যখন চিন্তা করি, এটা তো আমার পেশা নয়, এটা আমার প্যাশন, তখন নতুনভাবে উজ্জীবিত হই; আর প্যাশন ছেড়ে থাকা খুব কঠিন। পেশা ছেড়ে থাকা যায়, প্যাশন ছেড়ে থাকা যায় না। আপনি টাকা না হলে চলতে পারবেন, কিন্তু মন ছাড়া চলতে পারবেন না। 

~ মাশরাফি বিন মুর্তজা

 

শুরুতেই বলে দেই এই সিরিজটা তাদের জন্য নয় যারা “জার্মানিতে ব্যাচেলর করা যাবে কি?”, “ব্যাচেলর করতে কি কি লাগে?”, “ব্যাচেলর করতে গেলে কি জব পাওয়া যাবে কি?” টাইপের প্রশ্নকর্তাদের জন্য নয়। পোস্টটা খুবই একটি বিশেষ শ্রেণীর জন্য যারা – নিজেকে খুঁজে ফিরে পেতে চায় আবার, যাদের আবার সবকিছু শূন্য থেক শুরু করার সাহস আছে  তাদের জন্য। মোদ্দাকথা যাদের কাছে টাকা-চাকরি-ক্যারিয়ার থেকে নিজের প্যাশন বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাদের জন্য, যারা নিজেদের প্যাশনের জন্য লড়তে প্রস্তুত তাদের জন্য এই পোস্টটি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো ক্রিয়েটিভ ফিল্ডের কোর্সের খুব একটা প্রচলন নেই। তাছাড়া এখানকার নিয়মটাই এমন যে, ইন্টার পাশ করার পর পরিবার ও সমাজকে খুশি করতে খুবই হাইলাইটেড একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাইলাইটেড ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হতে হবে। একটা শিক্ষার্থীর নিজের ইচ্ছা যে খুব গুরুত্ব পায় তা কিন্তু না। এমনও অনেককে দেখেছি যার ইচ্ছা ফিল্ম বানানোর কিন্তু বাসার চাপে ব্যবসায় শিক্ষা কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, আবার একটা ছেলের ইচ্ছা ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া কিন্তু চান্স পায় নাই বলে ফিল্ম এন্ড মিডিয়াতে পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর মড়ার উপর খাড়ার ঘা-এর মত একবার কোথাও ভর্তি হয়ে গেলে কিংবা নিজের ভুল বুঝতে পারলে যে কোর্স কিংবা ডিপার্টমেন্ট পরিবর্তন করবে সে সুযোগ নেই। যদি করতেও হয় তবে তাকে আবার এক বছর এইচ.এস.সি. দিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হব, শুধু তাই না বয়সেরও বাধ্যবাধকতা আছে। যদিও প্রাইভেট উনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ থাকে, তবে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় সেটা হিসেব করে আমার কাছে মনে হইছে এর থেকে বাইরে পড়লে খরচ তার থেকে বেশি নয়, অনেক ক্ষেত্রে স্কলারশিপ পাওয়া যায় অথবা জার্মানির মত থাকা খাওয়ার খরচ ম্যানেজ করতে পারলেই হয়। তাই আবারও বলি, আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি শুধু তাদের জন্য যারা নিজের প্যাশনকেই বেশি গুরুত্ব দেয়, যারা হয়ত জীবনে একবার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা জায়গায় আটকে আছে কিন্তু বের হতে পারছে না – তাদের জন্য।

 

আমার অভিজ্ঞতার শুরু এস.এস.সি পরীক্ষার পরে, ২০০৭ সালের দিকে। ভাইয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অ্যাসাইনমেন্ট ছিল কোন সফল উদ্যোক্তাকে নিয়ে ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য। আমি কম্পিউটার ভালো চালাতে পারতাম দেখে সেটা এডিটিং-এ আমার সাহায্য চায় ভাইয়া। সবে, উইন্ডোজ ভিডিও এডিটর শিখছি নিজে নিজে, বলা যায় গুঁতানো শুরু করেছি। তখন নিজ আগ্রহে কাজটা করে দেই। তখন বেশ মজা লেগেছিল, ভিডিও আর ফটো জোড়া দিয়ে নতুন কিছু বানিয়ে, একটা গল্প বলতে পেরে। এইটাই যে পরবর্তীতে আমার জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলবে তখন বুঝি নাই। আজকে সেইটা বুঝতে পারছি।

 

এরপরে, বুয়েটে ভর্তি হলাম। আমি বরাবরই মেকানিক্স আর ফ্লুয়িড ব্যাপারটা বুঝতাম না, কোনমতে ইন্টার পাড় করেছিলাম এই দুইটা বিষইয়ে ছাড়াই। কিন্তু, কথায় আছে না – “যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত পোহায়!”? ঠিক তেমনই আমার ডিপার্ট্মেন্টের মূল আলোচ্য বিষয় – ফ্লুয়িড মেকানিক্স, আর সাথে একগাদা ইম্পেরিক্যাল ফর্মুলা অর্থাৎ মুখস্ত বিদ্যা অনেকটা। ব্যস, যা হবার হল ভার্সিটির রেজাল্ট খারাপ হতে লাগল। আর সাথে শুরু হল হতাশা।

 

হতাশ হয়ে পড়ছিলাম কিন্তু বেঁচে ছিলাম কিছু বন্ধুর জন্য, যারা আমার মত নিজেকে তাদের ডিপার্টমেন্টের সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না, যাদের আগ্রহ ও প্যাশন আছে কিন্তু যে বিষয়ে পড়ছে সে বিষয়ে না। ড্রপ-আউট টার্মটা যাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা সবসময় সবার কাছে আভিযোগ শুনে আসে যে “একটা সিট নষ্ট করতেছে, ওইখানে অন্য কেউ পড়লে ভালো হত…”। হয়ত বুয়েটের একটা সিট নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু যদি কোন উপায় তখন পেতাম তবে আমি হলফ করে বলতে পারি এই ছেলেগুলো যদি আরেকবার সুযোগ পেত তাহলে বুয়েটে ভর্তি হত না। কিন্তু, ঐযে শুরুতেই বলে দিছি যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদেরকে কোন সুযোগ দেওয়া হয় না। নিজেদের ভুলের মাশুল গুনতে হয় সারাটা জীবন, আর এভাবেই মরে যায় এক একটা সম্ভাবনাময় শিল্পী, গল্পকার, চিত্রকর, পরিচালক, গায়ক ইত্যাদি। আমার এই বন্ধুদের সবারই আগ্রহ ছিল ফিল্ম, গেম এবং মিডিয়া নিয়ে, সাথে আরও আগ্রহ ছিল প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট ও ভিন্ন কিছু করাতে। তাই সবাই মিলে শুরু করলাম নতুন যাত্রা। এক রকমের পড়ালেখা বাদ দিয়ে আমরা লেগে গেলাম ফিল্ম বানাতে, ভার্সিটির বিভিন্ন প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্টে। একসময় বন্ধুবর মাশা মুস্তাকিমের সাথে শুরু হল PortBliss-এর যাত্রা। আমি যেহেতু ইলাস্ট্রেটর পারতাম কিছুটা আর মোটামুটি গল্প বলা সম্পর্কে একটু আইডিয়া ছিল তাই শুরু করি গেমের ইন্টারফেস ডিজাইনার হিসেবে এবং পরবর্তীতে গল্প কিংবা গেম মেকানিক্স নিয়েও মাশার সাথে আলোচনা হত, সাথে ভিডিও এডিটিং পারি বলে ট্রেইলার বানাতাম। পোর্টব্লিসও তখন ছোট, “হিরোজ অফ ৭১”-এর আইডিয়া মাথায় থাকলেও এই ধরনের বড় প্রজেক্ট করার মত স্কিল, লোকবল কিংবা অর্থ কোনটাই আমাদের ছিল না তখন। আমরা সাধারণত ক্লায়েন্টের কাজ করতাম, আপওয়ার্ক থেকে ছোট ছোট গেমের কাজ নিতাম। এর মধ্যে রেজাল্টের অবস্থা আরও শোচনীয় হল। কাজ চলছিল, কিন্তু পেট চলছিল না ঠিকমত। এমন সময় এক বড় ভাই আসলেন চাকরী নিয়ে একটা আমার জন্য। জয়েন করলাম সেখানে। আমার পড়ালেখা রিলেটেড না, পুরোটাই প্যাশনের জায়গা – কোন গল্প কিংবা ঘটনাকে ভিডিও অথবা স্থিরচিত্রে উপস্থাপন করা। অফিসের সাথে পোর্টব্লিস সামলাতে কষ্ট হচ্ছিল দেখে পোর্টব্লিস ছেড়ে দিলাম এক সময়, যদিও সম্পর্কটা এখনও আছে। চাকরিটাও বেশ উপভোগ করছিলাম। টিমের কনিষ্ঠতম সদস্য হওয়াতে বাকি ৩ জন আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতন আগলে রেখেছিলেন। কিন্তু, একসময় এসে চাকরির কন্ট্রাক্ট শেষ হল। তখন ভাবতে বসলাম কি করা যায়। ব্যাচেলর পড়ছি আট বছর ধরে এক ডিপার্টমেন্টে, অথচ আমার কাজের অভিজ্ঞতা অন্য বিষয়ে। প্যাশন একদিকে আর পড়ালেখা অন্যদিকে। যদিও বেঁচে ছিলাম প্যাশনের উপর ভর করে, কিন্তু এভাবে আর কতদিন। আব্বুও রিটায়ার করবে কয়েকদিন পরে, নিজেকে পথ দেখতে হবে, নিজেকে দাড় করাতে হবে। কিন্তু চাকরি তো আমাকে দিবে না যেটা করতে চাই সেইটা সার্টিফিকেটের অভাবে, যেখানে আবার কাজের অভিজ্ঞতা বলে অন্য কথা। চাকরিদাতারাও বিশ্বাস করতে চায় না আমার কথা। যাই হোক, জার্মানিতে পড়ার আগ্রহ ছিল আগে থেকেই। মেইল করলাম দুই-চারটা উনিভার্সিটিকে আমার এখানকার ব্যাচেলরস দিয়ে ওইখানে মিডিয়া রিলেটেড সাবজেক্টে অ্যাপ্লাই করতে পারব কিনা, বিশেষ করে গেমের পর। সরাসরি উত্তর মিলল,”না!” সুতরাং, প্রথমেই হতাশ হলাম। না পাই চাকরি, না কোন ইউনিভার্সিটি আমাকে সুযোগ দেয় পছন্দের সাবজেক্টের জন্য। যদি কোনভাবে কোনা-কাঞ্চি দিয়েও আমার সাবজেক্টটাকে রিলেট করাইতে পারতাম তাইলেও হত।

 

এদিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, আর এক-দুই টার্ম পরে বুয়েট থেকে মোটামুটি লাথি মেরে বের করে দিবে – টাকা দাও এবং পড়, নইলে ভাগো! অবশেষে, অনেক ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম, প্যাশন নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে। দরকার হয় ব্যাচেলর্স দিয়েই আবার শুরু করব। কারণ, হয়ত এই বছর পরে আমার হাতে আর সুযোগ থাকবে না। নিজেকে আল্টিমেটাম দিলাম, যদি এই বছর কোথাও চান্স না পাই তাইলে পরের বছর থেকে প্যাশনকে ছেড়ে দিব। শুরু করলাম, তথ্য সংগ্রহ। অনেক খুঁজেছি https://www.daad.de (কিভাবে কোর্স খুঁজবেন – ক্লিক করুন এখানে) এবং https://www.hochschulkompass.de/home.html সাইট দুইটাতে (পরের পর্বে বিস্তারিত বলব কিভাবে কোর্স সার্চ করতে হয় হক্সুলকম্পাস সাইট থেকে)। জানুয়ারি থেকে শুরু করে স্প্রেডশিট ফাইল বানালাম একটা। সম্ভাব্য কোথায় কোথায় অ্যাপ্লিকেশন করা যায়। ততদিনে সামার সেমিস্টারে অ্যাপ্লিকেশনের ডেডলাইন শেষ। সুতরাং, উইন্টারের জন্যই খুঁজতে শুরু করলাম। পাশাপাশি আবিষ্কার করলাম, নরওয়েতে আমার পছন্দের সাবজেক্ট থাকলেও ওইগুলোতে অ্যাপ্লিকেশনের ডেডলাইন শেষ। সুতরাং, জার্মানি দিয়েই অ্যাপ্লিকেশন শুরু করব ভাবলাম। শুরু করলাম নতুন করে সবকিছু শুরু করার, নিজের প্রথম ভুলটা সংশোধনের চেষ্টা।

 

[ইচ্ছা আছে আর কয়েকটা পর্ব লেখার। সময়মত করে আস্তে আস্তে লিখব। পরের পর্ব – কোর্স বাছাই (বিশেষ করেhttps://www.hochschulkompass.de/home.html নিয়ে)]