গির্জা তারপর গির্জা লাগোয়া কবরস্থানে কফিনের শেষ মাটিটুকু ফেলা—সব কিছু লতাদের পাশে থেকে দেখছি যন্ত্রের মতো। বিষণ্ন, নীরব পরিবেশ। আর বাতাসটাও ভারী ঠেকছে। রোদ পালিয়ে গিয়ে কোত্থেকে একখণ্ড মেঘ এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক মাথার ওপরে। বৃষ্টি হয়ে নামলে খোলা জায়গায় মানুষগুলোর ভেজা ছাড়া গতি নেই। আনুষ্ঠানিকতা তাই বোধ হয় একটু তাড়াহুড়ায় সারা হলো।

টিলা বেয়ে ওঠা যত সহজ মনে হয়েছিল, লতা আর তার হুইল চেয়ার ঠেলে নামা তার চেয়ে তিন গুণ কঠিন মনে হলো। এক দুই ফোটায় বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে এর ভেতরে। ম্যাক্স, ফ্রাউ স্নাইডার আর ফ্রাউ কেলনারের ছোট দলটা দ্রুত পা চালিয়ে সামনে এগিয়ে গেছে। ম্যাক্স একবার পেছনে ফিরেছিল, কিন্তু আমি হাত নেড়ে আশ্বস্ত করাতে আর থামেনি। সবার থেমে লাভও নেই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল হয়ে গেছে। ম্যাক্সকে দাঁড়াতে বলা উচিত ছিল। লতার হুইল চেয়ার আর চলছে না। এক টুকরো নুড়ি পাথর চাকায় বেকায়দায় ঢুকে গেছে। অনেক চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিলাম। পথ বেশি না। লতাদের বাড়ি এখান থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ।

লতা এর ভেতর ‘কী হলো, কী হলো’ করে উঠেছিল। মেজাজ গরম থাকায় বিরাট এক বকা দিয়ে ঠান্ডা করে দিয়েছি। বেচারা চুপ মেরে অপরাধী চেহারায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। বকা দিয়ে নিজের অপরাধের পাল্লাটা বাড়িয়েই চলছি আজকে সকাল থেকে। আমি এমন কেন? এখন আবার তাঁর হুইল চেয়ারের চারপাশে অর্থহীন ঘুরপাক খাচ্ছি। এক হাতে নিজের চুল খামচে ধরে আরেক হাতে দুশ্চিন্তায় হঠাৎ গজিয়ে ওঠা দাঁড়ি নির্মমভাবে চুলকে যাচ্ছি। কী করব ভাবছি। এই ফাঁকে কখন যে লতা হাতের ক্রাচটায় ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, খেয়ালই করিনি। চোখ পড়ায় এবার রে রে করে তেড়ে গেলাম। ক্রাচে ভর দিয়ে তাইরে-নাইরে করে ঘুরে বেড়ানোর অবস্থায় নেই লতা। ধুর! পায়ের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার মাথাটাও গেছে। যা-তা শুরু করেছে। আমার মগজে ছোটখাটো একটা বিস্ফোরণ হয়ে গেল। ইচ্ছে হচ্ছে হুইল চেয়ারটাকে ফুটবলে ফ্রি কিক দেওয়ার মতো করে উড়িয়ে দিই। আর লতাকে মন ভরে বকাঝকা দিয়ে একলা নিচে নেমে যাই। আমার বয়েই গেছে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিতে। ম্যাক্স এসে তার বোনকে উদ্ধার করে নিয়ে যাক। আমার কী দায়?

কিন্তু তার বদলে করলাম ঠিক উল্টো কাজটা। এক ঝটকায় কোনো কিছু না ভেবেই আজব মেয়েটাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম। ভাঙা পা দিয়ে এক কদম হাঁটার আগেই। লতা অবাক হওয়ারও সময় পেল না। বরং দুই হাতের ভেতর আটকে পরে সে রূপকথার পিনোকিওর মতো কাঠ হয়ে গেল। মুশকিলে পড়ে গেলাম। কাজটা কী ঠিক হলো? ফোনটাও আনা হয়নি লতাদের বাসা থেকে যে ম্যাক্সকে ফোন করে ফিরে আসতে বলব।

অপ্রস্তুত লাগছে। পরিবেশটা তরল করার জন্য একরকম জোর করে এ কান ও কান চওড়া একটা হাসি টেনে বললাম, ‘তুমি আমার দেশের মেয়ে হলে এতক্ষণে চিৎকার চেঁচামেচি করে বলত, অ্যাই অ্যাই, ছেড়ে দে শয়তান…! তুমি কিছু বলছ না যে?’ লতার আড়ষ্টতা আর কাটে না। এবার মরিয়া হয়ে বললাম, ‘আর কী ভাবেই বা এখান থেকে বাড়ি যাওয়া যেত? কিছু তো বল? নইলে কিন্তু ফেলে দেব। এই আমি দিলাম হাত ছেড়ে। এক, দুই…।’ তিনের আগেই লতা ভয় পেয়ে গলা আঁকড়ে ধরল। আর ফিক করে হেসে ফেলল। এটার জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম। এই হাসিটুকু। উত্তরে আমিও হেসে ফেললাম। মনের গহিন থেকে উঠে আসা স্বস্তির হাসি। হুইল চেয়ারটা এতিম করে দিয়ে আমরা টিলার ঢালু পথ বেয়ে নামতে থাকলাম।

প্রথম পাঁচ মিনিট মনে হচ্ছিল লতা এত হালকা। যেন ছোট্ট চড়ুই পাখি। পরের পাঁচ মিনিটে চড়ুইটা আস্তে আস্তে বিরাট এক পেঙ্গুইন হয়ে গেল। মানে আমার হাত প্রায় ধরে এসেছে। তার ওপর উঁচু নিচু পথ। বাংলা সিনেমার নায়কেরা অমন স্বাস্থ্যবতী নায়িকাদের অনায়াসে কোলে নিয়ে নাচত কেমন করে ভাবছি। এই মুহূর্তে তাদের ওস্তাদ মানছি মনে মনে। সে তুলনায় ছিপছিপে ছোটখাটো গড়নের লতা কিছুই না। কিন্তু, তাও; উফফ্, আর তো পারি না। লতা আমার ক্লান্তিটা টের পেয়েই কিনা জানি বলে উঠল, ‘অনীক, একটু কী নামিয়ে দেবে? ক্লান্ত লাগছে’। খুশি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে লতাকে সাবধানে নামিয়ে দিয়ে ক্রাচটা ধরিয়ে দিলাম। বিড়ি–সিগারেট ফোঁকার স্বভাব থাকলে এই ফাঁকে একটা সুখটান দিয়ে ফেলা যেত। তার বদলে ঘাসের ডগা ছিঁড়ে নিয়ে চিবোচ্ছি।

সড় সড় জাতীয় একটা শব্দ কানে আসছে। পাত্তা দিলাম না। কাক টাক হবে হয়তো। তার চেয়ে বড় চিন্তা মাথার ওপরের মেঘটা নিয়ে। টুপটাপ বৃষ্টি নেই বটে। কিন্তু আকাশ ঝড়ের আগের চেহারা নিয়ে ঘাপটি মেরে আছে। হঠাৎ লতা হাত ধরে সামনের দিকে ইশারা করল। অসাড় হয়ে গেলাম। কালো-বাদামি একটা ডোবারম্যান। হিংস্রতম জাতের কুকুর। আকারে বিশাল। সড় সড় করে শুকনো পাতা সরিয়ে কী যেন খুঁজছে। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো ধক্ধক্ করে জ্বলছে যেন। দেখে মনে হলো যা খুঁজছিল, তা পেয়ে গেছে। আমাদের পেয়ে গেছে।

লতার হাতের ভেতর আমার হাত ঘেমে উঠছে। হাতটা ছুটিয়ে কোমরে গোঁজা মরক্কান ড্যাগারটা নিমেষে বের করে সামনে ধরলাম। লতা বোবা বিস্ময়ে দেখছে। মারাত্মক ধারালো ফলার ছুড়িটা তাঁর খুব পরিচিত। লতাদের ড্রয়িং রুমের দেয়ালে ঝুলছিল গতকাল রাত পর্যন্ত। সকালে সঙ্গে নিয়ে নিয়েছি। ফ্রাউ কেলনারের সঙ্গে বিপদের বন্ধু পিস্তল সেবাস্তিয়ান থাকতে পারলে আমার সঙ্গে আধবেলার জন্য মরক্কান ড্যাগার থাকলে ক্ষতি কী? খুলে নিয়েছি তাই দেয়াল থেকে। গিয়ে জায়গামতো রেখে দেব। কেউ জানবেও না। ছুড়িটা যে বের করতেই হবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।

এক পা, এক পা করে ডোবারম্যানটা এগিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে আমারও গলা শুকিয়ে আসছে। আমি এখন যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারি। কিন্তু ঠিক কখন, বুঝে উঠতে পারছি না। কুকুরটা ঝাঁপিয়ে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব? চোয়াল শক্ত করে ছুড়ি বাগিয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আরেকটা হাতে তার চেয়েও শক্ত করে লতাকে জড়িয়ে ধরেছি। সময় যেন থমকে গেছে। কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না। আমি চোখ বুজে ফেললাম। ঝাঁপটা আমিই দেব। কুকুরের আগেই। ঠিক তখনই তীব্র শিসের মতো শব্দ কানে আসল। ‘বেনিয়ামিন, বেনিয়ামিন! কই তুমি?’ কালো ওভারকোটে ঢাকা এক লোক উদয় হলেন শূন্য থেকে। ডোবারম্যানটা পরিচিত ডাক শুনে ঘেউ ঘেউ করে সেদিকে ছুটল। আমি আর লতা কুকুরটা উধাও হওয়ার পরও কিছুক্ষণ নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর সশব্দে ফোস করে হাঁপ ছেড়ে দুজন দুজনের দিকে তাকালাম। কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম দুজনে মিলে। শুধু শুধুই। কিন্তু বেনিয়ামিন বলল কেন লোকটা? বেঞ্জামিন না কেন? আচ্ছা, বেনিয়ামিন কী বেঞ্জামিনের ইহুদি উচ্চারণ?

চিন্তাটা আর এগোতে পারল না। লতা কী যেন বলছে। খেয়াল হতে বুঝলাম হাত ছাড়তে বলছে। লতা এখনো আমার হাতের শেকলে বন্দী। জড়িয়ে ধরেই আছি। সলজ্জে ছেড়ে দিয়ে ছিটকে সরে আসলাম। লতা বাহু ডলছে। পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট সেখানে। ঠিক দিন কয়েক আগে কফিশপে এভাবেই লতার হাতে দাগ ফেলে দিয়েছিলাম। সেই কথা মনে করে এবার রীতিমতো মাটির সঙ্গে মিশে যেতে থাকলাম। মাথা ঠিক ছিল না ঘটনার আকস্মিকতায়। লতা সেটা বুঝে নিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আমরা আজকে এখানেই থাকব নাকি বাড়ির দিকে পা চালাব? কোনটা বলতো, অনীক?’ আমি কিছুটা সহজ হয়ে আবার লতাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলাম। কিন্তু হাত কাঁপছে। লতা কী সেটা বুঝতে পারছে? মুশকিল, মুশকিল।

এদিকে ঝড়ের আগের বাতাসে চুল উড়ে এসে চোখের ভেতর ঢুকে যাওয়ার দশা। বারবার ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিয়েও লাভ হচ্ছে না বিশেষ। কিন্তু থামলে চলবে না। ঝড় আসি আসি করছে। শেষমেষ লতা একটা অদ্ভুত সমাধান বের করল। তার চুলের তিন কোনা ক্লিপটা খুলে আমার চুলে আটকে দিল। আশ্চর্য বনে গেলাম! মেয়েলি সাজের সরঞ্জাম দিয়ে আমার বেয়ারা কিন্তু পুরুষালি চুলগুলো শাসনে আনার অপরাধে লতাকে কী শাস্তি দেওয়া উচিত ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু, কী অবাক কাণ্ড। রাগটাকে ঢোক গিলে নাই করে দিয়ে সহাস্যে লতাকে বললাম, ‘ক্লিপ দিয়ে চুল আটকানোর ফৌজদারি অপরাধে ক্লিপের মালিককে আজকে জব্দ করা হলো। তাকে আজকে আমার কবজা থেকে কিছুতেই ছাড়া যাবে না। হা–হা–হা…।’ কপট অট্টহাসিতে চারিদিক কাঁপিয়ে দিলাম। আর লতা? সে যারপরনাই চেচাচ্ছে, ‘ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও শয়তান…।’ বলতে বলতে ক্রাচটা দিয়ে বেমক্কা একটা ঠোকা দিয়ে দিল কপাল বরাবর। আমি তাও রাগলাম না। বরং মিথ্যে হুমকি দিলাম, ‘কপাল ফুঁড়ে শিং গজালে কিন্তু ক্ষ্যাপা স্প্যানিশ ষাঁড়ের মতো তাড়া করব, বলে দিলাম।’

কোলের ভেতর বন্দী লতা খিলখিল করে হাসছে। হাসির তোড়ে মাথা ঝিমঝিম করছে। এ কোন নতুন বিপদে পড়লাম! (চলবে)

ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানি।