২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে এসে নামলাম আখেনে। ফ্রাংকফুর্ট থেকে সকালের ট্রেনে রওনা দিয়ে দুপুরের দিকে বিশাল জার্নি করে এসে পৌছাইলাম।

বাংলাদেশ থেকে প্লেনে উঠেছিল আগের দিন সন্ধ্যায়। এয়ারপোর্টে বিশাল ঝামেলার পর প্রায় ২৪ ঘন্টার জার্নি করে এসে প্রচন্ড ক্লান্ত ছিলাম। এদিকে আমার সমস্যা হল কোন ধরনের জার্নিতেই আমি যাওয়ার সময় ঘুমাতে পারি না। জার্নি শেষে আসার সময় প্রচন্ড ক্লান্ত থাকার কারনে ঘুমাইতে পারি। এবারো প্লেনে ঘুমাতে পারি নাই। আর প্লেনের সিট আমার পায়ের জন্য বেশ চিপা ছিল দেখে আনকমফর্টেবল সময় কাটছে।

জার্নি শেষে ট্রেন যখন আখেনের কাছে, তখন দেখি ঘুমে চোখ ঢলে পরতেসে। তখন রাস্তা ঘাটও চিনি না, সিমও কিনি নাই। তাই অনেক কষ্ট করে হলেও চোখ খোলা রাখতে হচ্ছিল।

ট্রেন থেকে নেমেই নিলাম ট্যাক্সি। আমার শহর থেকে বেশ দূরে এক জায়গায় এয়ারবিএনবি ভাড়া করা ছিল। নতুন জায়গা, ট্যাক্সি ঠিক দিকে যাচ্ছে নাকি তাও বোঝার উপায় নাই।ভাগ্য ভাল আখেনের সম্পূর্ন ম্যাপ ডাউনলোড করে দিয়েছিলাম ফোনের গুগল ম্যাপে। নেট না থাকা সত্বেও ফোনে দেখতে পেলাম গাড়ি ঠিক দিক দিয়েই যাচ্ছে। ট্যাক্সিতে উঠে দেখি এরাবিয়ান হর্সের মত ভাড়া উঠতেসে।

চাক্কা ঘুরতেসে আর ভাড়া সাই সাই করে বাড়ছে। ১০ মিনিট পর গাড়ি নিয়ে এড্রেসের সামনে রাখল। সারি সারি সব এপার্টমেন্ট বিল্ডিং। “টে” নামে একজনের কাছ থেকে বাসা নিয়েছিলাম। টে বলেছিল সে বাসায় থাকবে না কিন্তু তার দরজার সামনে ফ্লোর ম্যাটের নিচে চাবি থাকবে।

ফ্লোর ম্যাটের নিচে কেউ চাবি আবার রাখে নাকি? একটু সন্দেহ সন্দেহ লাগতেসিল। বিদেশে এসে প্রথম ধরা এখানেই খেয়ে যাব না তো?

কুস্তি করে লাগেজ নিয়ে দরজার সামনে এসে দাড়াইলাম। ফ্লোর ম্যাটের নিচে চাবি পেয়ে বেশ আনন্দিত হইলাম।

যার বাসা সেই মেয়েটা চাইনিজ। তাই তার বাসায় দেখি চাল এবং হাবিজাবি মশলা ছিল। আর “টে” অনেকবার বলেছে জিনিসগুলা আমার ইউজের জন্য রাখা। বাসায় এসেই রেস্ট নিয়ে সুহা ভাত বসায়ে দিল আর আম্মুর দেয়া গরুর গোস্ত গরম করে দিল। বিদেশে এসে আম্মুর রান্না গরুর গোশত খেয়ে বেশ মন খারাপ হয়ে গেল। দেশের বাইরেও প্রথম খাবারের ব্যবস্থা আম্মুরই করে দেয়া।

রেস্ট নিয়ে বিকালের দিকে বের হলাম সুপারশপে যাওয়ার জন্য। সিম এবং হাবিজাবি কিনতে হবে। বাসা থেকে বের হয়ে হাটছি আর হাটছি। রাস্তা আর শেষ হয় না। প্রচন্ড পানি পিপাসা লেগে গেল।

বাংলাদেশে গলির মোড়ে মোড়ে দোকান থাকে। এখানে দেখি যদ্দুর চোখ যায়, কোন দোকান নাই। আর ভাবছিলাম উন্নত দেশে একটু পর পর পানি খাবার কল থাকবে। কল থেকে কাঠবেড়ালীর সাথে বসে বসে আমিও পানি খাব। গাছ থেকে কলা আর আংগুর খাব।

কিসের কি!!!

সব জায়গায় শুধু গাছ আর গাছ। ভাবতেসি কোন বাড়িতে যেয়ে নক করে পানি চাব নাকি।একটু পর দুইটা ছেলের সাথে দেখা হল। ওদের বললাম “ভাইয়া পানি কই পাব?”

“দোকানে।”

আবার হন্টন শুরু। হাটতে হাটতে, রাস্তা ভুল করে, ব্রিজে উঠে, ব্রিজের নিচে হামাগুড়ি দিয়ে যেয়ে Aldi নামে দোকানে যেয়ে পৌছাইলাম। দোকানে যেয়ে দেখি পানি আর পানি। এক বোতল পানি কিনলাম। এক বোতল এপল জ্যুস কিনলাম। বাজার করে বাইরে এসেই পানির বোতল খুললাম।

প্রায় ঘন্টাখানেক হল আমাদের পানি পিপাসা লেগেছে। পানির জন্য জীবন যায় যায় এমন অবস্থা।পানি মুখে দিয়েই সুহা কুলি করে পানি ফেলে দিল।

আমি বললাম “কি হইছে?”

“এমন বাজে পানি!!!”

আমিও পানি মুখে দিয়ে পানি কুলি করে ফেলে দিলাম। পানি বেশ তিতকুটে আর ঝাঝালো। একেবারেই খাওয়া যাচ্ছে না। আপেলের জ্যুস মুখে দিয়েও দেখি একই অবস্থা। এই অবস্থা কেন সব? দোকান থেকে বের হয়ে দেখি সব অন্ধকার হয়ে গেছে। কোন বাস নাই। রাস্তাও এমন অন্ধকার, লাইট টাইট নাই। অন্ধকারে দেখা গেল রাস্তা হারায়ে আবার খাল-বিলে পরে যাব।

এক মেয়েকে ডেকে বললাম “ভাই ট্যাক্সি কই পাব?”

তারা একটা ট্যাক্সি ডেকে দিল। ট্যাক্সিতে করে বাসায় চলে আসলাম।

বাসায় এসে গুগল করে দেখি ইহা হইল “ফুস” পানি (আমরা ফাজলামি করে বলি ফুস পানি।)

“ফুস” পানি হল কার্বোনেটেড ওয়াটার। কোলা,পেপসিও হল কার্বোনেটেড ওয়াটার। কোকের সাথে এই “ফুস” পানির পার্থক্য হল কোকের মধ্য চিনি দেয়া থাকে। এর জন্য খাইতে ভাল লাগে। চিনিবিহীন কোক হইল “ফুস” পানি। এই জঘন্য জিনিস জার্মানরা আয়েস করে চুমুক দিয়ে দিয়ে খায়। কয়দিন পর দেখলাম জিনিসটা খাইতে খারাপ না।

বিশেষ করে কোলার অল্টানেটিভ হিসেবে খুবই ভাল। চিনি নাই, ক্ষতিকর না শরীরের জন্য। আমারও অভ্যাস করতে সময় লাগল না।

কিন্তু প্রচন্ড পিপাসা নিয়ে পানি মনে করে পানির জায়গায় খাইলে একদম মনে হয় গলায় দড়ি দেই।