১.

ছোট্ট কিন্তু ছিমছাম ডমিস্টিক প্লেনটায় চেপে সবে সিটবেল্ট হাতড়াচ্ছি। জাহাজের ক্যাপ্টেন উৎসাহের সাথে অনর্থক বাকবাকুম করে যাচ্ছে। তার বিষয়বস্তুর ভেতর আছে সকালের মিষ্টি রোদ, চমৎকার আবহাওয়া আর পৌঁছাতে কতক্ষ্ন লাগবে ইত্যাদি শুভযাত্রামূলক কথাবার্তা। বৈমানিক না হয়ে উপস্থাপিকা হলেও তাকে বেশ মানিয়ে যেত। তবে অতি কথনের ফলে আজকে ষোলই ডিসেম্বরে সে দুই বার করে সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। একবার বাংলায় আরেকবার ইংরেজিতে। ভীষন একটা অস্বস্তি নিয়ে ব্যাপারটাকে ‘স্লিপ অব টাঙ’ ধরে নিলাম। এক ফাঁকে বিমানবালা এসে আঙ্গুলের ফাঁকে লাল-সবুজ কাগজের পতাকা গুঁজে দিয়ে গেল। শিশুতোষ আগ্রহে পতাকা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বিজয় দিবস গুলিয়ে ফেলার গুরু পাপটা মাফ করে দেবো কিনা ভাবছি। স্বাধীন দেশে ভুল করার স্বাধীনতা লোকের থাকতেই পারে। এখন শুধু ভুল করে আমাদেরকে ঢাকা-টু-কক্সবাজারের বদলে আরেকখানে উড়িয়ে নিয়ে না ফেললেই হল।

এই ভ্রমনের মাথা মুন্ডু কিছুই জানি না। গন্তব্য আপাতত কক্সবাজার হলেও আসলে সেখান থেকে যাচ্ছি সেন্ট মার্টিন্স। ব্যস, এর বেশি কিছু জানানো হয় নি। এটা নাকি একটা সারপ্রাইজ ট্যুর। তাই চাপাচাপি করতে গেলে রহস্যের মুচকি হাসি ছাড়া আর কোনো উত্তর মেলে নি। খালি বলা হয়েছে, যেন চক্কর বক্কর জামা না পড়ে সাধারন জিন্স-ফতুয়া আর আরামদায়ক চপ্পল পড়ে আসি। আর হালকা একটা কাঁধের ঝোলায় খান কতক কাপড় পুরে আনি। কথা পুরোপুরি রাখা সম্ভব হয় নি। ব্যাগে কি সব হাবিজাবি পুরে জগদ্দল পাথর বানিয়ে এনেছি। দেখতে লাগছে উঁইয়ের ঢিপির মতন। সেটাকে ওভারহেড বাংকারে আঁটাতে না পেরে আসনের নিচে আশ্রয় দিতে হয়েছে। পা ছড়িয়ে বসার আরামটুকু এখন সম্পূর্ন বেদখলে।

পুরো ভ্রমনের নীল নকশা এঁকেছে আমার ভাই রোনে আর ঝুমু আপু মিলে। আপু ডাকলেও সম্পর্কে ভাবী হন। তার ছটফটে স্বভাবের সাথে ভাবী ডাকটা ভারিক্কি লাগে দেখে সেদিকে যাই না। তবে ‘আপনি’ বলার সহবতটুকু মেনে চলি। ওদিকে সাত বছরের বড় ভাইয়ের বেলায় আদব-কেতার ব্যাপারগুলো কেন যেন ঠিক মনে আসে না। যদিও তাকে জনসম্মুক্ষে মামদো ভূত ডাকা ছেড়ে দিয়েছি বেশ কয়েক বছর হল।

যাহোক, পেশায় মারাত্মক ব্যস্ত এই দু’জন ডাক্তার মানুষ কিভাবে যেন তাদের রুটিন থেকে দিন কতক ছুটি ম্যানেজ করে আমাদেরকে ভজিয়ে ভাজিয়ে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর প্রবাস থেকে দেশে ফিরে সেই এক ঢাকাতেই ঘুরপাক খেতে থাকা আমরা এমন নিরুদ্দেশ হবার সুযোগ লুফে নিতে তাই দুইবার ভাবি নি। তাছাড়া, এ যে ছুটির ভেতর ছুটি!

চল্লিশ মিনিটের মাথায় কক্সবাজারের মাটি ছুঁয়ে ফেললাম। আমাদের সাতজনের দলটা বিমান থেকে প্রায় লাফিয়ে বেরিয়ে এলাম। সাতজন বলতে দুই ছানা পোনা সমেত ভাইয়া-আপুরা চার জন আর এদিকে ছোট এক ছানা, তার বড় এক বাবা আর মাঝারি আমি-এই আমরা তিন জন। ছানাদের কারো বয়স সাত, কারো বারো, কারো বা পাঁচও হয় নি। তবে আজকে আমরাও শিং কেটে বাছুর বনে গেছি। কারন, প্লেন থেকে নেমেই ডাবল ডিজিটের গম্ভীর বয়সগুলোকে বঙ্গোপসাগরের পানিতে ডুবিয়ে দিয়ে এক ধাক্কায় সিঙ্গেল ডিজিটের আট-নয় বনে গেছি। হারিয়ে যাবার আজ নেই মানা।

এখানে সাগর থেকে উড়ে আসা নোনা স্বাদের বাতাসটা অদ্ভূত রকমের তাজা। জোরে একটা দম নিয়ে আত্মহারা হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম সবাই, ‘হিপ্ হিপ্, হুররে…!’ ঘাড় ঘুরিয়ে লোকজন অবাক তাকালো। তোয়াক্কাই করলাম না। বরং শীতের সকালের কুসুম কুসুম রোদ গায়ে মেখে তিড়িং বিড়িং ফড়িং নেচে অপেক্ষায় থাকা মাইক্রোবাস বরাবর রওনা দিলাম। বাচ্চা-কাচ্চারা আগে আগে ছুটছে। উঁচিয়ে ধরা কাগজের পতাকাগুলো মাতাল হয়ে উড়ছে খোলা হাওয়ায়।

২.

মেরিন ড্রাইভ। কক্সবাজার সৈকতের সমান্তরালে বয়ে চলা পথ। ডানে সারি সারি রং বেরঙ্গের সাম্পান অলস দাঁড়িয়ে। ডাক পড়লেই আলস্য ঝেড়ে সাগরে পাল তুলে দেবে। আর বামে পাহাড়। যেন ঘুমিয়ে থাকা সবুজ ড্রাগন। এই বুঝি ফোঁস্ করে জেগে উঠলো। পাহাড়ের আঁচলে কখনো পানের বরজ, কখনো বা ধান ক্ষেতের আলে জাবর কাটায় ব্যস্ত একটা দুটো গরু।

সেই শৈশবে, পাঁচ বছর বয়সে একবার কক্সবাজার এসেছি। তবুও স্মৃতিতে সমুদ্রের গর্জন আর লাল কাঁকড়া ঠিকই রয়ে গেছে। তার সাথে এখন যোগ হল পথের দুই ধারের অপরূপ ছবিগুলো। কাঁচ ঢাকা গাড়ির ভেতরে বসে আমরা যতটুক পারছি হা করে দেখছি। বাচ্চারাও ট্যাঁ-ফো থামিয়ে দিয়েছে। তাদের চোখে-মুখে অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের বিস্ময়।

ছাপড়া দোকানে ঝুলিয়ে রাখা কচি ডাব দেখে তেষ্টা পেয়ে গেল। যাত্রা বিরতি নেয়া দরকার। ড্রাইভার মোতালেব বিশাল মাইক্রোবাসটা কসরত করে এক পাশে থামালো। জনপ্রতি একটা করে ডাব নিয়ে নড়বড়ে চেয়ারে আর বেঞ্চিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছি সবাই আয়েশী ভঙ্গিতে। পানি খেয়ে শেষ করার পরে ডাব ফাটিয়ে দেয়া হল। সাথে ডাবের এক কোনা ভেঙ্গে চামচ বানিয়ে দেয়া হয়েছে। শাঁস খাবার জন্যে। ডাব-নারকেলের বিশেষ একটা ভক্ত নই। কিন্তু ভাইয়া আর ঝুমু আপু দুইজন দুদিক থেকে চাপাচাপি জুড়েছে। বিপদ বুঝে এক কাপ চা হাতে নিরাপদ দূরত্বে পিছলে গেলাম। কিন্তু ছাড়া পেল না তাফসু মিয়া। তার দুই পাশ থেকে রেন আর রন জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরা ভাইয়া-আপুর যোগ্য উত্তরসূরী। কারন, সাড়ে চার বছরের তাফসু মিয়ার হাতে তার মাথার সাইজের একটা ডাব দেখা যাচ্ছে। তাকে এক টুকরো শাঁস মুখে তুলে দেয়া হচ্ছে। বেচারা পিয়ার প্রেশারে পড়ে ক্যোৎ করে জিনিসটা গিলে ফেলে ঠোঁটের কোনে বোকাটে হাসি ঝুলিয়ে সহজ হবার চেষ্টা করছে।

কোত্থেকে লম্বা কানের কালো একটা ছাগল জুটে গেছে। ছুড়ে দেয়া ডাব থেকে চেটেপুটে শাঁস খেয়ে তৃপ্তির একটা ব্যা ব্যা ঢেকুর তুলে সে গা এলিয়ে বসেই পড়লো পায়ের কাছে। তাকে হতাশ করে চায়ের কাপে শেষ চুমুক মেরে উঠে দাঁড়ালাম। বেনী দুলিয়ে রেন এসে ঘাড়ে উপর এসে তাড়া দিতে লাগলো, ‘রিম, তাড়াতাড়ি। চলো, গাড়িতে উঠি।‘ রেনের চেহারা হুবহু আমার মত। একেবারে যমজ বলে ভুল হবার মত অবিকল, যদিও আমি তার ফুপু এবং বয়সে তিন গুন। কিন্তু ওসব ফুপু-টুপুর ধার আমরা দু’জনের কেউই ধারি না। সুতরাং, ডাকাডাকিগুলো ডাকনামেই চলে। একই স্বাধীনতা সাত বছরের বেজায় দুষ্টু ছেলে রন-কেও দেয়া আছে। সেও খানিক দূর থেকে নাম ধরে চেঁচিয়ে চলছে, ‘এ্যাই রিইইইম…’।  

৩.

নাফ নদীর ঘাটে আগে থেকে ঠিক করা স্পীডবোট দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রার আয়োজনে কোথাও কোনো ত্রুটি নেই। মনে মনে তারিফ করতেই হল। লাইফ জ্যাকেটগুলো চাপানোর পর তীব্র কটকটে কমলা রঙে চারপাশে রীতিমত আগুন লেগে গেল। আমাদের স্পীডবোট পঙ্খিরাজের বেগে ছুটে চলল ঘোলাটে নদীর ঢেউ চিরে।

হঠাৎ আবিষ্কার করলাম সাগরে এসে পড়েছি। জলের রং বদলে গেছে। এই রঙ না নীল, না সবুজ। বরং একটা পাথরের সাথে খুব মিল। ঝকঝকে ফিরোজা আকাশটা দেখে চট করে মনে পড়ে গেল। এই সাগরের পানি আসলে পান্না রঙের। রোদের ছোঁয়ায় ঢেউয়ের চূড়াগুলো পান্নার মত ঝিকমিক করছে। মাথা ওপর ফিরোজা আকাশ, পায়ের নিচে পান্না সাগর আর সারা গায়ে কাঁচা সোনা রোদ- মনি মানিক্যের বেশুমার ছড়াছড়ির ভেতর আমরা, গৎবাধা শহুরে মানুষগুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে আছি।

খানিক বাদে চোট্ট একটা দ্বীপ ভেসে উঠল সাগর ফুড়ে। স্পীডবোটটা গতি কমিয়ে শূন্যে নিয়ে আসলো। নৌকা আর চলবে না। স্বচ্ছ জলের নিচে কোরালের উঁকিঝুঁকি দেখে বুঝে নিলাম। হাঁটুপানিতে নেমে পড়তে হবে জিন্স গুটিয়ে। বাচ্চাগুলোকে কোলে করে পাড় করে দেয়া হল। টালুমালু খেতে খেতে জল ডিঙ্গিয়ে পাড়ে এসে নরম বালুতে পা ডুবিয়ে দাঁড়ালাম। সারি সারি নারিকেল গাছের পাতাগুলো মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে আবার বাতাসে এঁকেবেঁকে নির্বিকার বইতে লাগলো।

পাড়ে দাঁড়ানো জনাকয়েক লোক এসে একে একে ভাইয়াকে জাপটে ধরছে। সেও সহাস্যে প্রশেনের পর প্রশ্ন ছুড়ছে। ‘আরে চাচা, কেমন আছেন? কি খবর সুমন, ইয়াসীর কই?’ এখানে ভাইয়া ছানাপোনা নিয়ে আগেও এসেছিল। নাম মনে রাখার অদ্ভূত ক্ষমতা আর উষ্ণ স্বভাবের কারনে সে যেখানে যায়, লোকজন তাকে নিজেদের একজন বানিয়ে নেয়। এখানেও তাই।

দূর থেকে দেড়ফুটি আরেকজন দূর্বার গতিতে ছুটে আসছে। তার গায়ে গোলাপি শার্ট। পরনে ঢলঢলে হাফ প্যান্ট, যেটা যেকোন দুর্বল মুহূর্তে খুলে পড়তে পারে। তীরের কাছে এসেই সে আমাদের রন-কে পেয়ে ঈদের কোলাকুলি করে নিল প্রায়। রনও আনন্দে গলা ফাটিয়ে হুঙ্কার ছাড়ল, ‘ইয়াসীঈঈর…!’ এই তাহলে ইয়াসীর। আগেরবারে বেড়াতে এসে তার সাথে দারুন বন্ধুত্ব বনে গিয়েছিল রনের। ইয়াসীরকে ঘিরে বাচ্চারা হইহই করছে খুশিতে। সেও স্থানীয় কক্সবাজারীয় আর সেন্ট মার্টিনীয় উচ্চারনের মিশেলে হিং পিং করে কি কি যেন বলছে। ভাল করে শুনেও কিছু বুঝতে পারলাম না। হাল ছেড়ে বাকিদের সাথে পা মিলিয়ে কোরাল দ্বীপের মিহি বালু মাড়িয়ে এগোতে থাকলাম।

৪.

হাতে করে গুনে গুনে ঠিক তিন দিন নিয়ে এসেছি। এই মহার্ঘ্য সময় শুয়ে বসে নষ্ট করা যাবে না। গেস্টহাউসে বোঁচকা-বুঁচকি নামিয়ে চট করে কাপড় পাল্টে তৈরি হয়ে নিলাম। বেরিয়ে দেখি মাঝ-দুপুরের রোদ ঠিক মাথার ওপর। বেচারা ডিসেম্বরের রোদটা তেজ দেখিয়ে খুব একটা কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তার কাটা ঘায়ে আরো নুনের ছিটা দিচ্ছে হালকা একটা তিরতিরে বাতাস। মনটা চনমন করে উঠল। এই চনমন সাগরে ইচ্ছে মত হুটোপুটি খাবার জন্যে চনমন।

অবশ্য আমি এই দলে নেই। পানিভীতি আছে। দৌড় বড়জোড় পা ভেজানো পর্যন্ত। হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে মিনমিনে সুরে বাকিদের তাড়া দিলাম, ‘তোমরা যাও, যাও, আমি আসছি আস্তে ধীরে…’ কথাটা শেষ না হতেই কে যেন ধাক্কা মেরে ফেলে দিল ঝপাং! গ্লাক গ্লাক করে কিছু পানি খেয়ে ফেলবো, নাকি ভুলে যাওয়া সাঁতারটা মনে করার চেষ্টা করবো- বুঝে উঠতে না পেরে, যে আমাকে জলে ফেলে হাওয়া হয়ে গেছে, তাকে ধাওয়া করলাম। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ধরেও ফেললাম। ধরা পড়ে রেন খিলখিল করে হেসে উঠল। চোখ-মুখ খিঁচে এক চোট ফুপুগিরি ফলাতে যাবো, আর তখনি মাথায় খেললো, ওখান থেকে এখানে আসলাম কি করে? সাঁতরে না তো? আরিব্বাপস্! এই আকস্মিক বিস্ময়ের সুযোগ নিয়ে আধা কলস লবন পানি বিনা চিনিতে ওরস্যালাইন সেজে গলা দিয়ে সুড়ুৎ করে পেটে চালান হয়ে গেল।

এত খানি লবন একবারে গিলে ব্লাড প্রেশারটা বোধহয় খানিকটা বেড়েই গেল। মনে হচ্ছে হাঙ্গরের মত কি যেন একটা চারপাশে ঘাঁই মারছে।  ভয় পেয়ে ভড়কে যাবার আগেই দেখি দুই হাতে প্লাস্টিকের ফ্লোটিং ডিভাইস লাগিয়ে ভেসে থাকা তাফসু মিয়াই হাঙ্গর সেজে ঘাঁই মারছে। কি ভেবে সে হঠাৎ কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল ‘মা, আমার না পানিতে পিপি করতে খুব ভাল লাগে‘। বলেই হাঁসের মত পা চালিয়ে তার মামার দিকে রওনা দিয়ে দিল। তার মানে একটু আগে লবন পানির সাথে তাহলে আরো কিছু গিলেছি! কিন্তু যা হবার তো হয়ে গেছে। মুখ ভঁচকিয়ে লাভ নেই, স্বান্তনা দিলাম নিজেকে।

সাগরে ভাটার সময় হয়ে এসেছে। খিদেটাও চাগিয়ে উঠছে। জল ছেড়ে ডাঙ্গায় ফিরে এলাম। ছানাপোনাদেরকে এক রকম চ্যাংদোলা করে আনতে হয়েছে। সমুদ্র তাদের ভাল লেগে গেছে। তাদেরকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে আবার পানিতে নামা হবে কালকে।

৫.

সবাই মিলে খেতে বসেছি। গেস্টহাউসের চাচা লেবু-কাঁচামরিচের বাটি নিয়ে ছুটোছুটি করছে। একটু বাদেই সবার পাতে তাজা মাছের বড় বড় পেটিগুলো উড়ে এসে  ডাল, সবজি আর সাদা ভাতকে আরেক উচ্চতায় নিয়ে গেল। আমরা কবজি, কনুই সব ডুবিয়ে গলা অবধি খেয়ে ভালুকের মত গা ছেড়ে বসে থাকলাম কিছুক্ষন। এই না হলে জীবন, আর এই না হলে ছুটি!

গেস্টহাউসের সামনে সুমনের চায়ের দোকানে এক প্রস্থ দেশী চা আর বার্মিজ কফি মেরে দিয়ে দ্বীপটা হেঁটে দেখবো বলে পা চালালাম। ছোট্ট ঈয়াসীর আশে পাশেই ছিল। এবার বাবার কাছে বায়না ধরলো আমাদের সাথে যাবে বলে। সুমনও নির্বিকার সায় দিয়ে দিল। চার পা এগোতেই দেখলাম, সে এই দ্বীপের অতি পরিচিত মুখ। ডাবওয়ালা পাশ দিয়ে যাবার সময় খোঁজ নিয়ে গেল, তার সাইকেল ঠিক হয়েছে কিনা। আবার এক পাল গরু খেদাতে ব্যস্ত বালক রাখাল  দূর থেকে হাঁক দিল, ‘কই যাস রে ঈয়াসীর?’। ঈয়াসীরও জবাবের পর জবাব দিতে দিতে এলোমেলো পায়ে রন আর তাফসু মিয়ার পাশে পাশে চলছে।

চপ্পল খুলে হাতে নিয়েছি। নরম কাদামাটিতে পায়ের ছাপ এঁকে আমাদের দলটা একটু দ্রুতই এগোচ্ছি। নইলে জোয়ারে আটকে যাব। ভাটায় সাগর সরে গিয়েছে বহুদূর। সেন্টমার্টিন্সের দিগন্ত জুড়ে এখন শুধু কোরাল আর কোরাল। তাদ্র গায়ে অসংখ্য ফুটোগুলো না থাকলে কালো পাথরের চাঁই বলে ভুল হত। মৃত কোরালের গায়ে ক্রমে ক্রমে কাদা-বালি জমে জমে এগুলো পাথরের চেহারা নিয়েছে। আর জ্যান্ত সাদা কোরালও আছে। কিন্তু চোখে পড়ছে খুব কম। আগে নাকি এমনটা ছিল না। ভাটায় পানি সরে গেলে সফেদ কোরাল্গুলো মুক্তোর মত জেগে উঠত। তাদের গায়ে শামুক-ঝিনুক আর কত না জলজ প্রানির বসত। এক আধটা সাদাটে কোরাল দেখলেই বাচ্চারা ছুটে যাচ্ছে। বড়রাও তাদের পিছু নিচ্ছি। কাঠি-কুটো দিয়ে কোরাল খুঁচিয়ে ফেললে আরেক বিপদ।

খানিকবাদে আবিষ্কার করলাম, কোরাল বাদেও অনেক অ-সামুদ্রিক জিনিসে দ্বীপের এদিকটা সয়লাব। একে একে মিলল নানা আকারের প্লাস্টিকের বোতল, রাবারের স্যান্ডেল, পলিথিনের ব্যাগ, সিমেন্টের খালি বস্তা ইত্যাদি ইত্যাদি। তারই মাঝে আর এক-আধটা লাল কাঁকড়া ধুঁকে ধুঁকে চলছে। মনটাই ভেঙ্গে গেল। কার যেন একটা লুঙ্গিও পড়ে থাকতে দেখলাম দুই কোরালের খাঁজে। গত বছর মাল্টা বলে এক দেশে ঘুরতে গিয়ে সৈকতে হাফ-প্যান্ট খুঁজে পেয়েছিলাম। দেশীয় লুঙ্গিটা তাই আমাকে ঘাবড়াতে পারলো না। কিন্তু বিপুল প্লাস্টিক আবর্জনার বহর দেখে কৌতুহল জাগল এত ময়লা এখানে ফেলল কারা? তারা কোন বাপের ব্যাটা? ঠিক হল, ফিরতি পথে যত পারি সবাই মিলে যা পারি কুড়িয়ে নিয়ে যাব। হোক না সেটা ‘লিখে রেখো, এক ফোঁটা দিলেম শিশির’।

৬.

বিকালের রোদটা কোমল হয়ে এসেছে। সোনালি আভার মাঝে হঠাৎ রুপালি ঝিলিক দেখলাম মনে হল। একটু এগোতেই দেখি জাল ফেলে তোলা ছোট ছোট মাছ বালুতে শুকাতে ব্যস্ত জেলেদের দল। মাছগুলো দিনভর রোদে শুকিয়ে শুকিয়ে শুটকি হবে এক সময়। তারপর বাজার ঘুরে কারো ঘরের হেঁশেলে ঢুঁকে জিভে জল আসা চচ্চড়ি হয়ে কোন বা লোকের পাতে পড়বে। পেট পুরে ভাত খেয়ে আসার পরেও কাল্পনিক ঝোলের ধোঁয়া ওঠা সাগরে মন হারিয়ে যেতে বাঁধলো না কোথাও। 

প্রায় নিরিবিলি এলাকাটায় একলা দাঁড়ানো চায়ের টং দেখে আমরা অবাকই হলাম। ভাইয়া চোখ মটকে ইশারা দিল, ‘আরেকবার চা হয়ে যাবে নাকি?’ কথা ফুরানোর আগেই কড়িৎকর্মা  ঝুমু আপু জনপ্রতি চায়ের অর্ডার দিয়ে ফেললো। কাঠের নড়বড়ে বেঞ্চি আর পেতে রাখা চেয়ারগুলো দখল করে দোকানের বেড়ায় যা যা ঝোলানো আছে প্রায় সব কিছু নামিয়ে ফেলতে লাগলাম। এলাচি বিস্কুট থেকে আনারস-ক্রিম বিস্কুট, কিছুই বাদ থাকলো না। এমন বুভুক্ষের দল এই দোকানের দোকানী আর আগে দেখে নি বোধহয়। তবে সযত্নে খোসাগুলো ময়লার ঝুড়িতে জমা দিতে ভুল হল না।

এই দোকান যারা চালায় তাদের একটা বিশেষত্ব আছে। তার বিশদ বিবরনটা সামনে টাঙ্গানো কার্ডবোর্ডে লাল হরফে হাতে লিখে রাখা হয়েছে। ডায়বেটিস ঘটিয়ে দেয়ার মত মারাত্মক মিষ্টি শরবত-চায়ের কাপে খুব সাবধানে চুমুক দিয়ে লেখাটা পড়লাম। বানান সামান্য এদিক-ওদিক আছে যদিও। ‘ছেরাদ্বীপের একটি পরিবার মোঃ হোসেন আলী। হোটেল মৌসুমী। এইখানে সকালের BRACK PAST তেকে দুপুরের খাবার পায়া যায়।‘ তার মানে সেন্টমার্টিন্সের আসল দ্বীপ্টা থেকে দূরে জনমানবহীন এই ছেঁড়া দ্বীপে হোসেন আলীরাই একমাত্র অধিবাসী। সে তার বউ কিংবা মেয়ের নামের এই হোটেল অবলিক চায়ের দোকান চালায়। সংকোচে জানতে চাই নি। বাঁশের বেড়ার ওপাশেই তাদের বাড়িঘর চোখে পড়ল। গোয়ালে দু’টো গরু বাঁধা আর উঠানে এক ডজন হাঁস-মুরগি ছাড়া। এমন নির্ঝঞ্ঝাট, নির্বিবাদ জীবন দেখে হোসেন আলীদের হিংসাই হল আমাদের।

নাস্তা-পানি পেটে পড়ে সবার ফুয়েল ট্যাংকি ফুল। আবারো পদব্রজে রওনা দিলাম। দূরে যুদ্ধ জাহাজ ভাসছে মনে হল। চোখ কচলে আবার তাকিয়ে দেখি আসলেই তাই। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অতিকায় টহল জাহাজ। জল সীমানার অতন্দ্রপ্রহরী। ওপাশে সারি সারি পাহাড় ডাঙ্গায় ভেসে আসা তিমির মত শুয়ে স্থির। দেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে ঝুমু আপু উৎসাহী আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখালো, ‘ঐ যে মিয়ানমার। আর ঐ যে আরাকান। নাম শুনেছো তো?’ শুনবো না মানে? আরাকান-আলাওল-পদ্মাবতী, নামগুলো বিদ্যুতের মত মগজে খেলে গেলো। সেই আরাকান! কত শত বছর আগে হঠাৎ একদিন আলাওল নামে ক্ষ্যাপাটে এক বাঙালি তরুন আরাকানের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হাজির। আস্তে আস্তে জানা গেল, মার-মার তলোয়ার চালাতে পটু এই সৈন্য কাট-কাট কলম চালাতেও ওস্তাদ। লোকে আলাওলের কবিতা পড়ে অস্থির হয়ে শেষে তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে সোজা রাজসভার কবি বানিয়ে দিল। সেও মহানন্দে ঢাল-তলোয়ার ফেলে হুলস্থুল সব কবিতা লিখে শোরগোল বাঁধিয়ে দিতে থাকলো। আরাকানের সবুজ পাহাড়ে কান পাতলে এখনো হয়তো মধ্যযুগের সেরা কবি আলাওলের কবিতা শোনা যায়। ঘুরে আসা গেলে মন্দ হত না।

৭.

অনেকটা পথ এসে হাঁপ ধরে গেছে। পায়ের গোড়ালিও গোঙ্গাচ্ছে। সমতল একটা কালো কোরাল দেখে জিরাতে বসে পড়লাম সবাই। এ জায়গাটায় প্রচুর লোকের আনাগোনা। রীতিমত হই হুল্লোড় চলছে। কেয়া গাছ থেকে বাঁদর ঝোলা হয়ে ঝুলছে কয়েকজন। ফটো খেঁচাও চলছে দেদারসে। উৎসব উৎসব ভাব। এরই মাঝে হদিস মিলল বাপের ব্যাটাদের।

আট-দশজনের দল। তারা কোরালে বসে হাত-পা ছড়িয়ে প্যাকেটের পর প্যাকেট বিরানি খেয়ে প্লাস্টিকের বাক্সগুলো মিসাইলের মত তাক করে দশ দিগন্তে ছড়িয়ে দিল নিখুঁতভাবে। তারপর পাঁচ লিটারের গোটা তিনেক বোতল ঢকঢক করে গিলে সেগুলোকে ফুটবল বানিয়ে অদৃশ্য কোনো গোলপোস্ট বরাবর লাথি মেরে পাঠিয়ে দিল। বেচারাদের আকৃতি গোল না হয়ে সিলিন্ডার বলে কিছুদূর গড়িয়ে ব্রেক কষলো। এই অপমান দেখে ফিরে আসা জোয়ারের পানি তাদেরকে সাগরে টেনে নিতে ছুটে আসলো। একটা বোতল তো ভেসেও গেল চোখের সামনে দিয়ে। কিন্তু বাপ কা ব্যাটারা তখনো ব্যস্ত। যে ঝুড়িতে করে তারা তাদের আখেরি খানা-দানা নিয়ে এসেছিলো, সেটাকে একজন জুতো দিয়ে মাড়িয়ে মট্মট্ করে ভাঙ্গলো। তারপর পুরো ধ্বংসযজ্ঞের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি নিয়ে বাড়ির পথ ধরলো।

অবাক রেন আর আমি নিঃশব্দে তাদের পিছু নিলাম। ‘এই যে ভাই, শুনছেন?’ ভাই-বেরাদাররা আমাদের দুই পয়সার দাম না দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোতেই থাকলো। পিছু নেয়া বন্ধ করে তাদের পাশেই হাঁটছি এখন। ‘বোতল-বাক্সগুলি কি সাথে নেয়া যেত না ভাই।‘ এবার চরম বিরক্ত এক ভাই আকাশ থেকে পড়লো, ‘ময়লা সাথে নিবো ক্যান?’। তেড়ে মারতে আসছে না দেখে সাহস খুঁজে নরম সুরে বললাম, ‘দেশটা তো ভাই আপনারই। এই দ্বীপটাও আপনার। নিজের ঘরে কি ময়লা ফেলা যায়? না পারেন তো আমরা নিয়ে যাই। সাথে লোকজন আছে’। (কথাটা ভুল। সাথের লোকেরা সামনে এগিয়ে বিন্দু হয়ে গেছে।) তবে আমাদের ভাইকে বিচলিত দেখালো। সে ক্ষয়ক্ষতির পরিমানটায় চোখ বুলিয়ে ইতস্তত করে জবাব দিল ‘এ্যা…আচ্ছা, মানে আমরাই নিবো নে। আপনারা হাঁটেন’। বিকালের আলো কমে আসছে। আমরা আর দাঁড়ালাম না। বিশ্বাস করে নিতে চাইলাম, লোকগুলো সত্যি বলছে। আশাহত হই, এই ভয়ে পিছে তাকালাম না আর। 

আমাদের দলটা আবার সেই মৌসুমী হোটেল-কাম- চায়ের টংয়ে ফিরে এসেছি। সাথে করে পথে যত চটি, বোতল, ছিপি আর যা যা আবর্জনা পেয়েছি দুই হাত ভরে নিয়ে এসেছি। বিরাট ময়লার ঝুড়িতে সেগুলোকে সঁপে দিয়ে ছেলেমানুষি একটা আনন্দ পাচ্ছি। যদিও আনন্দ পাবার কারন শূন্য। খুব শিগগিরি এই অনিন্দ্যসুন্দর কোরাল দ্বীপ আবর্জনার স্তুপে ঢাকা পড়ে যাবে। এটাই বাস্তব।

যাহোক, হোসেন আলী চা চড়িয়েছে। চিনি দিতে মানা করার পরেও সে এক কৌটা কন্ডেন্সড মিল্কের পুরোটাই কেতলীতে গুলে দিয়েছে। তৈরি হচ্ছে স্যুইট ডেথ। আমরা বিনা আপত্তিতে হাসি মুখে চা নিলাম।

আজকে ষোলোই ডিসেম্বরে মৌসুমী হোটেলের সামনে পতাকা গেঁড়ে রাখা হয়েছে সযত্নে। সোনার থালার মত সূর্যটা পতাকার লাল-সবুজকে সাক্ষী রেখে আজকের মত ডুবে গেল কালকে আবার জাগবে বলে। সব কটা বাচ্চা-কাচ্চা সাথে আছে কিনা মাথা গুনে আমরাও ফিরে চললাম কালকে আরেক গন্তব্যে ছুটবো বলে।

৮.

ডিম-পরোটার উপরে এমনিতেই নাস্তা হয় না। সাথে আলু ভাজি থাকলে এই দুনিয়াবি নাস্তাই বেহেশতি চেহারা পায়। ঠেসে-ঠুসে খেয়ে দেয়ে মন আবেগে টইটুম্বুর। বাঙ্গালির মনের বাস তার পেটে। কে যেন কবে বলে গিয়েছিল। ষোল আনা সত্য কথা।

ফুরুফুরে মনে আবার বেরিয়ে পড়লাম। তবে তার আগে ছোট খাট একটা মেডিক্যাল ক্যাম্প বসে গেল। ভাইয়া আর আপু তাদের ডাক্তারি বিদ্যার জাদুবলে চাচার হাঁপানীর ওষুধ বদলে দিল। আড়াল থেকে আমাদের ভাল-মন্দ রেঁধে খাওয়ানো ইয়াসীরের মায়ের হাড়ের সমস্যার উপায় বাতলে দেয়া হল। আরো কতগুলো লোকজনও এসে দাঁড়িয়েছে। তাদেরও কিছু কিছু গতি করে ঝটিকা ক্যাম্পটা গুটিয়ে ফেললাম আমরা। আমার মায়ের আশা ছিল তার ছেলে বিধানচন্দ্র-টাইপ ধনন্তরি ডাক্তার হবে। বিধানচন্দ্র না হলেই বা কি। লোকগুলোর চোখ-মুখে কৃতজ্ঞতার ছাপের দামও তো কম না। বেড়াতে আসা শহুরে ডাক্তার আর তার ডাক্তার বউ তাদের যত্ন নিয়ে দেখেছে। তারা যারপর নাই খুশি। চাচা এগিয়ে এসে ভাইয়ার হাতে আলতো চাপ দিয়ে কথা আদায় করে নিল, আবার যেন আসি। গেস্টহাউসটা সামলে রাখা এই পরিবারের সবাই অনেকটা এগিয়ে এসে বিদায় দিল আমাদের। সরলতার আরেক নাম বোধহয় বাংলাদেশের মানুষ।

সাগরতীর ধরে না হেঁটে অনেকটা ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। বামে তরমুজের ক্ষেত আর ডানে ধান মাড়াই চলছে। মাঝে ক্ষেতের আল। তাতে ধূলা উড়িয়ে ছুটছে রন আর তাফসু মিয়া। যেন মাত্রই খাঁচা থেকে পালিয়েছে। এখন দৌড়ে জান নিয়ে পালতে পারলেই বাঁচোয়া। এক-আধটা মহা বিরক্ত ছাগল ঘাস চিবানো রেখে অনিচ্ছায় পথ ছেড়ে দিচ্ছে। ফেরারী আসামী ধরতে আমাদেরও পড়িমড়ি ছুটতে হচ্ছে। 

গাঁয়ের মেঠো পথে দৌড়ে আত্মহারা লাগছে। শিকড় খুঁজে পাবার আনন্দে আত্মহারা। হঠাৎ ছবির মত শান্ত একটা বিল দেখতে পেলাম। তার জলেও কোরাল উঁকি ঝুঁকি। ক্যানভাসে আঁকা নিঁখুত ছবির মত দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দী করে নিলাম সযত্নে। বিল ছাড়িয়ে আরো এগোতে দেখি কার যেন খড়ের গাদায় অলস গরু জাবর চিবাতে ব্যস্ত। তার ব্যস্ততায় হানা না দিয়ে কি ভেবে খড়ের গাদা দুই হাতে জাপটে ধরলাম। খড়ের মাঝে ধান-ধান ঘ্রান। চট করে ঘ্রানটা সেই যে মাথায় ঢুকে পড়ল, আর বেরোলো না।

 বিল পেরিয়ে, গরু ডিঙ্গিয়ে, কার উঠানের হাস-মুরগী তাড়িয়ে শেষতক এসে থামলাম তীরের কাছ ঘেঁষে। সৈকতটা লোকালয়ের খুব কাছে অথচ একেবারে জনমানবশূন্য। কিন্তু চেনা-জানা পৃথিবীর কোন কিছুর সাথে এ জায়গার তো মিল নেই। সাগর এখানে তার আপন মনে আছড়ে পড়ছে। কোরালের ভেসে থাকা শরীরের গাংচিলের জটলা। কেয়া গাছের সারিকে সাক্ষী মেনে বৈঠাবিহীন একটা একলা নৌকা নির্বিকার পড়ে আছে। ছুটে আসা ঢেউয়ের ফেনিল ফনায় তার কিছু আসে যায় না।

আমাদের বিস্ময় আর কাটে না। দুটো কৌতুহলী ছেলেমেয়ে পিছু পিছু এসেছে। এই সৈকত তাদের কাছে গাঁয়ের পেছনের পুকুরপাড়। এই দেখে লোকগুলো এমন বোবা হয়ে গেল কেন, তাদের ছোট মাথায় ব্যাপারটা খেলছে না। কাঁধের বোঝা আর পায়ের চপ্পল নৌকাটায় চাপিয়ে পান্নারঙ্গা ঢেউয়ে পা ভেজাতে নামলাম আমরা। নরম বালুতে নাম লিখে আবার জলের কালিতে মুছে দিয়ে হা হা হাসিতে নিস্তব্ধ সাগরতীর কাঁপিয়ে স্বাদ নিলাম অদ্ভূত ছেলেমানুষীর। বঙ্গোপ্সাগরের এই ছোট্ট বিন্দুর মত দ্বীপের ছোট্ট এই তীরে জগতের সমস্ত সৌন্দর্য্যের যে অর্ধেকটাই লুকানো আছে, সেই কথা আমরা ছাড়া আর কেউ জানলো না। স্থানীয়দের আদর করে দেয়া নাম তিলোত্তমা আসলেই এক তিলোত্তমা, স্বর্গের জলপরী। স্রষ্টা স্বর্গ থেকে অফুরান মনিমানিক্য ছড়িয়ে দিয়েছে এই বালুকাবেলায়।

৯.

তল্পিতল্পা গুটিয়ে আবার শুরু হল হন্টন। আমাদের ভ্রমনের দ্বিতীয় গেস্টহাউসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে খিদেয় সেদ্ধ হয়ে গেলাম। ক্লান্তিও ঝোঁপ বুঝে কোপ মারছে এই সুযোগে। ছাউনির নিচে সবাইকে বসিয়ে হাতে ডাব ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। ধাতস্থ হয়ে ঠিক করলাম, জোয়ার থাকতে থাকতেই আবার সাগরে যাবো। দেখা গেল এই গেস্ট হাউসের প্রস্তুতি বেশ ভাল। তাদের সংগ্রহে স্কুবা ডাইভিংয়ের সরঞ্জাম আছে। সেখান থেকে কয়েকটা আন্ডার-ওয়াটার গগলস্ নিয়ে খিরকির দরজা দিয়ে বেরিয়ে দেখি, আরে ঐ তো দূরে তিলোত্তমা দেখা যাচ্ছে।

কেয়ার কাঁটা আর কাঁধ সমান ঝোঁপ পেরিয়ে অনায়াসে পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম ওপাশে। জোয়ারের বড় বড় ঢেউ দেখে বাচ্চাদের নামতে দেয়া হল না। তাদেরকে আমার জিম্মায় দেয়া হয়েছে। সঙ্গে নিয়ে আসা খেলনা শাবল আর বালতি দিয়ে আগ্রহ নিয়ে বালুর দূর্গ বানাচ্ছি। কাছেই রুমিকে হাওয়া খেতে দেখা যাচ্ছে। পানিতে নামে নি সে। এই বেড়ানোর কোন কিছু নিয়ে তাকে ভাবতে হচ্ছে না। ভাইয়া-আপু তাকে মানিব্যাগও ছুঁতে দিচ্ছে না। সে ব্যাপারটাকে “ডিফল্ট” জামাই আদর ভেবে নিয়েছে রাশভারী মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখানে এসে সে খুশি হয়েছে নাকি বেজার, সেটা বোঝার উপায় নেই। দশজনের আনন্দের প্রকাশ যে এক রকম না, সেটা প্রমান করতে সে হঠাৎ বাঁই বাঁই করে এক দিকে দৌড়ানো শুরু করেছে। অথচ দৌড়ানো তার দু’চোখের বিষ। ডেকে লাভ হল না। সে মেঠো ইঁদুরের গতিতে দৌড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই চৌষট্টি হাজার বর্গমাইলের পুরোটাই তার। এর তীর ঘেঁষে সে একবার ঘুরে আসতে চায়।  

তাফসু মিয়া তার বালুর কেল্লা হেলায় ফেলে বাবার পিছু নিয়েছে। ভাইয়া-আপু আর রেন পানি ছেড়ে উঠে এসেছে এর মাঝে। রনকে মায়ের কাছে গছিয়ে আমিও বাবা-ছেলে বরাবর ছুটলাম। শন শন বাতাস কেটে দৌড়াচ্ছি। নাকি উড়ে যাচ্ছি? এত স্বাধীন কখনো লাগে নি।

দুইজনকে শেষ মেষ বাগে পেয়ে ফিরিয়ে এনে ছানাবড়া চোখে দেখি এদিকে আরেক কান্ড। রন-রেন দুই ভাইবোন মিলে ভাইয়াকে ভাস্কর্য বানিয়ে ফেলেছে। কাজটা ভেজা বালু চেপে চেপে নিখুঁতভাবে করা হয়েছে। গালে হাত নিরুপায় বসে থাকা ভাইয়াকে অগাস্ট রোনে রদ্যাঁ’র ‘দ্যা থিংকার’-এর মত লাগছে। এই বিখ্যাত ফরাসী ভাস্করের সাথে তার নামের মিল আছে। দুইজনের নাম রোনে। ফ্রান্সে জন্ম নেয়ায় ভাইয়ার নাম নিয়ে যথেচ্ছা কেরিক্যাচার করা হয়েছে। চার শব্দের নামের অর্ধেকই ফরাসী। বছর চল্লিশের আগে মায়ের পিএইচডি গাইড আর হাসপাতালের ডাক্তার কি ভেবে দারুন উৎসাহে নিজেদের নাম উপহার হিসেবে গছিয়ে দিয়েছিল। উপহারের ঢেঁকি গিলে তার নাম গিয়ে দাঁড়িয়েছে ‘রোনে সুজন ক্লোদ সরকার’। বেচারার জীবনটাই গেছে জনে জনে নামের ব্যাখ্যা দিয়ে।

গেস্টহাউসের ছাইনিতে বসে সবাই অল্প বিস্তর ঘামছে। ফর্সা হওয়ায় ঝুমু আপু আর রুমির গাল-কপাল আপাতত টকটকে লাল টমেটো। ভাইয়া আর আমি আগ্রহ নিয়ে তাই দেখছি। আমরা দুই বর্নবাদী ভাই-বোন খুঁজে খুঁজে ফর্সা লোক বের করেছি। খুব বড় দাও মারা গেছে। খাটিয়ে রাখা হ্যামকগুলোতে হাত-পা টান টান করতে করতে এক ধরনের আত্মপ্রসাদ নিয়ে ভাবছি আমরা। একটু পরেই অবশ্য বোঝা গেল কে আসলে দাও মেরেছে। আমাকে দেখা গেল এই দুদিনের আধোয়া কাপড় ধুয়ে চিপিয়ে চিপিয়ে গেস্টহাউসের তারে শুকাতে। ভাইয়াকেও লাগিয়ে দেয়া হয়েছে রনকে গোসল দেবার কাজে। ওদিকে ফর্সা দুজনকে হ্যামক দখল করে আধবোজা চোখে গেস্টহাউসের দারুন সাউন্ড সিস্টেমে নব্বইয়ের দশকের ইংরেজি গান শুনতে দেখা গেল। জর্জ মাইকেল আর পিঙ্ক ফ্লয়েড গানের ব্যাকগ্রাউন্ডে কাপড় নাড়তে অবশ্য অতটা খারাপ লাগলো না। আমার।

১০.

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। ঝুমু আপুর চাপাচাপিতে বাগানে কেটে রাখা কোর্টে বাডমিন্টন চলল খানিকক্ষন। তাকে দেখে এখন কে বলবে যে তার সারা দিন কাটে রোগীদের হাড়-গোড় কেটে বা জুড়ে দিয়ে। অর্থোপেডিক সার্জনের ভারী তকমাটা খুলে সে খোলা চুল উড়িয়ে ছোট্ট মেয়ের উচ্ছ্বাসে খেলছে। যার যার যাপিত জীবনের বোঝা আমরা ঢাকায় রেখে এসেছি। এখানে আর আনি নি। এদিকে, খেলাটা একদম না জানা রেন দশ মিনিটের মাথায় দুর্দান্ত চাপ মেরে আমাকে বসিয়ে দেবার যোগাড় করছে। এক কোনে তাফসু মিয়া আর রন খুব মনোযোগে দাবার ছক নিয়ে বসেছে। তাফসু মিয়া ইচ্ছেমত রাজা-মন্ত্রী উল্টে দিচ্ছে তো রন হাতি-ঘোড়া ছুটিয়ে রাজার ঘাড় মটকানোর তাল করছে। এমনতর দাবা খেলা দেখলে দাবার আসল রাণী, রাণী হামিদ বোধহয় হাত কামড়ে মরে যেত।

একটা দুইটা করে তারা ফুটতে শুরু করেছে সন্ধ্যা পেরোনো রাতের আকাশে। খেলাধূলা শিকেয় তুলে আমরা আকাশ দেখতে বেরোলাম। গোটা কয়েক তাকিয়ে পেতে দিয়েছে গেস্টহাউসের হাসিখুশি কেয়ারটেকার। তাতেই গ্যাঁট হয়ে শুয়ে আছি আকাশের দিকে মুখ করে। সেই মুখ আমাদের হা হয়ে গেল পর মুহূর্তেই। হীরার কুচি ছড়ানো এই চাঁদোয়া আবার আকাশ হয় কেমন করে?

রেন আর আমি এক সাথে আকাশ দেখছি। সে আমার ভক্ত। আমিও তার কড়া ভক্ত। এক রেখায় ভেসে থাকা বড় বড় তিনটা তারার দিকে তাক করে রেন দেখালো, ‘রিম, ঐ যে অরিয়ন’স বেল্ট’। কালপুরুষ ইত্যাদি তার মুখস্থ। তার দু’টা বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ। এক, মিশরীয় মমী আর দুই, গ্রহ-নক্ষত্র। আশেপাশে মিশরীয় কি দেশীয় মমী বা তাদের ভূত না থাকার কারনে সে তার আকাশবিজ্ঞানের জ্ঞান কপচানোর ধান্দায় আছে। আচমকাই কালপুরুষের হাতের বাঁকানো ধনুক থেকে একটা তীর ছুটে যেতে দেখলাম মনে হল। ইংলিশ মিডিয়ামের রেন আর বাংলা মিডিয়ামের আমি প্রায় এক সাথে ‘শ্যুটিং স্টার’ আর ‘তারা খসা’ বলে চেঁচিয়ে উঠলাম। আরো কতগুলো তারা খসিয়ে বিশাল এক চাঁদ উঠেছে। আগের দিনে উত্তম-সুচিত্রার সিনেমায় বোম্বে থেকে বিশাল গোল লাইট এনে কায়দা করে ঝুলিয়ে চাঁদ বানানো হত। এই চাঁদকে দেখে মনে হচ্ছে তাকেও হালের মুম্বাই থেকে আনানো হয়েছে। তারা খসাদের ‘শ্যুটিং’ শেষ হয়ে গেলে বাতি নিভিয়ে সরিয়ে নেয়া হবে।

১১.

এই দুই দিনে কোরাল দ্বীপের সৌন্দর্য্য খেয়ে মন ভরেছে আর পেট ভরেছে সাগরের দারুন স্বাদের মাছ, কাঁকড়া আর লবস্টার খেয়ে। মন-পেট পুরে তৃপ্তি নিয়ে আজকে ফেরত যাচ্ছে আমাদের দলটা। আবারো সেই স্পিডবোট। আবারো আগুনরঙ্গা লাইফ জ্যাকেট। পার্থক্য একটাই। সাগর মারাত্মক উত্তাল। ঝাঁকি খেয়ে আমাদের অবস্থা হল কাঁচের জার থেকে ছলকে পালানো মাছের মতন। একেবারে ফিশ আউট অব ওয়াটার। এই বুঝি স্পিডবোট চার টুকরা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আর আমরা ভাঙ্গা পাটাতন আঁকড়ে ভাসতে থাকি। এর ভেতরে রন আর তাফসু হো হো করে হাসছে। তাদের ‘ন ডরাই’ ভাবভঙ্গিতে সাহস খোঁজার চেষ্টা করছি। কারন, ভয়ে একেকজনের কিডনী গলে যাবার মত অবস্থা।

নাফ নদীতে এসে হাঁফ ছাড়া গেল অবশেষে। স্পিডবোটটা স্পিড কমিয়ে মামুলি বোট বনে গেছে। কাছেই সাদা বকের মেলা বসেছে জেগে ওঠা ছোট ছোট চরে। দেখলাম আকারে বড় এক বককে ঘিরে সভা বসিয়ে দিয়েছে তারা। হুমদো বড় বকটা ভাষন দিচ্ছে, ‘ভাইয়েরা আমার, এলাকার এক বিশিষ্ট বক ধার্মিক আমি। আপনাদের দোয়ায় এবার পালক মার্কায় দাঁড়িয়েছি। আমার চরিত্র পালকের মতই সফেদ। ভোটটা আমাকে দিতেই হবে-এইটা কিন্তু ছোট ভাইয়ের আবদার,… ইত্যাদি।‘ সভার সামান্য তফাতে বুড়ো এক মদনটাক খুব উদাস মুখে কি যেন চিবোচ্ছে। কত সাদা-কালো পালক এল-গেল। সব তার দেখা আছে। দুটো গাংচিল এসে টাকে ঠোকর দিয়ে গেলেও তার কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। মদনটাক ভাইকে আমাদের খুব ভাল লেগে গেল।

ঘাটে নেমে দূরে দৃষ্টি ছুড়ে দিলাম। যদি কোরাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন্সকে আবার দেখা যায়। কিন্তু দেখা গেল না। ঢেউয়ের আড়ালে মিলিয়ে গেছে। মিলিয়ে গেলেও কোরাল দ্বীপের হীরা-পান্না আমাদের স্মৃতির কুঠুরিতে চোখ ধাঁধাঁনো এক গুপ্তধন হয়ে থাকবে বহুদিন। (সমাপ্ত)

-রিম সাবরিনা জাহান সরকার

 মিউনিখ, জার্মানি

mm

By Rim Sabrina Jahan Sarker

A biologist. My PhD was on chronic lung disease and now doing a postdoc on image analysis on cancer tissues. I enjoy creative writing and running.

2 thoughts on “কোরাল দ্বীপের হীরা-পান্না”
  1. ওদিকে সাত বছরের বড় ভাইয়ের বেলায় আদব-কেতার ব্যাপারগুলো কেন যেন ঠিক মনে আসে না- in this line first I thought your elder brother is of 7 years old. After reading second time, I got it.

Leave a Reply