি।

বাবা তুমি জীবনে যত কষ্ট আমার জন্য করেছ, আমি তার বিন্দু মাত্র তোমার জন্য করতে পারিনি। তাইতো বাবা অনেক কষ্ট হচ্ছে তোমার কথা ভেবে। তুমি নাই বাবা কিন্তু তোমার সবকিছু আমার ভিতর আছে। তুমি আমার মাথার উপর সব সময় থাকবে। তুমি আমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতে তা আমি পূরণ করার মত হয়েছি। এখন বাবা আমি মোটামুটি  টাকা আয় করি। মাকে বাড়িতে টাকা দেই। সব দেনা প্রায় শেষ। তুমি থাকতে যে টাকা পাঠাতাম তা সব পাওনাদারেরা নিয়ে নিত। এখন বাবা আর পাওনাদারদের দিতে হয় না। আমি প্রতি মাসে মার নামে টাকা পাঠাই। এবার পূজাতেও টাকা পাঠিয়েছি। বাবা, আশা করি তুমি উপরে খুবই ভাল আছ। তুমি আমাদের নিয়ে ভেবো না। তোমার ছেলেরা আর কিছুদিন পর অনেক টাকা আয় করবে। তোমার মত মানুষের উপকার করবে। আমি তোমার ছেলে, তাই তোমার মত হতে চাই। বাবা, তোমার কথা মনে পড়লে চোখের জল ধরে রাখা খুবই কঠিন পড়ে ।

মা, তোকে আমি যে টাকা দিয়েছি তা কি তুই সব অন্যদের দিয়ে দিচ্ছিস ? তুই কি দাদার জন্য কিছু কিনেছিস ? দাদা কি তোর শাড়ি কিনেছে? মা আমি তোকে আবার টাকা দিব তুই চিন্তা করিস না। আমার তো মন চায় দেশে গিয়ে তোদের সাথে পূজা করি, কিন্তু আমার যে অনেক কাজ, আমি যে এখন অনেক বড় হয়ে গেছি।

আমার কাছে বাবা-মা সব কিছুর উপরে। মা, আমি দূর থেকে তোর পূজা করি। মা, তুই আমাকে নিয়ে সব সময় চিন্তা করিস। আমার মঙ্গল কামনা করিস। আমার মাটির দেবতা তোর মত অত বেশি আমার কথা ভাবে না। মা, তুই তো জানিস, আমি ছোটবেলা থেকে খেয়ে অঞ্জলি দেই। আমি বলতাম যেখানে আমার বাবামা আমার জন্য ভগবানকে ডাকে সেখানে আমার কোন চিন্তাই নাই। বাবা না থাকলে কি, বাবাকে আমি সব সময় ডাকি। আর দূর থেকে তোকে দৈনিক মোবাইলে। আমি তোর সাথে কথা বলার জন্য রাত ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। আগে বাবার সাথে কথা বলার জন্য বসে থাকতাম, আর এখন তুই।

মা, আজ তোর সাথে কথা বলার পর, তোর কাছে যেতে ইচ্ছা করছে, সকাল হয়ে গেছে তবুও চোখে ঘুম নাই। তাই তোকে লিখছি। আমার জার্মানিতে একটি দিন নাই যে তোর সাথে অথবা বাবার সাথে কথা না বলে আমি ঘুমিয়েছি। আজ মনে হচ্ছে চোখে ঘুম নাই। মা তুইও আজ আমাকে অনেক মিস করছিস। আমি তোর সাথে কথা বলে বুঝতে পেরেছি। তুই চিন্তা করিস না মা, আমি তাড়াতাড়ি টিকেট কেটে দেশে আসব আর তোর হাতের তরকারি খাব, তোর সাথে খাবার সময় লড়াই করব। এটা আমার ছোটবেলার অভ্যাস।

মা-বাবা তোমাদের ছেলে,
পিলাপ মল্লিক