১.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ দিয়ে বেড়িয়েছি প্রায় আট মাস। জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিষয়টা দেশে নতুন। চাকরির ভবিষ্যৎ তাই ফকফকে। এটা বুঝে নিয়ে ডানে বামে বন্ধুরা স্কলারশীপ বাগিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় উড়াল দিচ্ছে। কিছুটা অলস আর গবেট প্রকৃতির হওয়ায় আমি এসবের ধার না ধেরে আরামসে তাদেরই কারো কারো বিয়ে খেয়ে বেড়াচ্ছি। আজকেও সেজেগুজে প্রায় নেচে নেচে বিয়ে বাড়ী গিয়েছিলাম। জবরদস্ত এক মুরগীর ঠ্যাং, দেড় প্লেট পোলাও আর দুই গ্লাস বোরহানি গিলে এখন মাতাল মাতাল লাগছে। টালমাটাল বাড়ি ফিরে বাম দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়েছি।

ঘুমটা জমে মাত্র ক্ষীর ভাব এসেছে, আর অমনি তড়াক্ করে উঠে বসলাম। মনের খচখচানিটা একটা বিড়াল সেজে লেজ বাগিয়ে কান চুলকে দিয়েছে। গত কয়েকদিন আলসেমির বশে অ্যাপ্লিকেশনগুলো নিয়ে আর বসা হয় নি। স্কলারশীপ তো আর বৃষ্টি না যে আকাশ থেকে টুপটপ করে কোল এসে পড়বে। কিন্তু এত রাতে বিবেকের অত্যাচার ভাল লাগে না, ধ্যাৎ! আরো কটা গুরুতর গালি দিয়ে মুখে পানির ঝাপ্টা মেরে ঘাড় সোজা করে বসলাম।

আধো ঘুমের ভেতরই নেচার জবস-এ একটা স্কলারশিপের বিজ্ঞাপন দেখলাম। এই ওয়েবসাইটা ছাড়া আর কিছু চিনি না জানি না দেখে সুবিধে হয়েছে। এখানে পিএইচডির খবরাখবর খুব কম। তাই এই একখানেই ঘুরি ফিরি। প্রফেসরের এক আধটা পেপার পড়ে অন্ধের মত লিখে দেই যে তার গবেষনায় আমি মন্ত্রমুগ্ধ। তাকেই তো খুঁজছিলাম এতদিন, ইত্যাদি। কিন্তু বানিয়ে লিখলে লোকে কেমন করে যেন টের পেয়ে যায়। সেজন্যেই বোধহয় এ পর্যন্ত কোন জবাব মেলে নি। শুধু লেখাই সার হয়েছে।

যাহোক, বিজ্ঞাপনটা জার্মানির একটা রিসার্চ সেন্টারের। হেল্মহোল্টজ সেন্টার মিউনিখ। আর পিএইচডি ডিগ্রিটা দেবে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষনার বিষয়, বিড়ি-সিগারেট খেলে লোকের ফুসফুসে যে ক্রনিক রোগ বাসা বাঁধে, তার উপর। মাউস মডেলের উপর গবেষনার অভিজ্ঞতা আছে, এমন কাউকে খুঁজছে ওরা। নড়েচড়ে বসলাম। একটু আগের বাদশাহী খানাপিনার কারনেই কি না কে জানে, হঠাৎ করে নবাবী মেজাজ পেয়ে বসলো। বরাবরের মত ইনিয়ে বিনিয়ে ফেনিয়ে গপ্পো ফাঁদলাম না। বরং এক পাতারও কম ছোট্ট একটা মোটিভেশনাল লেটার লিখে ফেললাম।

তার সারসংক্ষেপ অনেকটা এরকম, ‘বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করেছি ইঁদুরের উপর আর্সেনিকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে। কাজটা করতে গিয়ে ভীষন আনন্দ লেগেছে। বিজ্ঞানকে যে ভালবেসে ফেলা যায়, তখনই প্রথম জেনেছি। বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ছোট একটা ফান্ডও জুটে গিয়েছিল লেখালিখি করে গ্রান্টের আবেদন করায়। কিন্তু, আমাদের দেশে গবেষনার সীমাবদ্ধতা আছে। চাইলেও অনেক কিছু শেখা যায় না। যেমন, আমার ব্যবহারিক জ্ঞান ভয়াবহ কম। তোমাদের ওখানে যদি গবেষনার সুযোগ মেলে, তাহলে সে ঘাটতি পুষিয়ে নিয়ে আরো নতুন কিছু শেখা যাবে। আমি এই সুযোগটা চাই। তাছাড়া, অসুখ-বিসুখ নিয়ে গবেষনার একটা ট্রান্সলেশনাল দিক আছে। আজ না হয় কাল তার ফল লোকের কাজে লাগে। একটা তৃপ্তি কাজ করে। আমি এই তৃপ্তিটা পেতে চাই।‘

সাথে একটা নাতিদীর্ঘ সিভি জুড়ে দিয়ে ব্যাস্ পাঠিয়ে দিলাম ইমেইলটা। আর ওদের চাহিদামত দুইটা রেকমেন্ডশন লেটার যোগ করতে ভুললাম না। ক্লাসে তেরো জনের ভেতর বরাবর বারো নম্বর রোলের ছাত্রীর জন্যে খুব যত্ন করে এই চিঠিগুলো লিখে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গুরু মানা দুই শিক্ষক আকন্দ স্যার আর নাজমুল স্যার। গুরু দোয়া থাকলে তার শিষ্য একদিন কামিয়াব হবেই -এই অগাধ বিশ্বাস নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে গেলাম সেদিনের মত।

২.
মাঝে কিছু দিন কেটে গেছে। এদিক সেদিক টুকটাক চাকরির চেষ্টা করেছি। আরো কিছু বিয়ের দাওয়াতও খেয়ে ফেলেছি। খেয়ে দেয়ে কয়েক কিলো ওজন বেড়ে যাওয়া ছাড়া লাভের লাভ হয় নি। তবে স্কলারশীপের চেষ্টাটা চালু রেখেছি। প্রতিদিন নতুন একটা ল্যাবে লিখি। কিংবা গ্রাজুয়েট স্কুল বরাবর অ্যাপ্লাই করি। তবে চালাক হয়ে গিয়েছি। যারা ছাত্র চেয়ে পিএইচডি বৃত্তির কথা লেখে, শুধু তাদের কাছেই লিখি। এটা এক ধরনের আলসেমিও বটে।

কিন্তু অবাক করে দিয়ে আগস্টের এক শুক্রবার সকালে এল এক আশ্চর্য উড়াল চিঠি। চায়ে ডুবিয়ে বিস্কুট খাচ্ছিলাম আয়েশ করে। ইমেইল দেখে চোখ ছানাবড়া। এই সুযোগে এক চুমুক গরম চা শ্বাসনালী দিয়ে শর্টকাট মেরে সোজা ফুসফুসে চলে গেল। বিষম খেয়ে যক্ষা রোগীর মত কাশতে কাশতে দেখি একটা ইন্টারভিউয়ের ডাক পেয়েছি। তাও খোদ জার্মানিতে। ঐ যে সে রাতে ফুসফুসের রোগের উপর বিজ্ঞাপন দেখে যে অ্যাপ্লিকেশনটা ছেড়েছিলাম, তারা মিউনিখে ডেকেছে তিন দিনের জন্যে। ভ্রমন বাবদ সব খরচই তাদের। আগ্রহী হলে যেন এক্ষুনি জানাই। ওরা ভিসার কাগজ পাঠাবে। সময় কম। ইন্টারভিউটা আগস্টেরই শেষে।

এক নিঃশ্বাসে ই-মেইলটা পড়ে প্রায় ভেসে ভেসে মায়ের কাছে গিয়ে হড়বড় করে ঘটনা জানালাম। আশির দশকে ফ্রান্স থেকে পিএচডি করা মা মুখে চওড়া হাসি, কিন্তু কপালে ভাঁজ নিয়ে তাকালো। আইবুড়ো মেয়ে আঙ্গুলের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেলো বুঝি এবার। কিন্তু এদিকে ব্যাটে-বলেও তো মিলছে না। সুতরাং, তার কাছ থেকে একটা নিমরাজি হ্যাঁ আদায় করে ভিসার কাগজ দাঁড় করাতে লেগে গেলাম। আগস্টের কালেন্ডার খুব দ্রুত পাতা ওল্টাতে থাকলো।

৩.
অবিশ্বাস্য অল্প সময়ের ভেতর ভিসা হয়ে গেল। ভিসা অফিসার স্মিত হেসে পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ইন্টারভিউ নিতে লোক উড়িয়ে নিয়ে যায়, এমন কেস আমরা খুব একটা দেখি না। আপনি খুব ভাল করে ইন্টারভিউ দেবেন, ঠিক আছে? স্কলারশিপটা কিন্তু পেতেই হবে।‘ বিরাট একটা ধন্যবাদ দিয়ে ফুরফুরে মনে টিকেট কাটতে ট্রাভেল এজেন্টের অফিস চলে গেলাম বড় ভাইয়ের সাথে।

এজেন্ট অফিসার চিন্তিতমুখে বসে আছে। ‘সাড়ে সাত ঘন্টা ট্রানজিট দোহায়। আপনার কষ্ট হয়ে যাবে। নাহ্, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এত দূর যাচ্ছেন, এত কষ্ট পোষাবে না।‘ শুধরে দিতে চাইলাম, ‘চাকরি না , একটা পিএইচডি স্কলারশিপের ইন্টারভিউ ভাই…।’ ভদ্রলোক কম্পিউটারে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। পাঁচ সেকেন্ড পরে ঝলমলে মুখ তুলে ঘোষনা দিলেন, ‘আট ঘন্টার একটা ট্রানজিট পেয়েছি। এই আট ঘন্টা এয়ারপোর্ট লাগোয়া পাঁচ তারা হোটেলে নিয়ে যাবে ওরা। খাবেন দাবেন আর আরাম করবেন। শর্ত একটাই, জার্মানি গিয়ে ইন্টারভিউটা ভাল করে দিতে হবে কিন্তু, হা হা হা।‘

দোহার সেই পাঁচ তারা হোটেলে সফেদ বিছানায় বালিশে ভর দিয়ে ল্যাপটপের কাজ করতে করতে ভাল মানুষ এজেন্ট অফিসারের কথাগুলো কানে বাজছে। নিরিবিলি সময়টার জন্যে কৃতজ্ঞ লাগছে। ইন্টারভিউয়ের প্রথম দিনে একটা প্রেজেন্টশন দিতে হবে। মাস্টার্সের থিসিস প্রেজেন্টশনটাই কাটছাট করে ঢেলে সাজিয়েছি। তিরিশটা স্লাইড থেকে এক ধাক্কায় তেরোতে নেমে এলাম। কারন, বরাদ্দ সময় দশ মিনিট মাত্র। কাজটা গুছিয়ে আনতে আমার আট ঘন্টার সময়টাও যেন দশ মিনিটে ফুস্ করে ফুরিয়ে গেল। ছুটলাম পরের ফ্লাইট ধরতে।

৪.
প্লেনে পাশের সিটে ইউরোপিয়ান এক গোমড়ামুখো বুড়ো বসেছে। আমি সিটের বোতামগুলো যথেচ্ছা টিপাটিপি করে তাকে তিতিবিরক্ত করে ফেলছি। চোখের ওপর একটা বাতি জ্বলছে। সেটা নেভানোর সুইচ খুঁজছি। বুড়োটা আর না পেরে বলেই বসলো, ‘এই মেয়ে, এত জ্বালাচ্ছো কেন বলো তো। মাথায় কি ঘিলু বলতে কিচ্ছু নেই? বাতির বোতাম সিটের কই থাকে জানো না?’ ঘাবড়ে চুপসে গিয়ে বিড়বিড় করলাম, ‘মাফ করবেন, এই প্রথম বিদেশ যাচ্ছি তো। কেতা-কানুন তেমন একটা জানি না।‘ বুড়োটা চেহারা নরম করে ফেললো, ‘এই দেখো, এখানে চাপ দাও।‘ অস্বস্তিকর বাতিটা নিভে গেল আরামদায়ক অন্ধকার এনে দিয়ে। খানিকবাদে দেখা গেল, বুড়োর সাথে ভাব জমে উঠেছে। আরো জানা গেল, ফ্রান্সিস নামের বেলজিয়ান এই ভদ্রলোক তার ব্যবসার কারনে দুই বছর চিটাগাঙে থেকেছেন। বাংলাদেশ তার হাতের তালুর মত জানা। এখন ব্যবসার কারনে জার্মানিতে আছেন কিছু বছর ধরে।

রাত এগারোটা। প্লেন মিউনিখ ছুঁয়েছে। হাতের ঠিকানা ফ্রান্সিসের হাতে। সেও একই দিকে যাচ্ছে। লোকটা না থাকলে ভুল ট্রেনেই উঠে যেতাম নিশ্চিত। নতুন দেশে এসে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কয়েক স্টেশন পর নেমে যাবো। ফ্রান্সিস একটা কার্ড ধরিয়ে বললো, ‘হোটেলে ঠিক মত পৌঁছেছো কিনা অবশ্যই জানাবে। নইলে হাবাগোবা বাংলাদেশী মেয়েটার জন্যে ভীষন চিন্তায় থাকবো। আর ইন্টারভিউ কিন্তু ভাল হওয়া চাই।‘ অদ্ভূত ভাল লাগায় তাকে বিদায় জানিয়ে আলো-আঁধারে ঢাকা রাস্তায় নেমে পড়লাম। আর খুব হুশিয়ার হয়ে পরের বাসটা ঠিকঠাক ধরেও ফেললাম।

৫.
হোটেলটায় আমি একা না। আরো বারো দেশের ছেলে মেয়ে এসেছে। সবাই আমারই মত ইন্টারভিউ দিতেই এসেছে। সকালে সবাই ব্রেকফাস্ট টেবিলে আলাপ হল। আলাপটা চললো এক সাথে বাস নিয়ে রিচার্স সেন্টারের ক্যাম্পাস গ্রোসার্ডেন যাবার পথেও। সেখানে পৌঁছে দেখা গেল সব মিলিয়ে আমরা চব্বিশ জন। কয়জনকে নেবে কে জানে। মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। তীরে এসে তরী ডুবিয়ে ফিরে যাবো মনে হচ্ছে।

আজকে সারাদিন ধরে সবার প্রেজেন্টেশন চলবে একটার পর একটা। আমার পালা আসলে আড়ংয়ের সিল্কের ফতুয়ার ভেতর ঘামতে ঘামতে ঘোরের ভেতর কি যেন সব বলে দশ মিনিটের মাথায় ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে থামলাম। অনেকগুলো প্রশ্ন আসলো। সাহস করে হাসি মুখে উত্তর দিলাম মগজে যদ্দূর যা কুলালো। তারপরের দৃশ্যেই দেখা গেল, তিন বোতল কমলার জুস খেয়ে চোখ বন্ধ করে পেছনের সারিতে গা এলিয়ে দিয়েছি।

ঘুমিয়েই গিয়েছিলাম বোধহয়। খোঁচা মেরে উঠিয়ে দিয়ে পোল্যান্ড থেকে আসা মেয়েটা বলল, ‘চলো, বাস ধরতে হবে। আরেকটা ক্যাম্পাস আছে ওদের। দেখাতে নিয়ে যাবে।‘ পটাং করে সজাগ হয়ে তার পিছু পিছু চললাম। কমলার জুসের ফ্রুক্টোজ কাজ দেয়া শুরু করেছে।

৬.
ঝাঁ চকচকে ল্যাব আর তার ঝকমকে সব যন্ত্রপাতি দেখে চোখ ট্যারা হয়ে গেল এক রকম। আরো নিয়ে যাওয়া হল অ্যানিমেল ফ্যাসিলিটিতে। বিশাল এয়ার কন্ডিশন্ড চেম্বারের শ’খানেক খাঁচায় প্রায় হাজার খানেক সাদা কালো ইঁদুর সাজিয়ে রাখা। তাদের চোয়ালগুলো ব্যস্ত বাদামী খাবারের বলগুলো চিবোতে। এদিকে, হাতে-পায়ে প্লাস্টিকের গ্লাভস-জুতা আর গায়ে গলাবদ্ধ এপ্রোন জড়ানো আমাদের সবাইকে মহাকাশচারীর মত লাগছে। তারই ভেতর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলাম সাথের প্রফেসরকে।

দুই দিন আগেও ভাবি নি এমন কোথাও কখনো এসে পড়বো। মনে পড়ে গেল, ঢাকার আইসিডিডিআরবি থেকে ইঁদুর কিনে সিএনজিতে সেই খাঁচা কোলে করে এনে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ভীষন গরম ঘুঁপচি ঘরে রেখে মাস্টার্সের থিসিস করেছি। গরম থেকে বাঁচাতে ইঁদুরের দিকে টেবিল ফ্যান তাক করে রাখা হত। একবার বেজিতে এসে ক’টা ইঁদুর নিয়েও গিয়েছিল। গেল বর্ষায় ঘরটার তালা খুলতে গিয়ে একটা সাপকে গুঁটলি পাঁকিয়ে দরজার সামনে বসে থাকতে দেখে চিল চিৎকার দিয়ে আরেক দিকে দৌড় মেরেছি।

আমার অবাক বিস্ময় দেখে প্রফেসর বলেই ফেলল, ‘তোমার খুব ভাল লাগছে মনে হয়? আমরা
ফিরে যেতে যেতে তোমার বাকি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, এসো।‘ বিনা বাক্যব্যয়ে সানন্দে তার পিছু নিলাম।

পরের দিন অবশ্য বাক্য ব্যয় না করে উপায় থাকলো না। আসল ইন্টারভিউ হচ্ছে আজকে। সাত-আট জন রিসার্চ গ্রুপ লিডার আমাদের চব্বিশ জনকে ভাগ করে নিয়ে এক জন এক জন করে ডেকে নিচ্ছে তাদের অফিসে। প্রায় একই রকমের প্রশ্ন শুনে আর একই উত্তর দিয়ে দিয়ে আমি হদ্দ ক্লান্ত। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, এটা একটা ধৈর্য্যের খেলা। এ পর্যন্ত আমাকে যা যা করতে হয়েছে, সেখানে বুদ্ধির অংশ কম। চিনা জোঁকের মত দাঁত কামড়ে লেগে থাকার পরিমান বেশি। ক্লান্তিকে ঠেলে দূরে পাঠিয়ে ধৈর্য্যকে কাছে ডাকলাম আর হাসিমুখে পাঁচ নম্বর বারের মত পা বাড়ালাম।

৭.
অতি দীর্ঘ এক ভাইভা পর্ব চুকিয়ে দুপুরে সবাই দল বেঁধে খেতে গিয়েছিলাম। গলা দিয়ে কিছু নামছে না। আনমনে টিস্যুর কোনা আঙ্গুলে প্যাঁচাচ্ছি দেখে সাথের চাইনিজ ছেলেটা মুখভর্তি বার্গার সমেত তাড়া দিল, ‘এই,… গপ্গপ্… খাচ্ছো যে তুমি, গপ্গপ্? তার পাল্লায় পড়ে ঢোক গিলে গিলে কোনোমতে খাওয়া সারলাম।

ফিরে এসে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষায় আছি। একটা লিস্ট নিয়ে সেক্রেটারির মত একজন ছুটাছুটি করছে। হঠাৎ কারো হাতে কাগজটা দিয়ে দেয়া হল। পনেরোজনের হাত ঘুরে লিস্টি হাতে এলে এক চোখ বুজে আরেক চোখ ছোট করে তাকালাম সেদিকে। একি, মাত্র চারটা নাম! এত হুজ্জোত করে দুই ডজন লোক এনে নিল মাত্র এক হালি। কাগজটা নাকের সামনের ধরলাম। আরে কি বিচিত্র ব্যাপার! আমার নামটা দেখি তিন নম্বরে জাঁকিয়ে বসে আছে!

আমার অবিশ্বাস আর কাটে না। হাতে কিল মেরে এক চোট হেসে নেবো ভাবছি। ওমা, পাশের তুর্কি মেয়েটা দেখি ফুচ্ফুচ্ করে কাঁদছে। আমার দিগ্বিজয়ী হাসিয়ে মিলিয়ে গেল। ‘জানো, আমি ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট নই বলে আমাকে নিলো না। তিন বছর আগে মাস্টার্স শেষ করেছি। কি এমন বড় গ্যাপ এটা, তুমিই বলো?’ এই প্রতিযোগিতার বাজারে বিরতি মানেই যে কমতি, সেটা আর ভেঙ্গে বললাম না ওকে। খালি তার হাতটা ধরে নরম গলায় বললাম, ‘মনমরা হয়ে কি লাভ, ভাই। তার চেয়ে আবার চার হাত-পায়ে অ্যাপ্লিকেশন শুরু কর। সামনের তিন মাসের ভেতর কিছু না জুটলে আমার নাম পাল্টে দিও।‘ মেয়েটা চোখ মুছে হাসলো আর পাল্টে দেবার জন্যে আমার পুরো নাম আর ইমেইল কাগজে টুকে নিলো।

এই ঘটনার দেড় মাস পরে সত্যি সত্যিই এক তাজ্জব ইমেইল এসেছিলো, ‘জুরিখ ইউনিভার্সিটিতে আমার ফুল স্কলারশিপ জুটে গেছে, রিম। তোমার নাম পাল্টে আর কাজ নেই, কি বলো?’

৮.
তবে নাম তো ঠিকই পাল্টেছে। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসের ছাব্বিশ তারিখ। জাঁদরেল প্রফেসর অলিভার আইকেলবার্গ পিএইচডি কমিটির বাকিদের ভেতরে রেখে বেরিয়ে এসে আমার গুঁটিয়ে রাখা হাতটা খুঁজে নিয়ে চাপ দিয়ে হুংকার দিল, ‘কংগ্রাচুলেশন্স! প্রশ্নগুলো কি ওন্ডার তোমাকে আগের রাতে শিখিয়ে দিয়েছিল নাকি? নইলে একটা প্রশ্নও তো মাটিতে পড়তে দিলে না…।’ তার মুখের কথা প্রায় কেড়ে নিয়ে আমার গাইড ড. আলি ইলদ্রিম ওন্ডার এগিয়ে এসে সহাস্যে প্রতিবাদ জানালো, ‘একদম বাখোয়াজ কথা, অলিভার।‘ তারপর ছয় ফুটি আকৃতিটা গালিভারের মত ঝুঁকিয়ে আমাকে থাবায় পুরে নিয়ে শুধালো, ‘হেই রিম, আজকে থেকে তুমি ডক্টর সরকার বনে গেলে। নামটাই তো পাল্টে গেলো এক ধাক্কায়, হা হা হা…!’ গালিভারে থাবা থেকে সুড়ুৎ করে পালানো লিলিপুটের মুখেও তখন একান ওকান হাসি।

কিন্তু গল্পের আরো বাকি আছে। নিশ্চিন্ত ছাত্রজীবন পেছনে ফেলে এবার শুরু হল চাঁছাছোলা বাস্তব জীবনের ঘাটে ঘাটে ঘোলা পানি খাওয়া। অথচ এমনটা হবার কথা না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের বিভাগ জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছি। ভীষন খুশির খবর। কিন্তু আমাকে দেখা গেলো প্রতিদিন ক্লাস শেষে মোকাররম ভবনের গেটে মাথা নিচু করে বসে আছি। বিষন্নতায় মনটা অবশ। সাড়ে তিন মাসের ছেলেটাকে নিয়ে চাকরিটা করতে একাই চলে এসেছি। ছেলের বাবা রয়ে গেছে জার্মানিতে। দেশে তার চাকরির বাজার মন্দা। এদিকে, অতি ছোট বাচ্চা ঘরে রেখে আমিও বাইরে পড়ে থাকি সারাদিন। অপরাধবোধ কুড়ে খায়।

টানাপোড়েনের শক্তি অনেক। হার মেনে সব ছেড়ে জার্মানি ফিরে এলাম। তবে ফিরে জিতেও গেলাম। তিন জন মিলে ছোট্ট পরিবার আবার। একটা পোস্টডক শুরু করলাম। সেই আগের ল্যাবেই। ওন্ডারের উৎসাহে আর লেখালিখির জোরে ইউরোপিয়ান রেস্পিরেটরি সোয়াইটির এক বছরের একটা স্কলারশিপ জুটে গেল। এগারো মাসের ছানাকে ডে-কেয়ারে রেখে কাজ শুরু করে দিলাম।

৯.
ভালোয় ভালোয় একটা বছর পেরিয়ে গেল। কিছুটা একঘেয়েমি পেয়ে বসেছি। গবেষনার একই বিষয়ে অনেকদিন আটকে থাকলে যেমন হয় আর কি। উড়াধুরা সিদ্ধান্ত নিলাম। একাডেমিয়া অনেক হয়েছে। এবার নতুন কিছু করে দেখি। নতুন কিছু করার নেশায় পেশা বদলটা অত সহজ হল না। দশ মাস বেকার থাকলাম। তার ছয় মাস জার্মান ভাষার উপর ক্লাস করেছি। ইন্ডাস্ট্রিতে নাকি ভাষাটা খুব দরকার। আর দুই মাস একটা কোর্স করেছি। লাইফ সাইন্স ম্যানেজমেন্টের উপর এই কোর্সে পাখি পড়া করে পড়ানো হল ইউরোপ-আমেরিকার বায়োটেক কোম্পানি কিংবা ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাজের ধারা আর তাদের রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্সের মত যত খটোমটো খুটিনাটি বিষয় আছে। একেবারে ক থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত, সব।

এক পেট নতুন ধরনের বিদ্যা আর শ’দুয়েকের মত অ্যাপ্লিকেশন লিখে চুলে পাক ধরানোর বিনিময়ে মেডিকেল ইমেজ অ্যানালাইসিস নিয়ে কাজ করে এমন এক ছোট্ট ফার্মে কাজ জুটে গেল। মিউনিখের প্রানকেন্দ্রে সাজানো গোছানো অফিসে সবাই স্যুট-টাই, স্কার্ট-টপ পরে ফিট বাবু সেজে আসে। ভুশভুশে জিন্স পরে অভ্যস্ত আমার কাছে ব্যাপারটা দুর্দান্ত লাগলো। টকটকে লাল লং স্কার্টের সাথে সাদা বুটিকের টপ পরে আমিও জাতে ওঠার চেষ্টা চালালাম। কিন্তু বিধি বাম। কাজটার গৎবাঁধা ধরন আর অহেতুক মিটিং-আলোচনা-ভালোচনার অত্যাচারে মাস খানেকের মাথায় হাঁপ ধরে গেল। সুযোগ বুঝে ভুশভুশে জিন্স আমাকে ‘আয়, খুকি আয়’ বলে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকলো।

তার আগেই অবশ্য ম্যানেজারের ঘরে ডাক পড়লো। ‘তোমার মনে কাজটা ভাল লাগছে না। আমরা কিছু কিছু বুঝতে পারছি। তুমি কি মানিয়ে নিতে আরেকটু সময় নিতে চাও?’ সুযোগটা লুফে নিলাম। বিনয়ের সাথে একটা অনুচ্চ ‘না’ বলে আধা ঘন্টার ভেতর ল্যাপটপ ইত্যাদি জমা দিয়ে অফিসের বদ্ধ খোপ থেকে বেরিয়ে খোলা বাতাসে অনেকদিন বাদে নিঃশ্বাস নিলাম বুক ভরে।

১০.
এবার পা ফেলতে হবে সাবধানে। তাই খুব বেছে বেছে হাতে গোনা কিছু জায়গায় আবেদন পাঠালাম। অ্যাকাডেমিয়া আর ইন্ডাস্ট্রির মাঝে ফারাক করলাম না। ভাল লাগাকে দাম দিয়ে এগোলাম। হোক বেতন কম কিংবা বছর খানেকের চুক্তির চাকরি। খুঁজে পেতে একটা মোটামুটি মন মতো চাকরি পেয়ে গেলাম। টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখে পোস্টডক। দুই বছরের চুক্তি। ক্যান্সার রোগীদের টিস্যু ইমেজ অ্যানালাইসিস নিয়ে কাজ। কোম্পানির অভিজ্ঞতাটা কাজে দিয়েছে চাকরিটা পেতে। কোন অভিজ্ঞতাই ফেলনা না আসলে, হোক সেটা মিষ্টি মধুর কি তিতকুটে বিচ্ছিরি স্বাদের।

দুই বছরের এক বছর প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। চুক্তি বাড়লে খুব ভাল। নইলে নতুন চাকরি খোঁজার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। এই খেলাটাকে ভয় পাবার বদলে উপভোগ করি ইদানীং।
সেই ভোঁও ইন্টারভিউ থেকে শুরু হয়েছে এই যাত্রার। সেই পথ এখনো চলছে। এর শেষ কই, জানা নেই। শুধু জানি, জীবন একটা বয়ে চলার বস্তু। এর কোনো কিছুই পাথরে খোদাই করা না। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। চলতি পথে নতুন কত কি শিখি। বোহেমিয়ান এই প্রবাসজীবনে তাই গন্তব্যের চাইতে ভ্রমনটাই বেশি রোমাঞ্চের।

(উচ্চশিক্ষা বিষয়ক সংকলন, ‘স্বপ্নের সীমানা পেরিয়ে’, মাতৃভাষা প্রকাশ, বইমেলা ২০২০)

-ডঃ রিম সাবরিনা জাহান সরকার
গবেষকঃ ইন্সটিটিউট অব প্যাথোলজি, স্কুল অব মেডিসিন,
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি