আজ একটা কঠিন কষ্টের দিন পার করলাম। ১৫ ঘণ্টা না খেয়ে বসে আছি মাটির নিচে ট্রেন স্টেশনে। আমি এখানে বন্দী হয়ে আছি। মুক্ত করার কেউ নেই। আজ আমি এ বছরের সব চেয়ে বেশি কষ্ট করেছি। আজ কাজ থেকে না খেয়ে বেরিয়েছি শুধু ট্রেন ধরার জন্য। আজ অনেক কাজ ছিল তাই খেতে পারি নাই। এসে দেখি ট্রেন ১০ মিনিট লেট। যাইহোক আমার শহরে এসে দেখি ২ মিনিট আগে আমার নাইট বাস চলে গেছে।

কী আর করার, বাইরে অনেক ঠাণ্ডা তাইই ভাবলাম মাটির নিচে ট্রেন স্টেশনে গিয়ে বসে থাকি। মাঝে মাঝে ২,১ টা ট্রেন আসছে চলে যাচ্ছে। আমার পরের বাস আসবে ১ :৪৫ মিনিটে। এখনো ৫০ মি. বাকি আছে। তাই বসে আমার সোনার বাংলা জাতীয় সংগীত শুনছি মোবাইলে। বাসের সময় হল আমি উপরে উঠে দেখি গেট বন্ধ। কি আর করার, অনেকে ভাবতে পারেন এটা আমার ভুল। কিন্তু এটা আমার ভুল না, এটা সিকিউরিটিদের ভুল।

আমি আমার জার্মান ৩ বছর লাইফ এ বেশির ভাগ সময়ই বার্লিন এ কাটিয়েছি। আজ শনিবার, ছুটির দিন। পুরা জার্মানিতে সপ্তাহে ছুটির ২দিন ২৪ ঘণ্টা বাস ট্রেন চলে। আমি এখন ডুইসবুরগে থাকি। পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম ৩ মাস আগে। তবে গত মাসে আমি পাশের সিটিতে ছিলাম। আমি প্রতি সেমিস্টারে শুধু পরীক্ষা দিতে আমি এখানে আসি। তবে এখানে আমি গত বছর ২০১৪ তেও ছিলাম। কিন্তু এই রকম কথা জানতাম না। গেট বন্ধ করার আগে ভাল করে চেক করার নিয়ম আছে। যেন একটা মাছিও থাকতে না পারে। তা না হলে ঠাণ্ডা দেশে সবাই নিচে গিয়ে বসে থাকত। বার্লিন এ এইভাবে চেক করে।

অনেক ক্ষুধা লেগেছে। পিপাসা লেগেছে, কি যে করি কাছে মাত্র ২ ইউরো আছে। ব্যাংক কার্ড আছে। তবে কাজে লাগবে না এখন। অটো মেশিন থেকে একটা চিপস কিনলাম। এখন ড্রিঙ্ক এর টাকা নাই। মাথাই একটা বুদ্ধি এলো বসে না থেকে কিছু আয় করি। আমি ফান্ড ওয়ালা বোতল খুঁজা শুরু করলাম। কিছু প্লাস্টিক বোতল আছে যে গুলোর দাম ২৫ সেন্ট। এটা মেইন স্টেশন, তাই মাটির নিচে হলেও অনেক বড়। কমপক্ষে ৫০ টা ডাস্টবিন আছে। আমি চেক করতে শুরু করলাম। আমার জীবনে প্রথম তাই কেমন যেন লাগছিল। অনেক বোতল কাঁচের আছে যার দাম ৮ সেন্ট। কিন্তু আমার নেওয়ার মত শক্তি/সামর্থ্য নাই, তাই নিলাম না। কেউ একজন বাইরে কোকাকোলার বোতল রেখে গেছে আমি পান করলাম। তবে বোতলটা ফান্ড ছিল না। ফেলে দিলাম। ৪ টা ফান্ড ওয়ালা বোতল পেলাম। ১ ইউরো আয় হল।

জার্মানির প্রচুর লোক কাজের ফাঁকে বোতল কুড়ায়। আমি কোনদিনও ভাবি নাই যে আমি বোতল কুড়বো। আমারা বাঙালি তাই বেশি সম্মানবোধ। জার্মানির প্রায় অধিকাংশ বাঙালি যারা পার্মানেন্ট অথবা রিফুজি, তারা “সোশ্যাল” খায়। আমরা যারা লিগ্যাল কাজ করি, তারা সরকারকে ট্যাক্স দেই। জার্মানির প্রায় সবাই ট্যাক্স দেয়। অথচ যারা “সোশ্যাল” খায়, তারা কেউ বোতল কুড়ায় না। তারা চুরি করে কাজ করে, বাসা ভাড়াও পায়, ইনস্যুরেন্স ফ্রি, যত ছেলে মেয়ে তত টাকা। তাদের সব ফ্রি। এরা এই দেশে যাকাত খায়। আর বাংলাদেশে যাকাত দেয়।

অনেক ভাল লাগছে, কষ্টের সময় প্রায় শেষ। এখন আমার ট্রেন আসবে। ৪:০৮ মি. আমার ট্রেন, অনেক কথা বললাম। আমরা ছাত্ররা এখানে অনেক কষ্ট করি। তার পরেও আমরা অনেক ভাল আছি কারণ এখানে ছাত্ররা সৎ জীবন যাপন করে। অনেক লিখলাম আজ আর না। সবাই ভাল থাকেন।

পিলাপ মল্লিক

MSC in Electrical & Electronic Engineering
University of DE, Germany