সেদিন হঠাৎ আমার চার বছরের পুরনো ফিলিং দাঁত থেকে টপাস করে খুলে পড়ে গেলো। ফ্লস করার সময়। আমিতো বেকুব হয়ে গেলাম। শুনছি এখানে নাকি ডেন্টিস্ট এর কাছে গেলেই কোন কথা না বলে কোদাল দিয়ে দাঁত তুলে ফেলে দেয়। ইনস্যুরেন্স এর কভারেজ নাই। সব খরচ নিজের। দেশে আমার পরিচিত ডেন্টিস্ট, চা পুরি খাইতে খাইতে দাঁতের ট্রিটমেন্ট করে দেয়। আপনা আপনা! মনে হচ্ছিলো শুধু দাঁতের জন্যই ধার করে দেশে চলে যাই।

ঝামেলা যখন আসে, দিবানিশি বাসের যাত্রীর লাইনের মতোই আসে। এখানে ইংলিশ স্পিকিং ডক্টর খুব কম আছে। ইউনিভার্সিটি থেকে একটা লিস্ট দেয়, কিন্তু ঐ লিস্ট এ ডেন্টিস্ট নাই। নিজে গুগল করার চেষ্টা করলাম, কিওয়ার্ড ট্রান্সলেট করলাম। পেলামনা। খুব কষ্টে এক সপ্তাহ পার করে জার্মান বন্ধুকে বললাম, একটা ডেন্টিস্ট খুঁজে দাও যিনি কিনা ইংলিশ এ কথা বলবে।

যথারীতি শুরু হয়ে গেলো,

– “এখনো জার্মান শিখস্নাই, লজ্জা করেনা, তোরে হেল্প করুম ক্যারে, দুরে গিয়া মর” টাইপের অভিশাপ।
আমি বললাম
– “এতদিন যে ধুমায় নিজের ইংলিশটা আমার সাথে প্র্যাকটিস করলি, ঐটা কি?”
– “যা ব্যাটা, তোর যা উচ্চারণ, আর আধাখেঁচড়া গ্রামার, আমার ইংলিশ আরো খারাপ হইসে”
– “তোর জার্মান উচ্চারণে আমার ইংলিশ যা ছিল তাও ধ্বংস। আর এতো গুলা নতুন ওয়ার্ড শিখলি, সব আজাইরা?”
– ” আরে যা যা, এইগুলা এমনিতেই শিখা যাইত”

সকাল বেলা বন্ধুর টেক্সট, ডক্টর এর ঠিকানা। ইংলিশ এ কথা বলে, কিন্তু রিসেপশনিস্ট জার্মান ছাড়া কথা বলেননা। আমি কয়েকটা লাইন ইংলিশ এ লিখে গুগল ট্রান্সলেটরে ফেলে দুরু দুরু বুকে চেম্বারে যাওয়ার আগেই দেখি বন্ধু হাজির। পুতুলের মতো একপাশে দাড়ায় আছি, ঝড়ের বেগে আধা ঘণ্টা জার্মানে ওরা মারামারি করার পর বুঝলাম, মে মাস পর্যন্ত ডক্টর এর কোন খালি শিডিউল নাই। শুনেই নগদে দাঁতটা আবার চিনচিন করে উঠলো। শুকনা মুখে উঠে যাবো, হঠাৎ ডক্টর বলল, ” আসো মনু তোমার কি সমস্যা একটু দেখি”

আমি নগদে আমার পুরনো রেডিমেড ভাষণ দেয়া শুরু করলাম, ” আমি ভীষণ দুঃখিত এই যে, তোমার দেশে আসিয়া আমি আজো জার্মান ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে পারিনা, আমি ভয়াবহ চেষ্টা করিতেসি, কিন্তু দেখো তোমার ভাষা এতো কঠিন যে আমার দাঁত এর ফিলিং খুলে পড়ে গেছে, আমি বহু কষ্টে এ১১ পাশ করসি, একটা দাঁত গেছে। কোনমতে বাকি দাঁত গুলা নিয়ে দেশে ফিরতে চাই। দয়া করিয়া যদি এবং এবং এবং অতঃপর…”
ডক্টর বললেন

– ” থামো থামো। তুমি জার্মানি তে জার্মান ছাড়া একবছর পার করলা ক্যামনে? পরীক্ষায় পাস করো ক্যামনে? এতো কথা বল ক্যামনে?”

– ” এ হরি। আমার পড়াশোনা তো সব ইংলিশে। আমার বন্ধু বান্ধব সব ইংলিশে ভাব সম্প্রসারণ করে, প্রফেসররা ট্যাংক এর মতো ইংরেজি বলে, মেয়েরা ইংরেজিতে শিষ দেয়”

ডক্টরের মুখ এমন হা হইলো যে আমি তার কয়েকটা মাড়ির রক মেটাল দাঁত ও দেখতে পেলাম! রেগেমেগে টকটকে লাল হয়ে বললেন,

– ” জার্মানিতে ইংরেজি পড়ায়?? হাহ! মজা নাও? ফাইজলামি করো!!”

এইবার আমি হা !!

হা করা মুখ দিয়ে ফিলিং খুলে যাওয়া দাঁত দেখতে পেয়ে ডক্টর বলল, আসো তোমার দাঁতের ফিলিং ফিরায় আনি। শিডিউলের গুষ্টি কিলাই।
অপরূপ সুন্দরি নার্স কে ইশারা করলো, মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ। দাঁত তো দাঁত, পুরা মুখের ফিলিংস ই হারায় গেলো। সেই ফিলিংস এখনো ফিরে পাইনাই। মুখে হাত বুলাইলে মনে হয়, অচেনা মানুষ। যাই হোক, মুখে ফিলিংস নাই, তাই পুর ব্যাপারটাই টাইপ করে ফেল্লাম আর কি।

ফেরার সময় সেই সুন্দরি নার্স অপরূপ মুচকি হাঁসি দিয়ে বললো, ” আমি কিন্তু অল্প অল্প ইংরেজি পারি।” অর্ধেক অবশ ঠোঁট এর ফাঁক দিয়ে গডফাদার স্টাইলে একটা কোনমতে হাঁসি দিয়ে বললাম, ” ইশ আউখ ”

সারাংশ, জার্মান না জানলে এভাবে ২মাস পরের শিডিউল এক দিনে নিয়ে নেয়া যায়। (এই টিপস নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করবেন)