দেশের বাইরে যারা একা পড়তে আসবে তাদের সব্যসাচী হতে হবে এটা মাথায় রেখেই প্রস্তুতি নেয়া উচিৎ। দেশের মত রান্না, কাটাকাটি বা বাসন ধুয়ে ঘর দোর পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্য কোন কাজের বুয়া নেই সব নিজেকেই করতে হয়, তা সে কোন সোনার চামচ মূখে নিয়ে জন্মানো রাজকন্যা হোক বা কোন মিলিয়নিয়ার এর মেয়ে হোক ।ইউনিভার্সিটিতে পড়তে হলে সে ডরমে থাকুক বা বাড়িতেই থাকুক রান্না, বাজার, ঘরদোর, বাথরুম, বেসিন, রান্নাঘর, ময়লার বালতি পরিষ্কার সবকিছু নিজেরই করতে হয়।

আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে আমাদের দেশের মত রেস্টুরেন্ট পাওয়া যায় না যেখানে ক্লাসের ফাকে একটু খেয়ে নেওয়া যায় । রাতে ঘুমোতে যাবার আগে ভেবে নিতে হয় সকালে কি খেয়ে ক্লাসে যাবে আর সে খাওয়ারটা ঘরে আছে কিনা। ঘুম ভেঙ্গে ওভেনে বা টোস্টারে ব্রেড ঢুকিয়ে দিয়ে সাথে সাথে নিজের তৈরি হয়ে নিতে হয়। প্রবাসে সব কিছু ঠিক সময় মত করতে পারা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখানে বাস, ট্রেন সব ঘড়ি ধরে চলে, এক মিনিট এদিক ওদিক হবার উপায় নেই।

আবার সারাদিনের জন্য বাইরে গেলে বা ক্লাসে থাকলে খাওয়ার, কফির মগ, পানির বোতল সব ব্যাগে ভরে নিতে হয়। কেননা চাইলেই রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে চা খেয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের এত বড় ক্যামপাসে একটি মাত্র ক্যাণ্টিন রয়েছে।সেখানে দুপুরে খাবার এবং চা কফির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সে খাবার পয়সা দিয়ে শুধু কেনা হয় আমি খুব ক্ষিধে নিয়েও পু্রোটা খেতে পারিনি কোনদিন এই এক বছরে।

আর ক্যাম্পাসে ওয়ান টাইম কাপ বা মগ আতিরিক্ত বর্জ্য তৈরি করে বলে একে খুব নিরুৎসাহিত করা হয়।তাই সবাই ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার আগে একটা ব্যাগপ্যাক পিঠে ঝুলিয়ে তাতে পানির বোতল, কফির মগ, জুস, চকলেট এবং সাথে দুপুরের খাওয়ার ভরে নিয়ে বেরিয়ে পরে। ক্লাস লাইব্রেরী পড়াশোনা, পার্ট-টাইম কাজ সব করে ঘরে এসে আবার চলে পরদিনের প্রস্তুতি। এখানে টানা ৪ ঘণ্টা করে ক্লাস দিনে ৮ ঘণ্টা বা তার বেশীও ক্লাস করতে হতে পারে যদি পাশাপাশি ভাষা শেখা বা অন্য কোন ক্লাস থাকে। শহর- বাজার, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে কোথাও রিকশা নেই, ছেলে মেয়ে, ছোট বড় সবাই সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পরে আর বাস স্টপ বা ট্রেন ষ্টেশনের পাশে সাইকেল রাখার ভাল ব্যবস্থা থাকে সব জায়গাতে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ঘরগুলোতে ইচ্ছে মত ফার্নিচার, কার্পেট, সোফা, বা নানা রকম পেন্টিং দিয়ে সাজানোর সুযোগ আছে। কিন্তু ঘরে থাকবার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে আবার ঘর ধুয়ে মুছে রং করে দিয়ে যেতে হয়।আমার জার্মানিতে এই অক্টোবরে এক বছর হল । আসার ঘরের থাকবার মেয়াদ শেষ হল তখন আমাকেও ঘরে রং করে দিতে হয়েছে। আমি খুব চিন্তায় ছিলাম কিভাবে সব করব একা ঘরের ফার্নিচার সাত তলা আট তলায় টেনে তোলা তো আর চাট্টীখানি কথা নয়। এখানে বন্ধুরা খূব সাহায্য করে।আমার ঘরের রং করা থেকে শুরু করে সব কিছুতেই আমাকে ওরা বার বার জিজ্ঞেস করেছে কী সাহায্য লাগবে। একজন বন্ধু তো একা একা নিচ তলা থেকে ৬ তলা পর্যন্ত একটা ছোট ফ্রিজ টেনে তুলে নিয়ে পৌছে দিয়ে গেল।ছেলেমেয়েগুলোকে দেখতে খুব শুকনো কাঠি কাঠি, রোগা-পাতলা দেখা গেলেও এদের কর্মক্ষমতা যে অনেক বেশী সেটা পার্টটাইম কাজ করতে গেলেই টের পাওয়া যায়। প্রথম দিকে খুব কষ্ট হত এখন আস্তে আস্তে শিখে নিয়েছি অনেকটা এই এক বছরে।আর এখানে সব চেয়ে বেশী স্বাধীনতা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো সেটা দিনে কি মাঝ রাতে।প্রকৃতির রং-রুপ ও খুব ভাল করে উপলব্ধি করা যায় অদ্ভুত এক ভাষা রয়েছে এর।যেটা শহরের কোলাহলে পাওয়া যায় না।

এত দায়িত্ব আর ব্যস্ততা হয়ত শুনতে খুব কঠিন মনে হচ্ছে কিন্তু এগুলো আমাকে নিজের দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছে।জার্মানিতে পড়তে এসে আমার মনে হয়েছে এখানে মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই । ধনী –গরীব সবাই সমান, সাদার উপরে কালো বা কালোর উপরে সাদার কোন বৈষম্য নেই।

রাশা বিনতে মহিউদ্দীন,

স্টুডেন্ট অফ মাস্টারস ইন ইনভাইরনমেন্ট প্রটেকশন এন্ড এগ্রকালচারাল ফুড প্রডাকশন ইন ইউনি হোয়েনহেইম
স্টুটগার্ট জার্মানি।