ট্রেনটা বিরামহীন ভাবে ছুটে চলছে।শহর পেরিয়ে অনেক দূরে,আমি অবাক হয়ে ট্রেনের স্বচ্ছ কাঁচের জানালা দিয়ে দেখি উদ্ভট সুন্দর প্রকৃতি ঠিক যেমনটা দেখতাম দেয়ালে টাঙ্গানো ছবিতে। মাথার মধ্যে হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। চিন্তা করতে করতে আর ক্লান্ত আমি কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি জানিনা! ঘুম ভাঙ্গল কোনও এক সুন্দরী সহযাত্রীর ডাকে, সোনালী চুল আর নীল চোখের ওই মেয়েটা আমাকে কি বলছে তা বুঝতে না পারলে ও এইটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, সে যা বলছে তার সার কথা হল এইটাই শেষ স্টেশন। তার মানে আমি ফ্রাঙ্কফুর্ট অডারে পৌঁছে গেছি। ফ্রাঙ্কফুর্ট বলতেই সবাই জার্মানির যে শহরটার কথা ভাবে এইটা ওই আলো ঝলমলে ফ্রাঙ্কফুর্ট না কিন্তু জার্মানিরই আর একটা শহর ” ফ্রাঙ্কফুর্ট অডার”, পোল্যান্ড এর সীমান্ত ঘেঁষা একটা শান্ত শহর।শহরের সীমান্তে যে নদীটা জার্মানি আর পোল্যান্ডকে ভাগ করেছে ওই নদীটার নাম ওডার নদী। একটানা দীর্ঘ বিমান যাত্রার পর বার্লিন থেকে আমার ফ্রাঙ্কফুর্ট অডার যাত্রা ট্রেনে করে। বাংলাদেশ থেকে ইন্টারনেট ঘেঁটে কিভাবে যেতে হবে তার একটা আইডিয়া নিয়ে রাখলে ও নতুন একটা দেশে সব কিছু কেমন জানি গুলিয়ে যাচ্ছিল। আমর অসহায় চেহরা দেখেই হয়ত নীল নয়না এবার পরিষ্কার ইংরেজিতে বলল তুমি কি আজই প্রথম এই শহরে, আমি উত্তর দিলাম এই শহরেই শুধু না, আজই প্রথম আমার জার্মানি আসা। জানতে পারলাম আমি শহরের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজনেস ইনফরমেশনে মাস্টার্সে পড়তে এসেছি সে ও ওই “ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ভিয়াদ্রিয়ানার” সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে পড়ছে, নাম ডিআনা।

ট্রেন থেকে নামার পর প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছিল আর গ্রীষ্মের সময় থাকাতে খুব একটা ঠান্ডা না থাকলে ও আমর হালকা ঠান্ডা লাগছিল। কথা বলতে বলতে আমরা, কাছের ট্রাম স্টেশনে পৌঁছালাম , ডিআনা জার্মান কিনা জানতে চাইলে বলল ওর বাবা জার্মান আর মা ইউক্রেনের। যাই হোক শেষ পর্যন্ত ডিআনার সহযোগিতায় আমি ঠিক ঠাক আমার জন্য বরাদ্দকৃত রুম খোঁজে পেয়ে গেলাম কোনও ঝামেলা ছাড়াই আর যাবার সময় ওর ফোন নম্বর আর মেইল এড্রেস দিয়ে বলল কোনও দরকার হলেই যেন জানাই, সে যতটা সম্ভব সাহায্য করবে। আমার ভিসা পেতে মাস খানেক দেরী হয়েছিল তত দিনে এক মাস ক্লাস শেষ. মাঝখান থেকে প্রোগ্রামিং ক্লাস কিছুই বোঝতে পারছিলাম না। প্রফেসর কার্ল কুর্বেলের ক্লাস ক্রমেই আমার কাছে অনেক দুর্বোধ্য হয়ে উঠলো, যেহেতু আমি আগের ক্লাস গুলা করতে পারিনি। ইতি মধ্যে একদিন সদা হাস্যউজ্জ্বল ডিআনা সাথে দেখা হয়ে গেল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে, জানতে চাইল আমার সব ঠিক ঠাক কিনা। কেন জানি ওই হাসি খুশি মেয়েটার সাথে আমার সমস্যা নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হয়নি তাই জানিয়ে দিলাম যে সব ভালো ভাবেই চলছে। আমার প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মার্কাস বলল তুমি সেকেন্ড ব্লক থেকে নূতন করে শুরু কর। তারমানে এই দুই মাস আমার করার মত তেমন কিছুই নাই।

জনসমুদ্রের শহর ঢাকা থেকে আসা এই আমি ,অতি শান্ত এই শহরে, একটা নূতন ভাষা, একটা নূতন কালচারে কেন জানি নিজেকে অনেক একা আর অসহায় লাগছিল। বলতে গেলে এই একাকীত্ব আমাকে পরিচয় করে দিয়েছিল অডার নদীর সাথে। নদীটা ও যেন এই শহর আর শহরের মানুষ গুলোর ভাষা বুঝে, এত শান্ত নদী আমি কখনো দেখিনি এর আগে। প্রতিটা দিন আমি এই নদীর তীর একা বসে দেশে ফেলে আসা সৃতি গুলো হাতরে বেড়াতাম। অনেক আপন হয়ে উঠলো এই নদী, মনে হত এই নদী এখন আমর মনের কথা ও বুঝতে পারে ।কখনো কখনো নদীর ওপাশের দেশ পোল্যান্ড থেকে ধব ধবে সাদা হাঁস গুলো উড়ে এসে জার্মানি সীমান্তে চলে আসতো মনে হত ওরা কত স্বাধীন ইচ্ছে হলে যেখানে খুশি চলে যায় আমি যদি ওদের মত উড়ে বেড়াতে পারতাম। একদিন সকালে মেইল চেক করে দেখি মিউনিখের একটা ইউনিভার্সিটি থেকে আমাকে Admission letter পাঠিয়েছে, যেখানে আমি আগেই apply করেছিলাম। ওই ইউনিভার্সিটির সাবজেক্টটা আমার পছন্দের ছিল তাই মিউনিখ চলে যেতে হল আমাকে।

যাবার সময় মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, এই অল্প দিনে শান্ত এই শহরটাকে আর অডার নদীটাকে ভালোবেসে ফেলেছি কিভাবে যেন, মনে হচ্ছিল অডার নদীর তীরে বসে হয়ত আমার আর দূরের পোল্যান্ডের পাহাড় আর শান্ত নদীর জলে নীল আকাশ দেখা হবে না। মিউনিখ সেই তুলনায় অনেক ব্যস্ত শহর আর আমিও ব্যস্ত হয়ে গেছি অনেক কিন্তু ভুলে যায়নি আমার একাকী দিনের সঙ্গীর অডার নদীর কথা। আমি অবাক হই একটা নদী কোনও দিন এই ভাবে আমর অনুভূতিতে জায়গা করে নিবে তা কি আমি কখনো ভেবেছিলাম!