২০১৫ এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হঠাৎ একদিন কাফি ফোন দিল, না না ভুল বললাম, কাফি ভাই ফোন দিলেন। জানতে চাইলেন পোর্তুগাল যেতে চাই কিনা, সঙ্গে যোগ করলেন লিসবনে ওনার মামার বাসা, ফলে থাকা/খাওয়া নিয়ে কোন টেনশন নেই। বললাম দেখি চিন্তা করে একটু, আগামীকাল জানাব। এটা বলার পেছনে মূল কারণ আগের দশ বছর দেওয়া ছোট/বড় সব ট্যূরে ব্রেমেনে থাকা বন্ধু হাসনাইন সঙ্গে ছিল, তাই ওকে রেখে যেতে মন সায় দিচ্ছিল না আবার যেহেতু ওনার মামার বাসায় থাকা হবে তাই কাফি ভাইকেও ওকে নেয়ার ব্যাপারে কিছু বলতে পারছিলাম না। এখানে বলে নেই কাফি ভাই এর সঙ্গে আমার পরিচয় জার্মান এমব্যাসি এর গেঁটে, ভিসা ইন্টারভিউ এর দিন সকাল বেলায়, দুজনেই অপেক্ষা করছিলাম ভেতরে ঢোকবার জন্যে। ঐ সময় থেকেই একটু একটু করে বেশ ভালো সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল, তবে সম্পর্কের মধ্যে একটা ফর্মাল ব্যাপার থেকেই গিয়েছিল। যাই হোক পরদিন সকালে হাসনাইনকে ফোন দিয়ে বললাম এই এই ব্যাপার, এখন আমি কি করব? ও জানাল, “ব্যাপার না, যা তু্‌ই, আর আমি যেহেতু দেশে যাচ্ছি কিছুদিন পর সো তোর সঙ্গে কাটাকাটি হয়ে যাবে”। এরপরেও কিছুটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম, তার মধ্যেই আবার কাফি ভাই এই ফোন, তখন আর না করতে পারলাম না। এরপরদিন কাফি ভাই জানালেন আমাদের সঙ্গে আরো এক ভাই যাবেন, তখন মন কিছুটা খারাপ হয়ে গেল এই ভেবে যে আরেকজন যেতে পারবে আগে জানলে ওনাকে হাসনাইনের কথা বলতে পারতাম। ফেসবুকে পোর্তুগাল ট্রিপ নামে তিনজনের একটা গ্রুপ কনভার্সেশন তৈরি করা হল। শুরু করে দিলাম আমাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা। আমি প্রস্তাব করলাম লিসবনে তো মামার বাসাতেই থাকা হচ্ছে তাই সেখানে দুই/তিনদিন থেকে আরো দুই তিনদিন অন্য কোন শহর থেকেও ঘুরে আসি। কাফি ভাইও রাজি হয়ে গেলেন, তাই নেটে খোজা শুরু করলাম আর কোথায় যাওয়া যায়। স্প্যানিশ বন্ধু মিরেইয়্যা এর বাসা স্পেনের স্যাভ্যাইয়া, পর্তূগালের পাশেই এবং ঐসময় ক্রিসমাসের ছুটিতে ও বাসায় গেছে, তাই ওকেও ম্যাসেজ পাঠালাম। ও জানাল ওরা যখন পোর্তুগাল গেছে তখন ওরা দুই বোনই ছোটো, ওদের তেমন মনে নেই। তবে ওদের বাবা-মা প্রায়ই যান, ওনারা রাতে ফিরলে ও কথা বলে আমাকে জানাবে। সারাদিন নেটে খুঁজে আমাদের টাইম এবং বাজেটের সঙ্গে মিল পেলাম পোর্তো, রাতে মিরেইয়্যাও ওর বাবার সঙ্গে কথা বলে আমাকে পোর্তো সাজেস্ট করল, তাই ঠিক করলাম পোর্তো তেই যাব। একটু আগেভাগে টিকিট করলে বা হোস্টেল বুক করলে যেহেতু অনেক কম খরচে কাজ গুলো সারা যায় তাই হামবুর্গ থেকে লিসবনের এয়ার টিকিট আর পোর্তো তে আমাদের হোস্টেল বুক করলেন কাফি ভাই। ওদিকে লিসবন থেকে পোর্তো এবং পোর্তো থেকে হামবুর্গ এয়ার টিকিট করে ফেললাম আমি। তবে পরদিন সকালেই বিনা মেঘে বজ্রপাত, আমাদের সঙ্গের ভাই জানালেন ব্যক্তিগত কারণে উনি যেতে পারবেন না। অবশ্য বজ্রপাতের সঙ্গে বৃষ্টি এর প্রশান্তিও পেলাম, কারণ ওনার জায়গায় সেক্ষেত্রে হাসনাইনকে ঢোকানো যাবে। প্রস্তাব করলাম কাফি ভাই এর কাছে, উনিও রাজি হয়ে গেলেন। হাসনাইনকে ঢোকানো হলো গ্রুপ কনভার্সেশনে, ও জানিয়ে দিল ও মোটামুটি নিশ্চিত ও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে তবে ওর একটা এক্সাম ডেট এখনো ফাইনাল হয়নি, সেটা জানা যাবে মঙ্গলবার প্রফেসরের সঙ্গে কথা বলে। সেদিন ছিল শুক্রবার তাই কিছুক্ষণ পরে ধৈর্য হারিয়ে ও প্রফেসরকে টেক্সট ম্যাসেজ পাঠিয়ে দেয়। তার উত্তর ছিল উনি নিজেও জানেন না, হাসনাইন যেন সোমবার এক্সাম অফিসে গিয়ে খোঁজ নেয়। এদিকে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে ক্রমাগত চলছিল আমাদের খুদে বার্তার আদান প্রদান, আমরা তিনমাস পরের ট্রিপের উত্তেজনা অনুভব করছিলাম তখন থেকেই। ওখানেই হাসনাইন প্রস্তাব করল “ভাই-আপনি” বললে সম্পর্কের মধ্যে একটা ফর্মাল ব্যাপার চলে আসে, তাই আমরা এটাকে বাদ দিতে পারি কিনা? ফলে এক মিনিটের মধ্যেই কাফি ভাই- আপনি থেকে হয়ে গেলে কাফি-তুই, সেই সঙ্গে যুক্ত হল বান্দর/হারামিসহ নানাবিধ উপাধি। কেউ দেখলে বলতে পারবেনা কিছুক্ষণ আগে আমাদের সম্বোধন কি ছিল। বেশ উত্তেজনায় দুইদিন কাটবার পরে এল দ্বিতীয় আঘাত, সোমবার হাসনাইন জানাল ওর এক্সাম আমাদের ফেরার দিনের একদিন আগে, কি আর করার মেনে নিলাম। তবে কিছুদিন পরেই কাফি জানাল আমাদের ট্রীপের তৃতীয় সদস্য হিসাবে কনফার্ম করেছে শাকিল ভাই। ভিসা ইন্টারভিউ এর আগে বিসাগ থেকে একবার নক দিয়েছিলেন উনি, সে পর্যন্তই ওনার সঙ্গে পরিচয়। নতুন একটা কনভার্সেশন ওপেন করে সেখানে চলত লাগল আলোচনা কার কি পছন্দ/অপছন্দ সেটা নিয়ে। আমার এক্স্যাম ছিল ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি পর্যন্ত, তাই ভেবেছিলাম ট্রিপ আইটেনারী এরপরে করব। তবে এক্স্যামের পর একটু বিশ্রাম নিতে নিতেই কিছু কাজের চাপ পরে গেল, ফলে আইটেনারি করার তেমন সুযোগ পাচ্ছিলাম না। এদিকে আমরা লিসবনে ফ্লাই করব হামবুর্গ থেকে, আর আমার বাসের টিকিট ফ্লাইট ডেটের একদিন আগে। বিসাগে পোস্ট করলাম একরাত থাকার জায়গা পাবার আশায়, রাশেদ ভাই কয়েকজনকে ট্যাগও করলেন, কিন্তু ঐ মুহূর্তে হামবুর্গে থাকবেন না কেউ। কাউচ সার্ফিঙে কয়েকজনকে কাউচ রিকুউএস্টস্ট পাঠালাম, যারা রিপ্লাই দিল তাদের মধ্য কেউ আশা জাগার মত কিছু জানাল না। তবে আগের দিন না করা ম্যাথিয়াস নামের জার্মান একটা ছেলে জানাল ওর আগের সার্ফার আসবে না, তাই আমি যদি চাই ওর বাসায় উঠতে পারি। খুশি মনে রাজি হয়ে গেলাম। দেখতে দেখতে ভ্রমণের দিন প্রায় চলে এল, দুই দিন নিয়ে লিসবনের আইটেনারী করে ফেললাম, তবে পোর্তো এরটা করার আর সময় পেলাম না। সিদ্ধান্ত নিলাম মামার বাসায় থাকার সময় ওটা করে ফেলব। ২৮শে ফেব্রুয়ারী ভোরে রওয়ানা হয়ে গেলাম হাম্বুর্গের উদ্দেশ্যে। মাঝে হ্যানোফার হপ্টবাহানফে তিন ঘন্টার যাত্রা বিরতি। হাসনাইন জানিয়ে দিল ও চলে আসবে ওখানে, কাফিকেও বললাম চলে আসতে। ওখানে পোঁছালাম বিকেলের দিকে, বাস থেকে নামতে গিয়েই দেখি দুই বান্দা হাজির। এরপরে কাফি এর নেতৃত্বে আশপাশের দর্শনীয় কিছু জায়গা ঘুরে দেখে ঘণ্টা দুই পরে আবার ফিরে গেলাম হ্যানোফার হপ্টবাহানফ। সেখানে গিয়ে দেখি বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলায় জিতে গ্যাছে তাই পতাকা নিয়ে কিছু ছবি তুলে ফেললাম বিজয় উদযাপনের জন্যে। এই করতে করতে আমার পরের বাসের সময় হয়ে গেল। ওদের থেকে সাময়িক বিদায় নিয়ে উঠে পরলাম হাম্বুর্গের বাসে। হাম্বুর্গ হপ্টবাহানফ পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ৯টা। এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট রাতের খাবার খেয়ে পা বাড়ালাম ম্যাথিয়াসের দেয়া ঠিকানার উদ্দেশ্যে। ম্যাথিয়াসের বাসায় যখন পোঁছালাম রাত তখন প্রায় ১০ঃ৩০।

একরাতের কাইচ হোস্ট ম্যাথিয়াসের সঙ্গে

গিয়ে দেখি আমার অপেক্ষায় বসে আছে। ফ্রেশ হয়ে ওর সঙ্গে গল্প করতে বসলাম। অল্প সময়েই ওকে ভালো লেগে গেল ওর আলাপী স্বভাবের জন্যে। আমার নেওয়া ওয়াইন আর ওর কেটে আনা ফলের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে আড্ডা চলল রাত ১২টা পর্যন্ত। এরপরে আমার জন্যে কাউচ গুছিয়ে দিয়ে ও ওর নিজের রুমে চলে গেল। এক ঘুমে রাত পার, ৮টা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে গেলাম। একসঙ্গে নাস্তা করে একসঙ্গে দুজনে বাসা থেকে বের হলাম ট্রাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। ওর থেকে বিদায় নিয়ে আমি হপ্টবাহানফে নেমে গেলাম আর ও চলে গেল ওর অফিসে। আমার ফ্লাইট যেহেতু রাতে তাই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবার পরেই ব্রেমেন থেকে হাসনাইন চলে আসল সারাদিন আমার সঙ্গে কাটাবার জন্যে। ও জানাল কাছেই একটা দোকানে বাংলাদেশি মাছ পাওয়া যায়। আমার এখানে যেহেতু বাংলাদেশি সুতাটা পর্যন্ত পাওয়া যায় না তাও ওর লেজ ধরে চললাম দোকান পরিদর্শনে। গিয়ে অনেকদিনবাদে রুই মাছ, চাপিলা মাছ দেখে আমার তো মাথা খারাপ। ফেরার সময় আমি যেহেতু ব্রেমেন ঘুরে যাব তাই দুটোই এক প্যাকেট করে কিনে হাসনাইন এর কাছে দিয়ে দিলাম। তবে তখনও অবশ্য জানতাম না আমার জন্যে কি অপেক্ষা করছে লিসবনে। যাইহোক, দোকান থেকে বের হয়ে আশেপাশে ঘুরতে বের হলাম। ইচ্ছা ছিল নদীর পাড়ের দিকে গিয়ে কিছু সময় কাটাবার, তবে বাতাস আর সেই সঙ্গে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার জন্যে বাইরে থাকা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। ফলে কিছুক্ষণ শপিংমলে ঘুরে আগালাম হাম্বুর্গ সেন্ট্রাল লাইব্রেরির দিকে। সেন্ট্রাল লাইব্রেরির বাইরে বসে হাসনাইনের সঙ্গে নেওয়া ভাত আর ডিম-ছোলার ডাল দিয়ে দুইজন দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম। ঝটপট খেয়ে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকলাম উষ্ণতার সন্ধানে। গল্প করে আর ম্যাগাজিন পরে দুই ঘণ্টা সময় কাঁটিয়ে দিলাম ওখানেই। এরমধ্যে কাফি ফোন দিল ওরা প্রায় পৌঁছে গেছে, আমি যেন হপ্টবাহানফে চলে যাই। লাইব্রেরির চ্যাপটার গুছিয়ে আমি আর হাসনাইন চলে গেলাম হপ্টবাহানফে। ওখানে গিয়ে ঠিকভাবে পরিচয় হল শাকিল ভাইয়ের সাথে। কাফিরা আসার পরে হাসনাইন বিদায় নিয়ে চলে গেল ব্রেমেনে আর টিকিট কেটে আমরা খুঁজতে শুরু করলাম এয়ারপোর্ট যাবার প্ল্যাটফর্ম। আনুমানিক ৪৫ মিনিট পরে কোন ঝামেলা ছাড়াই পৌঁছে গেলাম হাম্বুর্গ ফ্লুগাফেনে। পৌঁছেই রাইয়ান এয়ারের সব ফর্মালিটি শেষ করে সিকিউরিটি চেকিং পার হয়ে চলে গেলাম ওয়েটিং লাউঞ্জে। ইতমধ্যে আমাদের রক্তে অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল তাই সবাই ট্যূরের উত্তেজনাটা বেশ ভালভাবেই উপভোগ করছিলাম। ননস্টপ কথা চলছিলি প্লেন আসার আগ পর্যন্ত। এর মধ্যে কাফিকে ম্যানেজার বানিয়ে ওর কাছে তিনজনের টাকাই দিয়ে দেওয়া হল। প্লেনে আমার আর কাফির সিট এক জায়গায় আর শাকিল ভাইয়ের আরেক জায়গায়। উঠে দেখি আমাদের রো তে জানালার পাশে এক সুন্দরী চৈনিক কন্যা বসে রয়েছে, মাঝের সিটটা যেহেতু আমার তাই কাফির সিট এক্সচেঞ্জের অনুরোধ উপেক্ষা করে আমার নির্ধারিত সিটে বসে পরলাম। কিন্তু কথা আর বলবি কি, অ্যাভিওফোভিয়াতে আক্রান্ত কন্যা প্লেন ট্যাক্সিয়িং এর সময় থেকে সেই যে চোখ বন্ধ করল এক ঘুম দিয়ে সেই চোখ খুলল প্লেন ল্যান্ড করার পরে, ইতিমধ্যে যদিও ৫ ঘন্টার ওপর পার হয়ে গেছে। পর্তুগালের মাটিতে পা দিয়ে শাকিল ভাই প্রস্তাব করলেন তার সঙ্গেও ভাই/ভাই ব্যাপারটা বাদ দেয়া যায় কিনা। আমি জানালাম আমার আপত্তি নেই তবে যাদের নাম শাকিল আমি তাদেরকে শাকিল্যা ডাকি। যেহেতু তাতে তার আপত্তি নেই তাই শাকিল ভাই হয়ে গেল শাকিল্যা। আমাদের বাঙালি ঐতিহ্য খালি হাতে কোথাও না যাওয়া, তাই কাফিকে বলা হল ফান্ড থেকে যেন বাসার জন্যে কিছু নেয়, খুঁজে ও মামাত বোনের জন্যে ওর প্রিয় চকলেট নিল। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে মামার বলে দেওয়া ওনাদের বাসার কাছের এক শপিং মল সেন্ত্র কমার্শিয়াল মাউরারিয়ার এর উদ্দেশ্যে ট্যাক্সি নিলাম। ট্যাক্সি থেকে নামার আগেই দেখি মেজ মামা দরজার সামনে, আর এসেই শুরু করে দিলেন মামাগিরী, কাফি এর অনুরোধ উপেক্ষা করে জোড় করে ট্যাক্সি এর ভাড়া দিয়ে দিলেন। ওখান থেকে মামার সঙ্গে একটু হেটেই পৌঁছে গেলাম মামাদের বাসায়, বাসায় গিয়ে পরিচয় হল বড় মামা আর ছোট মামার সঙ্গে। এরপরে আমাদের কে নিয়ে যাওয়া হল আমাদের জন্যে গুছিয়ে রাখা রুমে, একটা ডাবল খাট আর একটা টেম্পোরারি সিঙ্গেল খাট নিয়ে বিশাল এক রুম। চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসলাম, খাবারের আইটেম দেখে চোখ মাথায় না একদম সাত আসমানে উঠল। সাদা ভাতের সঙ্গে দেশী কাজলি মাছ চচ্চড়ি, দেশী রুই মাছের ঝোল, শাক, গরুর মাংস, মুরগির মাংস, ডাল, কোনটা রেখে কোনটা খাব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। এর ওপর আমার জন্যে আরও বড় পাওয়া মামিদের বাড়ি গোপালগঞ্জ, আমার যেহেতু ফরিদপুর তাই রান্নার স্টাইল এক। ফলে অনেকদিন বাদে দেশী খাবার দেশী স্বাদ উপভোগ করলাম গলা পর্যন্ত গিলে। খাওয়দাওয়ার পর কিছুক্ষণ গল্প হল তবে রাত প্রায় ২টা বেজে যাওয়ায় বেশিক্ষণ গল্প না করে ঘুমতে চলে গেলাম। ঘুমতে যাবার আগে কাফিকে বললাম আগামীকাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আমরা বের হয়ে পড়ব, নাস্তা করব বাইরে, তাতে মামিদের ওপর অত্যাচারটা কিছুটা কমবে আর আমরা সময়ও বেশি পাবো। প্ল্যান ছিল বের হয়ে ওয়্যাকিং ট্রিপে অংশগ্রহণ করার। আমি আর শাকিল ঘুম থেকে উঠে পরলেও কাফিকে ওঠাতে বেশ বেগ পেত হলে, এর পর তার রেডি হওয়ার ঢিলামিতে সেই দেরিই হয়ে গেল। এদিকে মামিদের নাস্তা বানান আগেই শেষ ফলে আর কোন গাইগুই করবার সুযোগ পাওয়া গেল না। গরম গরম পরটার সঙ্গে সবজি, ডিম ভাজি, গরু ভুনা দিয়ে আবার একটা জম্পেশ খাওয়া হল। নাস্তা করতে করতে মেজ মামা জানালেন উনিও যাবেন আমাদের সঙ্গে, শুনে মনটা ভালো হয়ে গেল স্কাউট ম্যাপ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না জেনে। খাওয়া শেষে মামার সঙ্গে লিসবন দেখতে বের হয়ে পরলাম আমরা তিনজন। মামাদের বাসার বড় একটা সুবিধা বাসাটা লিসবন সিটি সেন্টারের কাছেই, তাই হেটেই অনেক টুরিস্ট এট্রাকশন ঘুরে দেখা যায়। এখানে উল্লেখ করে নেই অনেকের মতে লিসবনের বয়স প্রায় ৩৩০০ বছর। বলা হয় এথেন্সের পরে লিসবন ইউরোপের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রাজধানী। ফলে এর ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ আর তাই দেখার মত অনেক কিছুই আছে এ শহরে। মামার সঙ্গে বাসা থেকে বের হয়ে পা বাড়ালাম রসসিও স্কয়ার বা প্রাসা হসসিও এর দিকে যার সত্যিকারের নাম প্রাসা দি ডম পেদ্রো-৪। যাবার পথে একটা মনুমেন্ট চোখে পড়ল, একটু অন্যরকম, তবে লেখা সব পর্তুগীজ ভাষায় তাই মানে আর বুঝতে পারলাম না। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যুগযুগ ধরে হয়ে আসা ধর্মের নামে বর্বরতার স্বীকার কিছু অভাগা মানুষের স্মৃতিতে ঐ মনুমেন্ট তৈরি করা হয়েছে। ওটা তৈরি করা হয়েছে যে ঘটনার স্মৃতিতে ইতিহাসের পাতায় তা “দি লিসবন ম্যাসাকার” নামে পরিচিত। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাথলিক মোনার্কেরা স্পেনের কাস্তিয়ে এবং আরাগণ থেকে ইহুদীদেরকে বহিষ্কার করে। প্রায় ৯৩০০০ হাজার ইহুদী শরণার্থী পোর্তুগাল আশ্রয় গ্রহণ করে। তবে স্পেনের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে পর্তূগালের রাজা মানুয়েল-১ ১৪৯৭ সালে সব শরনার্থীকে ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেন। এ ঘটনার ৯ বছর পরে ১৫০৬ সালের ১৯শে এপ্রিল বিকেলে ধর্মবিশ্বাসী ক্যাথলিকেরা সাও ডমিংগোস দি লিসবোয়া কনভেঞ্ছিতে প্রার্থনা করছিল। এর মধ্যে হঠাৎ একজন বলে উঠে সে অল্টারে যিশুখৃষ্টকে কে দেখতে পেয়েছে। একজন ধর্মান্তরিত ইহুদী বলে বসে ওটা বোধহয় মোমের আলোয় দৃষ্টিভ্রম। আর যাবে কোথায়, তাকে চুল টেনে বাইরে নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় এবং এরপরে তার লাশ রসসিও স্কয়ারে নিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়। তবে ক্রুদ্ধ জনতা এখানেই শান্ত হয় না, তাদের তখন রক্তের নেশায় পেয়ে বসছে। আগে থেকেই তারা ধর্মান্তরিত ইহুদীদের বিশ্বাস করত না, এ ঘটনার পরে তারা মেতে উঠে ইহুদী নিধনে। সেদিন প্রায় ২০০০ ইহুদীকে হত্যা করা হয়েছিল ধর্মের নামে। এ ঘটনাই “দি লিসবন ম্যাসাকার” নামে পরিচিত।

“দি লিসবন ম্যাসাকার” এর স্মৃতিতে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ

মামার রেস্টুরেন্ট দুটো রসসিও স্কয়ারের কাছেই, মামা ১০ মিনিটের জন্যে রেস্টুরেন্টের দিকে গেলেন আর আমরা যেহেতু বাসা থেকে একটু আগেই খেয়ে বেড় হয়েছি তাই মামার সঙ্গে ওদিকে না গিয়ে রসসিও স্কয়ার ঘুরে দেখতে লাগলাম। এই রসসিও স্কয়ার ১৩শ/১৪শ শতকে লিসবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হয় এবং তখন থেকে আজ পর্যন্ত এটি লিসবনের গুরুত্বপূর্ণ স্কয়ার গুলোগুলোর একটি। এটাকে একসময় ব্যবহার করা হয়েছে উৎসব, ষাঁড় লড়াই বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবার স্থান হিসাবে, আর এখন এটা লিসবন বাসীর অন্যতম মিলনস্থল।

রসসিও স্কয়ার

মামা ফিরতে ফিরতে আমাদের রসসিও স্কয়ার দেখা শেষ তাই উনি আসার পরে লিসবনের প্রধান শপিং স্ট্রিটের মাঝ দিয়ে আমরা হেঁটে চললাম প্রাসা দো কমার্সিও বা কমার্স স্কয়ারের দিকে। অল্প কিছুদূর হাটবার পরেই রুয়ো আগুস্তা আর্কের নিচ দিয়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম কমার্স স্কয়ারে। কমার্স স্কয়ার তাগুস নদীর পাঁড়ে অবস্থিত। এটি যেখানে অবস্থিত আগে একটা সময় সেখানে ছিল রয়্যাল রিবেরিয়া প্যালেস। ১৭৫৫ সালের লিসবন ভূমিকম্প লিসবনকে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়, আর অনেক কিছুর মতই রয়্যাল রিবেরিয়া প্যালেসো ধ্বংস হয়ে যায়। সেখানেই পরে নির্মাণ করা হয় কমার্স স্কয়ার, তাই এর আরেক নাম প্যালেস ইয়ার্ডো বটে। আমরা যেই আগুস্তা আর্কের নিচ দিয়ে হেঁটে কমার্স স্কয়ারে পৌঁছলাম সেটাও ভূমিকম্প পরবর্তী লিসবন পুনর্নির্মাণ কার্জক্রমের অংশ। কমার্স স্কয়ারের সামনে থেকেই ট্রামে উঠলাম পরবর্তী গন্তব্য বেলেমে অবস্থিত বিখ্যাত পাদ্রো দোস দিসকোবরিমেন্তোস বা মনুমেন্ট অফ দ্য ডিস্কভারিস এর জন্যে। যাবার পথে বোনাস পাওনা ট্রামটি সাধারণ কোন ট্রাম নয়, লিসবনের প্রতীক হয়ে ওঠা প্রাচীন আমলের কাঠের ট্রাম। ট্রামে ওঠার পর কাফি সক্রিয় হবার আগেই মামা আবারো মামাগিরি করে ট্রামের টিকিট কাটলেন। ট্রাম থেকে নেমে জার্দিং দা প্রাসা দো ইম্পেরিও এর মাঝ দিয়ে পায়ে হেঁটে আগালাম। হাঁটার সময় উপভোগ করলাম বাগান এবং বাগানের মাঝে অবস্থিত অসম্ভব সুন্দর একটি ঝর্নার সৌন্দর্য।

সামনে কমার্স স্কয়ার পেছনে আগুস্তা আর্ক

মনুমেন্ট অফ দ্য ডিস্কভারিস তাগুস নদীর পাঁড়ে অবস্থিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এই তাগুস নদী থেকেই ১৫শ/১৬শ শতকে ইন্ডিয়া ও প্রাচ্যে যাবার বাণিজ্যপথ খুঁজে বের করবার জন্যে জাহাজ ছেঁড়ে যেত, ইতিহাসে যা পর্তুগীজ এইজ অফ ডিসকভারি নামে পরিচিত। আর এই পর্তুগীজ এইজ অফ ডিসকভারির স্মৃতিতেই মনুমেন্ট অফ দ্য ডিস্কভারিস তৈরি করা হয়। মজার ব্যাপার এটা দুইবার নির্মাণ করা হয়, একবার অস্থায়ীভাবে ১৯৪০ সালে, যেটা ১৯৪৩ সালে ভেঙ্গে ফেলা হয়, এরপর আবার ১৯৬০ সালে স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয় যেটা আমরা দেখলাম।

মনুমেন্ট অফ দ্য ডিস্কভারিস এর সামনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে লিসবন দখল।

এখানে ফটোসেশন শেষ করে আমরা পা বাড়ালাম বেলেম লাইট হাউস হয়ে বেলেমের সবথেকে বিখ্যাত গন্তব্য টোরি দি বেলি বা বেলেম টাওয়ারের দিকে। বেলেম টাওয়ার মূলত একটি দুর্গ যেটি তাগুস নদীর প্রবেশমুখ কে সুরক্ষিত করবার জন্যে এবং লিসবনের আনুষ্ঠানিক প্রবেশদ্বার হিসাবে ১৬শ শতকে তৈরি করা হয়। পর্তুগীজ এইজ অফ ডিসকভারি এর সময় এর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্যে একে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি যদিও এখন তাগুস নদী এর পাঁড়ে অবস্থিত তবে বলা হয় নির্মাণ এর সময় এটি তাগুস নদী এর মাঝে একটি ছোট্ট দ্বীপের উপর নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৭৫৫ সালের ভূমিকম্পে তাগুস নদী দিক পরিবর্তন করায় এর অবস্থান হয়ে যায় নদী এর পাঁড়ে। রাজা ম্যানুয়েল-১ এর ডানজেন বা ভূগর্ভস্থ কারাপ্রকোষ্ঠকে রাজদ্রোহীদের আটক এবং অত্যাচার করবার কাজে ব্যবহার করতেন, বলা যায় না তাদের অতৃপ্ত আত্মা আমাদের ঘাড়ে লাফিয়ে পরতে পারে তাই সেই ভয়ে আমরা আর ভেতরে না ঢুকে বাইরে থেকেই ঘুরে ফিরে দেখলাম বেলেম টাওয়ার।

বেলেম টাওয়ার

বেলেম টাওয়ারের পরের গন্তব্য কাছকাইছ, সেটা যেহেতু শহরের বাইরে সেখানে যেতে হলে আমাদের আউজেস স্টেশন থেকে ট্রেন নিতে হবে। স্টেশনের দিকে হেঁটে যাবার ফাঁকে কাফি এর সঙ্গে প্ল্যান করে ফেললাম মামা এর মামাগীরী ঠেকাবার জন্যে। স্টেশনে পৌঁছেই কাফি দৌড় দিল টিকিট কাটবার জন্যে আর শাকিল আর আমি আটকে ফেললাম মেঝমামাকে। মামা যদিও চেষ্টা করলেন কিন্তু যখন বুঝলেন এদের সঙ্গে পারা যাবেনা তখন ক্ষান্ত দিলেন। আনুমানিক ৪০ মিনিট ট্রেন ভ্রমণের পরেই পৌঁছে গেলাম কাছকাইছ। ট্রেন থেকে নেমে মামা নিয়ে গেলেন একটা রেস্টুরেন্ট, ওখানে গিয়ে সবার জন্যে অর্ডার করলেন পাস্তেও জি নাতা বা নাতা, যেটা ডিম দিয়ে তৈরি একধরনের কেক। মনে পরে গেল জারব্রুকেন কাউচসার্ফিং গ্রুপের উইকলি মিটিঙে কোরিয়ান এক ছেলে আমাকে বলেছিল আমি যেন পোর্তুগাল গিয়ে অবশ্যই নাতা খাই। আমি যদিও মিষ্টি একদমই খাই না এর পরেও খেতে খারাপ লাগল না, তবে আমার বাকি দুই সাথী নাতার স্বাদে একদম কাত। নাতা খেয়ে কোল্ডড্রিঙ্কসের বোতল হাতে নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলাম কাছকাইছ ঘুরে দেখতে।

নাতা

কাছকাইছ একটি উপকূলবর্তী শহর যেটি শুধু লিসবন নয় পর্তুগালের অন্যতম ধনী পৌরসভা। কাছকাইছে মানব বসতির শুরু হয় সেই পুরাতন প্রস্তরযুগের শেষ ভাগে, যদিও বর্তমানের কাছকাইছ একদম ঝাঁ চকচকে নতুন। আর এর পেছনে কারণ ধনী পর্যটকেরা বা লিসবনের ধনী সম্প্রদায়ের ছুটি কাটাবার জন্যে এই জায়গায় থাকতেই পছন্দ করে। একে ধনীদের পছন্দের গন্তব্য তার উপর উপকূলবর্তী শহর ফলে একটি ইয়ট হারাবার তো না থেকেই পারে না। রাজা কার্লোস-১ এর মূর্তি এর সামনে দিয়ে একটু হেটেই পৌঁছে গেলাম ইয়ট হারবারে। সেখানে গিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালাম, মানে ইয়টে চরার সুযোগ না পেলেও বাইরে থেকেই দেখলাম নানা ধরনের নানা আঁকারের ইয়ট। ইয়ট হারবার থেকে বের হয়ে ডানদিকে মনোমুগ্ধকর সব ভিলা আর বাঁদিকে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর রেখে আমরা হেঁটে চললাম মামার পিছুপিছু, তখনও জানি না মামা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। মামার পিছুপিছু কিছুদূর হাটবার পর পৌঁছে গেলা বোকা দো ইনফার্নো বা হেল’স মাউথ অথবা খাঁটি বাংলায় জাহান্নামের মুখে। ওখানে পৌঁছে আমাদের তো একদম মাথা খারাপ, এত সুন্দর ক্লিফ শুধু সিনেমাতে দেখেছি বা গল্পের বইতে পড়েছি। অনেকবার এমন হয়েছে যে গল্পের বইতে ক্লিফের বর্ণনা পড়ে আমি কল্পনার জগতে সেই ক্লিফে চলে গিয়েছি, তাই হেল’স মাউথ এ গিয়ে আমার অনেকটা স্বপ্ন পূরণ হবার মত অবস্থা। মজার ব্যাপার সিনেমার ইতিহাসের সঙ্গেও কিন্তু এই হেল’স মাউথ এর সম্পর্ক আছে। একদম প্রথম দিকের নির্বাক সিনেমাগুলির অন্যতম একটি “অ্যা সি কেইভ নেয়ার লিসবন” যেটার ব্যাপ্তি ছিল ১৩ সেকেন্ড এবং তৈরি হয় ১৮৯৬ সালে, সেই সিনেমা এই হেল’স মাউথ নিয়েই তৈরি হয়েছিল। যাই হোক, ওখানে উপরে কিছুক্ষণ ঘুরলাম এরপরে নেমে গেলাম একদম নিচে যেখানে সাগরের পানি এসে ক্লিফে আছড়ে পড়ছে, দুই যায়গাতেই চলল ফটোসেশন।

হেল’স মাউথ

হেল’স মাউথ ঘোরা শেষ করে আবার ফিরে চললাম কাসকাইস শহরকেন্দ্রের দিকে। প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটাপথ, তাই পৌঁছে কিছুক্ষণ বসলাম সাগরতীরে শরীর জুড়বার জন্যে। এখানে বলে নেই, আগের দিন হাম্বুর্গে ঠাণ্ডা আমার হাড় কাঁপিয়ে দিলেও লিসবনে দিনের বেলায় বেশ গরম। সমুদ্রের শীতল হাওয়া সঙ্গে মামার আনা কোন আইসক্রিমে অল্পক্ষণেই আমাদের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। সাগরের সৌন্দর্য কিছুক্ষণ উপভোগ করবার পরে ফিরতি ট্রেন ধরলাম লিসবনের উদ্দেশ্যে, নামলাম একেবারে কমার্স স্কয়ারের কাছে। কমার্স স্কয়ার যেখানে নদীর সঙ্গে মিশেছে সেখানে সিঁড়ি করা, সিঁড়ি তে বসে পড়লাম তাগুস নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করবার জন্যে। আশেপাশে লোকে লোকারণ্য দেখে বুঝলাম আড্ডা দেবার জন্যে এটা লিসবনবাসীর বেশ প্রিয় জায়গা। ওখানে থাকতেই মামা জানালেন বাসার কাছে বেশ কিছু বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট আছে যেখানে বাংলাদেশি নাস্তা পাওয়া যায়, আমরা এখান থেকে উঠে সেদিকে যাব। শাকিল জিজ্ঞেস করল পুরী পাওয়া যায় কিনা? মামা হ্যাঁ বলতেই ওর মাথা খারাপের মত অবস্থা, সে ওঠার জন্যে অস্থির (সিলেটী ছেলের পুরির ব্যাপারে আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক)। তাই সেখান থেকে আগালাম হুয়ো দু বেনফরমেসোর দিকে।

তাগুস নদী

হুয়ো দু বেনফরমেসো রাস্তাটা দৈর্ঘ্যে ৫০০ মিটারের মত, অনেকটা আমাদের পুরানো ঢাকার চিপা গলি এর মত, এর দুইপাশে যত দোকান প্রায় সবই বাংলাদেশি। কি নেই সেখানে, ১২-১৫ টা রেস্টুরেন্ট, মুদীদোকান, মাংসের দোকান, সেলুন, একসঙ্গে একই জায়গায় এত বাংলাদেশি দোকান আমি ইতালিতেও দেখিনি। মামা আমাদের নিয়ে ঢুকলেন ঘরোয়াতে, সেখানে গিয়ে প্রথমে খেলাম বড় একবাটি হালিম এরপরে ডালপুরি আর বিশাল সাইজের কিমা চপ। নাস্তা শেষ করে আমি বাদে বাকিরা চা খেল। চা খাওয়া শেষ করে ফিরতি পথে পা বাড়ালাম বাসার দিকে। বাসায় পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে একটু জিরিয়ে মামাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে কখন যে ১০টা বেজে গেল টের পেলাম না। আবার বসলাম খাবার টেবিলে, কাফি সকালেই মামিদের কাছে আবদার জানিয়েছিল সে হাঁস খেতে চায়, ভাগ্নের আবদার বলে কথা, সেই মোতাবেক মামিরা খিচুড়ি, হাঁস ভুনা, বেগুন ভাজি, ডিম ভাজি করে রেখেছে, আবারো নলী ডুবিয়ে রাক্ষসের মত গলা পর্যন্ত গলধকরন করলাম। খাবার পরে শাকিলের অক্সিজেন সমস্যা দেখা দিল, সঙ্গ দেবার জন্যে আমিও বের হলাম। এছাড়া বের হবার আরো দুটো কারণ ছিল, এক সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্ট মিষ্টি দেখে খাবার পর তার মিষ্টি খাবার ইচ্ছে জেগেছে আরেক ওর বাল্যবন্ধু গিলমান ভাই ওর সঙ্গে দেখা করতে আসবে। বাসার পাশেই তাই আবারো গেলাম হুয়ো দু বেনফরমেসোতে। ওখানে গিয়ে আড্ডা চলল গিলমান ভাই আর ওনার বন্ধুদের সঙ্গে। আমি মিষ্টি খাইনা তবে শাকিল বেশ আয়েশ করে মিষ্টি খেল। আড্ডা শেষ করে শাকিল বাসার জন্যও মিষ্টি নিল। বাসায় গিয়ে আবার কিছুক্ষণ মামাদের সঙ্গে আড্ডা এবং এরপরে সরাসরি বিছানায় চিৎপটাং। পরদিন সকালে উঠেও সেই বাসাতেই নাস্তা করতে হল, পরোটা, আলু ভাজি, ডিম পোঁচ সঙ্গে মিষ্টি। ওইদিন আমরা সিন্ত্রাতে যাব, সঙ্গে ছোট মামাও যাবেন। তবে নাস্তা করার পর শাকিল গাইগুই শুরু করল আমরা যেন আজকে বাসা থেকে বের না হই সঙ্গে ছোটমামাও তাল দিলেন। তাদের গাইগুই এর কারণ ঐদিন এশিয়াকাপে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ক্রিকেট ম্যাচ আছে, তারা সেটা টিভিতে দেখতে চায়। আমি আর কাফি ক্রিকেটভক্ত হলেও ওদের মত অত বড় ভক্ত নই। আমাদের দুজনের চাপের মুখে পরে তারা দুজন শেষমেষ বাসা থেকে বের হল। তবে বাসা থেকে বের হয়েই আমাদের নাম দিল প্লাস্টিক সাপোর্টার, আমরা নাকি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নকল ভক্ত। সিন্ত্রা শহরের বাইরে ফলে ট্রেনে করে যেতে হবে, তাই ট্রেনে ওঠার জন্যে চলে গেলাম লিসবোয়া-রসসিও ট্রেন স্টেশনে। ট্রেনে ওঠার পরে ১ ঘণ্টা যাত্রা করে পোঁছালাম সিন্ত্রা ট্রেন স্টেশনে। সিন্ত্রাতেও মানব বসতির ইতিহাস অনেক পুরনো, অনেক নিদর্শন পাওয়া গ্যাছে যেগুলো দেখে ধারণা করা হয় প্রাক প্রস্তরযুগ হতে এখানে মানুষের বসবাস। স্বাভাবিক কারণেই অত প্রাচীন যুগের বাড়িঘর টিকে নেই, তবে মধ্যযুগীয় অনেক দুর্গ এখনো মাথা উঁচু করে রেখেছে সিন্ত্রাতে। বলতে ভুলে গেছি, সিন্ত্রাকেও ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতিটা এসেছে ১৯শতকে তৈরি অসংখ্য ভাস্কর্যের জন্যে, যেগুলো সিন্ত্রা শহরের নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভাস্কর্যগুলোর একটি

স্টেশন থেকে বেড় হয়ে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে পায়ে হেঁটে রওনা হলাম প্যলাসিও ন্যাছোনাল জি সিন্ত্রা বা বা প্যালেস অফ সিন্ত্রা বা সিন্ত্রা ন্যাশনাল প্যালেসের দিকে। যদিও একটু পরপর দাঁড়াতে হচ্ছিল কারণ শাকিল আর মামা মোবাইলে খেলা স্ট্রিম করছিল, আর ওদের স্ট্রিম আটকে গেলেই দাঁড়িয়ে পরছিল। প্যালেস অফ সিন্ত্রাও ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। মধ্যযুগে ইউরোপের যে সমস্ত জায়গায় মুসলিম সম্রাজ্যের আধিপত্য বিস্তার হয়েছিল সিন্ত্রাও তার মধ্যে পরে। বর্তমানে প্যালেস অফ সিন্ত্রা যেখানে সেখানে ছিল একটি মুসলিম দুর্গ, সেই মুসলিম দূর্গকেই ধ্বংস করে সেই জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে প্যালেস অফ সিন্ত্রা। প্যালেস অফ সিন্ত্রা এর সব থেকে সুন্দর জায়গা আমার মনে হয়েছে এর পেছনের দিকটা, ওখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। সিন্ত্রা ন্যাশনাল প্যালেসের সামনে থেকেই বাসে উঠলাম আমাদের পরের গন্তব্য প্যলাসিও ন্যাছোনাল দা পেনা বা পেনা ন্যাশনাল প্যালেসে যাবার জন্যে। রাস্তাটা অত্যন্ত দুর্গম, একেবেকে পাহাড়ি চড়াই উৎরাই পেরিয়ে গেছে, মনে পড়ে গেল বান্দরবান আর লাংকাউইতে মোটরসাইকেল চালাবার স্মৃতি।

প্যালেস অফ সিন্ত্রা

বাসে গিয়ে নামলাম পেনা ন্যাশনাল প্যালেসের সামনে, তবে প্রচণ্ড ভিড় আর বিশাল লাইনের কারণে অল্প একটু পেছনে ফেলে আসা কাস্তেলো দোস মউরুস বা ক্যাসেল অফ দ্য মুরসের দিকে আগালাম। যাদের জানা নেই তাদের জন্যে বলে রাখি মধ্যযুগে মুর বলা হত স্প্যানিশ বা আফ্রিকান মুসলমানদের। মধ্যযুগে মুসলিম শাসকরা প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে স্পেন এবং তদসংলগ্ন এলাকা শাসন করেছে। এই সিন্ত্রাতেও মুসলিম শাসনব্যবস্থা কায়েম ছিল। এই অঞ্চলে তাদের নির্মিত টিকে থাকা দূর্গের মধ্যে ক্যাসেল অফ দ্য মুরস অন্যতম। এটা নির্মাণ করা হয় ৮শ থেকে ৯শ শতকে এবং তখন থেকে ১১৪৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত মুসলিম শাসনের অধীন ছিল। এটাও ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। দূর্গটি পাহাড়ের চূড়ায়, যেতে হয় পাহাড়ের গা বেয়ে দুর্গ প্রাচীরের পাশ দিয়ে নির্মিত পায়েচলা পথ দিয়ে। বেশ খানিকটা হাঁটতে হয়, তাই শাকিল আর মামা ঘোষণা দিলেন ওনারা উপরে উঠবেন না, নীচের গেঁটে বসেই খেলা দেখবেন। কি আর করা, আমি আর কাফি পা বাড়ালাম দুর্গ জয়ের উদ্দেশ্যে।

ক্যাসেল অফ দ্য মুরস থেকে নিচের শহর

পাহাড়ের গা বেয়ে দুর্গ প্রাচীরের পাশ দিয়ে নির্মিত পায়েচলা পথটি থেকে বাইরের ভিউ অসম্ভব সুন্দর, একই সঙ্গে পথটি বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। যেতে যেতে চোখে পরল সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের বাসস্থান, দুই মুখ খোলা প্রাকৃতিক গুহায় বসবার ব্যবস্থা, দূর্গের নকশা, ছোট্ট একটা মিউজিয়াম যেখানে মুসলিম সময়ের তৈজসপত্র থেকে শুরু করে হাতিয়ার, অলংকার সহ নান কিছুর। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আর অনুভব করছিলাম অতীত হয়ে যাওয়া মুসলিম সাম্রাজ্যের শৈর্যবীর্যের কথা। ও বলতে ভুলে গেছি, আমরা কিছুদূর আগার পরেই কৌতূহলের কাছে হার মেনে শাকিল আর মামাও আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। দুর্গ ঘুরে দেখে ফিরতি পথে বাসে করে সিন্ত্রা ট্রেন স্টেশন এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে লিসবনে ফিরে আসলাম।

দূর্গ জয়ে বাকি দুইজনের যোগদান

আগেরদিন সকালে যেহেতু ওয়াকিং ট্রিপে অংশগ্রহণ করতে পারিনি ইচ্ছে ছিল সিন্ত্রা থেকে ফিরে বিকালের সেশনে জয়েন করব, কিন্তু আমরা সিন্ত্রা থেকে যখন ফিরি তখন ইতমধ্যে ১৫ মিনিট পার হয়ে গেছে, তাই ইচ্ছেটা বাধ্য হয়েই ত্যাগ করতে হল। এদিকে আমাদের সঙ্গে কথা না বলেই রাস্তা থেকে মামা বাসায় ফোন করে বলে দিয়েছেন আমরা দুপুরে খাব বাসায় যেন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু আমরা তো বাসায় যাব না, কারণ বাসায় গিয়ে একবার খেলে আমাদের আর বাইরে বের হওয়া হবে না। মামা তো পরে গেলেন বিপদে, পরে বাসায় ফোন করে আবার মানা করে দিলেন। অল্প কিছু খেয়ে নেবার জন্যে আমরা স্টেশন থেকে বের হয়ে চলে গেলাম হুয়ো দু বেনফরমেসোর এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট। ওখানে গিয়ে বিশাল কলিজার সিঙ্গাড়া, মাংসের চপ আর নুডলস্ অর্ডার করা হল। একদিকে খাচ্ছি আরেকদিকে চোখ সেঁটে রয়েছে টিভির পর্দায়, খেলা প্রায় শেষের দিকে এবং বাংলাদেশের জেতার সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। দেখতে দেখতে রেস্টুরেন্ট পুরো ভোরে গেল, সবার মধ্যেই টানটান উত্তেজনা। সবার উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে ৫ বল বাকি থাকতেই বাংলাদেশ জিতে গেল পাকিস্তানের সঙ্গে। আমরাতো সব চিৎকার, মনে হচ্ছিল বোধহয় বাংলাদেশেই আছি। আমার ক্যামেরার ব্যাগে সবসময় বাংলাদেশের একটা পতাকা থাকে, সবাই মিলে রেস্টুরেন্টের বাইরে পতাকা নিয়ে ছবি তুলে বিজয় উদযাপন করলাম। এরপরে ব্যাগ নিয়ে বের হওয়ার সময় কাফি বিল দিতে গেল, কিন্তু মামার ইশারায় ক্যাশের ভদ্রলোক কোনভাবেই টাকা নিলেন না। কি আর করা, ওখান থেকে বের হয়ে পাহাড়ি রাস্তা বাইতে শুরু করলাম মিরাদৌরো দা গ্রাসা তে যাবার জন্যে।

বাংলাদেশের বিজয় উদযাপন

মিরাদৌরো দা গ্রাসা বা যার দাপ্তরিক নাম সোফিয়া জি মেলো ব্রাইনার আন্দ্রেসি লিসবনের অন্যতম প্রধান একটি ভিউপয়েন্ট। সোফিয়া ছিলেন পর্তুগালের স্বনামধন্য কবি ও লেখিকা, যিনি কিনা প্রায়ই এখানে বসে লিসবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতেন আর কবিতা লিখতেন। ওনাকে সম্মান জানাতেই এই ভিউপয়েন্টের নামকরণ ওনার নামে করা হয়েছে। এখান থেকে একদিকে যেমন দেখা যায় কাস্তেলো জে সাও জর্জি অন্যদিকে তেমনি দেখা যায় ক্রমে ঢালু হওয়া অসংখ্য টালির ছাদ, এছাড়া বোনাস হিসাবে আছে তাগুস নদী আর নদীর উপর টুয়েন্টিফিফথ এপ্রিল ব্রিজ। ওখানে বেশ কিছুক্ষণ উপভোগ করবার পর যেতে চাইলাম কাস্তেলো জে সাও জর্জি বা সাও জর্জ ক্যাসেলে, তবে কাফি জানাল তার পক্ষে আর হাঁটা সম্ভব না, অন্যদিকে মামা জানালেন ওখানকার ভিউ এর থেকে ভালো না তাই ফিরতি পথ ধরলাম বাসার দিকে।

সোফিয়া জি মেলো ব্রাইনার আন্দ্রেসি ভিয়পয়েন্ট থেকে কাস্তেলো জে সাও জর্জি, লিসবন ও তাগুস নদী

বাসায় পোঁছালাম সন্ধ্যার কিছু পরে। ঐদিন রাতেই আবার ছিল লিসবন কাউচসার্ফিং গ্রুপের উইকলি মীটিং, কাফি যাবে না তাই আমি আর শাকিল রাতের দিকে বের হলাম কাউচসার্ফিং মিটিঙে অংশগ্রহণ করবার জন্যে। ওখানে গিয়ে পরিচয় হল পর্তুগীজ, ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে। ভালোই আড্ডা চলছিল তবে কাফি বাসা থেকে বাড়াবার ফোন দিচ্ছিল খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে দেখে। তাই ১০টার দিকে সবার থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে গেলাম মামাদের বাসায়। বাসায় গিয়ে দেখি পুরো শাহী খানাপিনার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। পোলাও, বিরাট স্যামন ভাজি, রুইমাছ ভুনা, মুরগির রোষ্ট, গরুর মাংস, খাসির মাংস দিয়ে এলাহি একটা খাওয়া দিলাম। খাওয়ার পর কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম তবে পরদিন ভোরে আমাদের পোর্ত তে যাবার ফ্লাইট ধরতে হবে তাই ১২টার দিকেই শুয়ে পরলাম। পরদিন ৫টায় সবার থেকে বিদায় নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যাত্রার মাধ্যমে শেষ হল আমাদের লিসবন অভিযান। পূর্ববর্তী পর্বঃ ফ্রান্স পূর্ববর্তী উপপর্বঃ প্যারিস