গত মাসে, রনি ভাইয়ের মৃত্যুটা আমাদের সবাইকে একদম কাপিয়ে দিয়েছিল। বলা নেই, কওয়া নেই, ৩০ বছর বয়সী একজন সুস্থ সবল মানুষ, সবার চোখের সামনে, ফুটবল খেলার মাঠে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে, আমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নেয়।

গত সপ্তাহেও, আমাদের সবার প্রিয় বাচ্চু ভাইও আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

কয়েকদিন আগে শুনলাম, আমার ছোটবোনের এক ফ্রেন্ড নাকি হঠাৎ হার্ট এটাক করে মারা গেছে। ছেলেটা চিটাগং মেডিকেলে থার্ড ইয়ারে পড়ত। বয়স আর কত হবে। বড়জোর ২০-২১।

সাডেন ডেথ ব্যাপারটা, আমাদের মাঝে ইদানিং ভীষণভাবে ভর করেছে। প্রতিনিয়ত-ই ইয়ং লোকজনের হার্ট এটাক কিংবা চলে যাওয়ার খবর শুনছি।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা যারা প্রবাসে থাকি, তাদের এই ধরণের ঝুকি কিন্তু নেহায়েত কম না।

প্রশ্ন করতে পারেন, কিভাবে? আমরা তো কোনরকম ফরমালিনযুক্ত ভেজাল খাবার খাচ্ছি না।

আসলে আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনের ধরণ-ই কিন্তু এর জন্য দায়ী।

জীবনকে সহজ করার জন্য, আমরা মেক্সিমাম প্রবাসীরাই, প্রসেস মিট, চিজ, ডিম, ফুল ক্রিম দুধ, বাটার, নুটেলা- এইসব হাই ফ্যাট এবং কোলেস্টেরলওয়ালা খাবারের উপর প্রচন্ডরকম নির্ভরশীল।

এছাড়াও দেশী মাছ এবং সবজির আনএভেইলেবিলিটি এবং অত্যাধিক দামের কারণে, অনেকেই আমরা এইসব খাবার কম খেয়ে থাকি। এতে করে আমাদের মাংসের প্রতি ডিপেন্ডেন্সি বেড়ে গেছে বহু গুনে।

আর ৯টা – ৫টা অফিস, ক্লাস, কামলা দিয়ে, খুব কম মানুষ-ই কিন্তু জিম কিংবা ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করার সুযোগ পায়।

সাথে আছে বাংগালী জাতির চিরচেনা আলসেমি, যার কারণে আমরা একদম সিভিয়ার কিছু না হলে, ডক্টরের কাছে যেতে চাই না। ডক্টরের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে একটা ভীতি, একদম ছোটবেলা থেকেই আমাদের ব্রেনে ইন্টিগ্রেটেড হয়ে আছে।

সবকিছু মিলিয়ে, আমরাও যে রনি ভাই কিংবা বাচ্চু ভাইয়ের মত শংকার মাঝে নাই, এটা বলা মুশকিল। কার ভেতরে, কোন রোগ বাসা বেধে বসে আছে, এটা কেউ-ই বলতে পারে না।

কিন্তু আপনার-আমার সামান্য সচেতনতা-ই কিন্তু, আমাদের জীবনটাকে অনেক বড় ঝুকির হাত থেকে খুব সহজেই রক্ষা করতে পারে।

এখন আমাদের করণীয় কি?

আমাদের করনীয় কাজটা খুব-ই সহজ। বছরে শুধু এক/দুই দিন সময়-ই যথেষ্ট।

আপনাকে প্রথমেই একজন লোকাল হাউস ডক্টর (hausartz) খুজে বের করতে হবে। হাউস ডক্টর খুজে পাওয়া একদম সহজ।

jameda.de

এই ওয়েবসাইটে ঢুকে, was option এ লিখবেন hausartz/hausärztin. আর wo option এ লিখবেন, আপনার পোস্টকোড। তাহলেই পেয়ে যাবেন, আপনার আশেপাশের সব ডাক্তারের খোজ।

ওখান থেকে, রিভিউ এবং ওপেনিং আওয়ার দেখে, বেছে করে নিন আপনার পছন্দের ডাক্তারকে।

এরপরের কাজ সহজ, আপনি ফোন করে এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিন। এপোয়েন্টমেন্ট নেয়ার সময় বলবেন, আপনি চেক আপ করাতে চান। ইউজুয়ালি, চেক আপ এর জন্য একদম সকালে, খালি পেটে যেতে হয়। তাই এপোয়েন্টমেন্টটা জরুরী।

কিছু হাউস ডক্টর, নতুন রোগী নিতে চায় না। তাই অলোয়েজ সেকেন্ড অপশন চিন্তা করে রাখবেন।

জার্মানীতে ৩৫ বছরের উপরে, ফুল বডি চেক আপ এর জন্য কোন টাকা দেয়া লাগে না। কিন্তু আপনি একদম টাকা ছাড়াও, চেক আপ করাতে পারবেন। সেজন্য আপনাকে ডক্টরের সাথে আগে একটু কথা বলে নিতে হবে। আপনার আগের কোন সমস্যা থাকলে, সেটা বলে নেবেন।

আমি দুইবার চেক আপ করিয়েছিলাম। একবার কোন টাকাই লাগে নাই। আরেকবার নামমাত্র ৩০ ইউরো লেগেছিল। আপনার ফাইনান্সিয়াল কন্ডিশান/স্টুডেন্ট বললে, ডাক্তাররা অনেক ব্যাপারে ছাড় দেয়।

আর আমাদের সকলের-ই যেহেতু ইন্সুরেন্স আছে। তাই আর কোন এক্সট্রা খরচ এর ব্যাপার নাই।

আমার সাজেশন হল, বডি চেক আপের আগে ডক্টরের সাথে একবার কথা বলে, তাকে আপনার মেডিক্যাল হিস্টোরি সম্পর্কে অবগত করা। এরপরে উনার জন্য চেক আপের ব্যাপারটা ইজি হয়ে যাবে।

কিভাবে করে এই চেক আপ?

এক এক ডক্টরের, এক একটা প্রসিডিউর থাকে। বেশীরভাগ ডক্টর-ই আপনার মেডিকেল হিস্ট্রির উপর বেইজ করে, টেস্ট করাবে।

ধরেন আপনার ফেমিলিতে কোন হার্ট ডিসিস আছে। তখন, তারা ইসিজি করায় এক্সট্রাভাবে।

নরমালি প্রসেসটা হল, ব্লাড, ইউরিন, প্রেসার- এইসব টেস্ট করায়। সকালে খালি পেটে। মেয়েদের ক্ষেত্রে, এক্সট্রা করে এবডোমিনাল আল্ট্রাসাউন্ড করে থাকে।

এইসব টেস্টের রিপোর্ট পেতে ১-২ দিন সময় লাগে। এরপরে ডক্টর আপনার সাথে শারিরীক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করে, আপনাকে দরকার পড়লে স্পেশালিস্ট এর কাছে পাঠাবে। আর মেজর কিছু না পেলে, আপনাকে হেলদি থাকার জন্য কিছু, টিপস দেবে।

বছর দুয়েক আগে, আমার আম্মু হার্ট এটাক করেছিল। এরপরে দেশের অনেক ডক্টর-ই আম্মুকে পরামর্শ দিয়েছিল, উনার ছেলেমেয়ের হার্টও চেক করে দেখার জন্য৷ কারণ ডায়াবেটিক/হার্ট এইসব ব্যাপারে জেনেটিক প্রভাব কাজ করে। তাই সন্তানদেরও এই ব্যাপারে ঝুকি থাকে।

উনাদের পরামর্শে, আমি এখানকার হাউজ ডক্টরের সাথে আলাপ করি। উনি আমার ব্লাড টেস্ট করে, হাই কোলেস্টেরল ডিটেক্ট করেন। এরপরে উনি ইমেডিয়েটলি আমাকে কার্ডিওলোজিস্টের কাছে রেফার করেন।

কার্ডিওলোজিস্ট তখন ETT, ECO সহ অনেকগুলো টেস্ট করে নিশ্চিত হন, আমার হার্টে কোন মেজর সমস্যা নাই। শুধু খাদ্যাভ্যাস এবং শরীর চর্চা করলেই এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

শরীরে কোন গুরুতর সমস্যা নেই, এই ব্যপারটা আপনাকে যে কতবড় মানসিক প্রশান্তি দেবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাই দেরী না করে, আজ-ই আপনার চেক আপটা করিয়ে নিন। আমরা ডয়েচল্যান্ড থাকি। মাসে মাসে, অনেক টাকা-ই হেলথ ইন্সুরেন্স কোম্পানি গুলোকে দিতে হচ্ছে। কিছু তো এডভান্টেজ নেয়া উচিত। তাই না?

সবার সুস্থতা কামনা করছি।

বিঃদ্রঃ অনেক সময় হালকা বুকে ব্যাথা বা এই ধরণের উপশম হলে, আমরা গ্যাস কিংবা হজমের সমস্যা বলে কাটিয়ে দেয়ার চেস্টা করি। এই সকল কেইসে, একদম-ই হেলাফেলা না করে, সরাসরি ডক্টরের কাছে চলে যাবেন। আপনার একটা সঠিক সিদ্ধান্ত-ই, আপনার জীবন বাচানোর জন্য যথেষ্ট।

ধন্যবাদ।