অনেকদিন পর প্রিয় গ্রুপটাতে উঁকি দিলাম। সর্বশেষ ঢুকছিলাম কয়েক মাস আগে- আসামী হয়ে। এক আপা আমার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে গ্রুপে নালিশি পোস্ট করেছিলেন। বেচারা আপার কোনো লাভ হয় নাই, অগত্যা পোস্ট ডিলিট করে দিছেন। আখেরে আমার কিছু ফলোয়ার বাড়ছে। ধন্যবাদ আপা, আমি ওষধ ছাড়াই ভাল আছি।
যাহোক, আপনাদের পোস্টগুলো দেখে এক বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল! উৎকন্ঠার সেই দিনগুলি! গ্রুপের নোটিফিকেশন চালু রাখছিলাম যাতে কোনো পোস্ট মিস না হয়, কমেন্টগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। জানি অনেকেই তাই করতেছেন।

এক বছর আগে আসছি এটা শুনে হয়তো অনেকেই মুন্নি সাহার ভঙ্গিতে আমাকে জিজ্ঞেস করতে চাইবেন- “জার্মানি সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কী!”। “অনুভূতি” নিয়ে অনেক পোস্ট আছে গ্রুপে, খুজলেই পাবেন। আসলে ঠিক এক বছর আগে জার্মানি আমাদের কাছে ছিল অচেনা, অদেখা। এখানে এসেও আমরা একেক জন একেক শহরে, একেক ইউনিতে, ভিন্ন ভিন্ন কোর্সে। ফলে জার্মানি সম্পর্কে আমাদের অনুভূতি অনেকটা অন্ধ ব্যক্তির হাতি দেখার মতোই- একেক জনের একেক অভিজ্ঞতা। এক জনের অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো জার্মানি বিচার করা যায় না।

জার্মানিতে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রত্যাশার মতোই (পড়াশোনা ব্যতিত, এ প্রসঙ্গে পরে আসছি)। শুরুটা ছিল ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই অনেক মসৃণ (আলহামদুলিল্লাহ্)। জার্মানরা জাতি হিসেবে অসাধারণ! ব্যস্ত মানুষগুলো যখন আপনাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে তখন মনে হবে এদের হাতে বুঝি অনেক সময়! জার্মানিতে নেমে আমি একাই ট্রেনে গন্তব্যে এসেছিলাম। একা বললে ভুল হবে-একটা জার্মান মেয়ে সঙ্গ দিছিল। তা না হলে অনেকটা ভিন্ন গ্রহ থেকে আসা এলিয়েনের মত অবস্থা হতো- কোথায়, কখন ট্রেন, কোথায় নামব কিছুই বুঝতাম না। মেয়েটা আমার ৪০ কেজি ওজনের ভারি ব্যাগ ট্রেনে তুলতে হেল্প করল, আন্তরিকতার সাথে নিজের পাশে বসাল। যতক্ষণ জেগে ছিলাম গল্প করছি।

আমি থাকি পোটসডামে। বার্লিন জবের সুবাধে সপ্তায় ৩/৪ দিন ট্রেনে ৫০/৬০ কিঃমিঃ পাড়ি দিই। প্রতিদিনই পাশের সিটটা যত্ন করে রেখে দিই- হয়তো কোনো জার্মান মেয়ে বসবে আর আমি প্রথম দিনের প্রতিদান কিছুটা হলেও শোধ করব। নাহ, আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে বসল না (পুরুষ ব্যতিত)! সম্ভবতঃ আমি আর আগের মত হাবাগোবা নেই। শুনছি মেয়েরা হাবাগোবা অসহায় ছেলেদের প্রতি এক ধরণের করুণাবোধ করে! আমার এক্সও প্রায়ই বলত-“তোমাকে ভালবাসছি করুণা করে, কারণ তোমাকে দেখতে অনেক অসহায় মনে হয়।“

জার্মানিতে বেশিরভাগই আসে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে। সুতরাং আমিও পড়াশোনা করতে আসছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, যে বলদ দিয়া হালচাষ হয় না, তাকে দিয়ে গাড়িও টানা যায় না। দেশে থাকতে টিচারদের পরিচিত মুখ ছিলাম- ক্লাসে না আসা ছাত্র হিসেবে। পণ করেছিলাম জার্মানীতে এসে জীবনের সব ক্লাসের কাজা আদায় করব! শুরুতে চেষ্টাও করেছলাম, পরে যেই লাউ, সেই কদু! কোনোদিন ক্লাসে গেলে পিছনে বসে অবাক হয়ে দেখি, সামনের মানুষগুলো মনোযোগ দিয়ে প্রফেসরকে শুনছে! কেবল আমিই পারছি না। পরে এই ভেবে সোস্যাল মিডিয়ায় মগ্ন হই যে, ‘ইহারা অন্য জগতের মানুষ’। এখন হয়তো কোনো সিনিয়র ভাই বা আপু বকা দিতে চাইবেন এই বলে যে, পড়াশোনা না করে দেশের বদনাম করতেছি। দিন বকা, আপনাদের বকায় যদি ভাল হই, মন্দ কী! তবে মন্দের ভাল দিক হলো, এখন পর্যন্ত কোনো কোর্সে ফেইল করি নি, হয়তো খুব ভাল করতে পারি নাই। তার উপর দেশীয় অনেকই আছে ভাল করতেছে, দেশের নাম উজ্জ্বল হচ্ছে ভেবে গর্বিত হই।

গত দুইদিন ধরে মন খারাপ। বিশ্বকাপের শুরু থেকে যাদেরকেই সাপোর্ট দিছি, একে একে সবাই বিদায় নিছে। জীবনে এমন ছ্যাকা আর খাই নি। তাই ভাবছি কিছুক্ষণ প্যাছাল পাড়ি। বিরক্ত করে থাকলে দুঃখিত।

যারা জার্মানিতে আসতেছেন, যারা আসার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সবাইকে অভিনন্দন এই সুন্দর সিদ্ধান্তের জন্য। জার্মানির মতো ছাত্রবান্ধব (মেয়েরা পড়ুন, ছাত্রীবান্ধব) দেশ দ্বিতীয়টি আমার জানা নাই। জার্মানি মানে পুরো ইউরোপ- বিষয়টি মাথায় রাখবেন। আর আসার আগে একটু হলেও জার্মান শিখুন, যত বেশি শিখবেন, তত বেশি ভাল। না পারলে এই বাক্যটা ভালভাবে বলতে শিখুন- Sprechen Sie Englisch? (Do you speak English? )। 😀 এখানে জার্মান ভাষার গুরুত্ব অক্সিজেনের মত বললে বেশি বাড়াবাড়ি হবে না। তারমানে জার্মান ছাড়া চলা সম্ভব নয়? অবশ্যই সম্ভব, তবে শুরুর দিকে সাথে একটা অক্সিজেনের ডিব্বা (=জার্মান জানা কেউ) রাখতে হতে পারে 😛

পরিশেষে আমার কোর্স সম্পর্কে দু’একটা কথা বলি। আমি আছি পোটসডাম ইউনিভার্সিতে টক্সিকোলজিতে। কোর্সটি অনেকটা নতুন, ইউরোপের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ইউনিভার্সিটি এটি চালু করে। প্রফেসর সহ সবার (আমি ছাড়া) ভাষ্যমতে এটার ভবিষ্যত অনেক উজ্জ্বল। এটা ভেবে আমিও পুলকিত হই! 😀 বিশেষ করে ফার্মেসীর ছাত্রদের জন্য এই কোর্সটি বেশি উপযোগী। এছাড়াও আছে বায়োলজি, কেমিস্ট্রির ছাত্ররা। এসব ব্যাকগ্রাউন্ডের কেউ আসতে চাইলে আমরা আপনাকে ওয়েলকাম জানাচ্ছি। এখানে আমি সহ আরও কয়েকজন বাঙালি আপুরা আছেন। একটা কথা না বললেই নয়- জার্মানিতে আসার আগে, “বাঙালিদের বিশ্বাস করো না, বাঙালি মানেই চুতিয়া, চুদির ভাই” এই ধারণা ঝেড়ে আসবেন। এখানে আসলে দেখবেন এই সুদির ভাই, চুতিয়ারাই আপনাকে বেশি হেল্প করছে!

যারা ভিসা পেয়ে গেছেন কিংবা অফার লেটার পেয়ে ভিসার অপেক্ষায় আছেন সবাইকে অভিনন্দন। যারা অফার লেটার পান নি, বা অপেক্ষায় আছেন তাদের প্রতিও শুভ কামনা। ধৈর্য্য ধরুন, আমি দুই বছর চেষ্টা করে এখানে আসতে পেরেছি। স্বপ্নকে মরতে দিবেন না, তাইলেই স্বপ্ন একদিন আলোর মুখ দেখবে।