অনেকদিন ধরে ভাবছি শেয়ার করব, সময় করে গুছিয়ে লেখা হয়নি, আজকে এখন আমার জন্যে যথেষ্ট সময় (যদিও বাংলাদেশে রাত ৪.০০ টার বেশী তবে আশাকরি অনেক জার্মান প্রবাসীরা ঠিকই জেগে আছে, তার উপর আজকে শুক্রবার রাত, বাংলায় চাঁদরাত)। আসল ঘটনায় আসি, ১৫ অগাস্ট ২০১৫ তারিখ, আমরা German Research Center for Geosciences GFZ Potsdam থেকে একদল গবেষক সৌভাগ্যক্রমে জার্মান চ্যাঞ্চেলর আঙ্গেলা মোরকেল এর অফিস ভ্রমণের আমন্ত্রণ পাই, বলে রাখা ভাল GFZ Potsdam হচ্ছে জার্মানির সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ক্ষেত্রে, তাই এই সুযোগটি মিলেছিল খুব সহজেই, সাধারণত সাধারণ জনগণ জন্য বছরের যে কোন একটি দিনে শুধুমাত্র সুযোগ মেলে জায়গাটিতে যাওয়ার। এতএব, ঐ দিনে বার্লিনের কয়েকটি জায়গা ঘুরে আমরা যথাসময়ে দুপুরের মধ্যেই আমরা হাজির Bundeskanzleramt Berlin তথা জার্মান চ্যাঞ্চেলরের অফিসে। এই গ্রুপেরই অন্যতম কর্ণধার Tanzia কে বলে রেখেছিলাম আমাদের সাথে যোগদিতে, আমার কোর্স ডিরেক্টর তো ভীষণ খুশি তানজিয়ার জার্মান বলায়, She speaks German perfectly! সে কারণেও বোধহয় আগে থেকে আনুমতি না থাকার পরও উনি চেষ্টা করেছিলেন ওকে আমাদের সাথে নেওয়া যায় কিনা! দুর্ভাগ্য (পরবর্তীতে বুঝেছিলাম ওইটা আসলে সৌভাগ্য হবে!) তাকে বাইরের পার্কে অপেক্ষারত রেখেই ভিতরে গেলাম আমরা ২৭ জনের গবেষকদল, রীতিমত ২ বার করে বিমানবন্দরের কাস্টমসের মত চেকিং এর পর আমাদেরকে নিতে আসলেন এক অফিসিয়াল (আসলে জাঁদরেল মহিলা!) রীতিমত একটা সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং দিয়ে শিখিয়ে দিলেন কোন কোন জায়গা দিয়ে চলা বিগ বস (আঙ্গেলা মোরকেল!!) পছন্দ করেননা, দেখলে রেগে যেতে পারেন ইত্যাদি ইত্যাদি, এছাড়া আমরা যেন ঠিকঠাক অফিশিয়ালরা যা বলেন মেনে চলি! যাইহোক আমরা নিরাপত্তাবলয় পেরিয়ে পৌঁছলাম চ্যাঞ্চেলরের অফিসের নীচতলায় পৌঁছালাম, আমাদেরকে বলা হল জিনিশপত্র/ব্যাগ নির্দ্রিস্ট একটি কক্ষে রাখতে, একইসঙ্গে বলা হয়েছিল আমরা ইচ্ছে করলে ওয়াশরুমে যেতে পারি।বাইরে তানজিয়া যেহেতু সাথে ছিল আমি ওর কাছে ব্যগ রেখে যাওয়ায় একমাত্র ক্যামেরা নিয়ে তাই মনের আনন্দে ছবি তুলছিলাম, মহিলাটি কি বলছিলেন ঠিকঠাক খেয়ালও করিনি। হঠাৎ দেখলাম আমাদের একদল পুরুষ গবেষক বাথরুমের দিকে যাচ্ছে, আমিও তাদেরকে অনুসরণ করলাম, কয়েকজনকে দেখলাম উপরতলার সিঁড়িবেয়ে উঠে যেতে, আমি এবং আমার তুর্কিশ বন্ধু ওদেরকে নিষেধ করলাম উপরে যেতে, ততক্ষণে প্রায় অর্ধেকের বেশী উঠে গেছে, অগ্যতা আমরাও তাদের অনুসরণ করলাম, এবং উপরের ফ্লোরে চারপাশে একবার প্রদক্ষিণ করা শেষ, আমার পাকিস্থানি বন্ধু আমাকে ছবি তুলতে বলে এও বলল জাঁদরেল মহিলা বলেছে এখানে ছবি তোলার কোন বাঁধা নেই, অতএব, সময় নিয়ে অনেকগুলো ছবিও তুলে নিলাম। একবার প্রদক্ষিন করার পরই বুঝতে পারলাম ঘটনা অন্যরকম হয়ে গেছে, আমার কোর্সের প্রধান চীৎকার করে আমাদের ডাকছে এবং কয়েকজনকে রীতিমত বকতে লাগল, আমরা কেন উপরে উঠেছি, আমাদেরকে শুধুমাত্র বলা হয়েছে আমরা জার্নি করে এসেছি, যদি প্রয়োজন হয় তবে ওয়াশরুম ব্যবহার করতে যাতে করে পরবর্তী ১ ঘণ্টায় অফিসট্যুরের সময় দরকার না হয়। যাইহোক, আমরা নিচে আসার পর দেখলাম জাঁদরেল মহিলার সাথে আরও কয়েকজন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট লোকজন। প্রথমে বলা হল, আমরা যেখানে গিয়েছি সেই জায়গাটি চ্যাঞ্চেলরের একটি সমাবেশ কক্ষের অঞ্চল, আমরা যদি কোন ছবি তুলে থাকি তা সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেলতে, মোটামুটি ক্যামেরা ধরে ধরে চেক করা হল, ঘটনা আরও বেশী ভয়ংকররুপ নিল যখন দেখা গেল গুনে গুনে আমাদের একজনকে পাওয়া যাচ্ছেনা, মিনিট পাঁচেক পরে পাঁচতলা থেকে তাকে উদ্ধার করা গেল। জাঁদরেল মহিলাটি আমাদেরকে বকাঝকা করার পরে ফোনে কার সাথে যেন জার্মান ভাষায় কথা বললেন তারপরে জানালেন, Chancellor Office Security Officers don’t rely on your recent movement inside the building, so you have to go back from this office through another security check out. কি আর করা! ভেবেছিলাম ভ্রমণ শেষ, কিন্তু আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হল সিকিউরিটি কক্ষে, প্রথমে জিজ্ঞেস করা হল আমরা কেউ কোন জিনিষ (explosive) ভিতরে রেখে এসেছি কিনা! প্রায় ১০ মিনিটের ভিডিও মনিটরিং রিভিউ করার পরে বলা হল, আমাদের মুক্তির দুইটা পথ খোলা আছে, এক, আমাদের যেভাবে চেকিং করে ভিতরে নেওয়া হয়েছে ঠিক সেভাবে আবারও চেকিং করা হবে (যেটা অসম্মানজনক), দুই, তবে আমরা চাইলেই চেকিং avoid করতে পারি, তবে তার জন্যে আরও ২/৩ ঘণ্টা লাগবে যতক্ষণ না পুরো বিল্ডিং পুনরায় ম্যানুয়ালি পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয় ভিতরে আমরা কিছু রেখে এসেছি কিনা! সময়ের অভাবে অগ্যতা অসম্মানজনক পথই বেছে নিলাম আমরা, আর আসার আগে শুনে আসলাম এই ঘটনাটি নাকি গত ২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধরণের নিরাপত্তাজনিত বিশৃঙ্খলা এবং ‘আমাদের জার্মানি অবস্থানের দিন পর্যন্ত পুলিশ অবজারভেশনে রাখা হবে আমরা কোন ধরণের ফ্লটি মুভমেন্ট আবার করি কিনা’। এছাড়া প্রোগ্রাম ডিরেক্টরকে বলে দেওয়া হল তাকে যেন পরবর্তীতে ঐ বিল্ডিং-এ আর না দেখা যায়। বের হবার সময় আবারও চিরকালীন বৈষম্য Ladies First! (আসলে বিল্ডিং এর মাঝে আর এক মিনিটও থাকতে ইচ্ছে করছিল না, নিজেকে কেমন যেন লাদেন গ্রুপের সদস্য মনে হচ্ছিল যেভাবে চেকিং চলছিল), সবমিলিয়ে ভিতরে যাওয়া আসাতেই প্রায় ১.৫ ঘণ্টা কেটে গেল, অফিস দেখা আর হলনা, শুধু নিরাপত্তাই দেখে আসলাম! পরে জেনেছিলাম, আমাদের ঐ বন্ধুটির পাঁচতলা ভ্রমণের কারণেই আমাদেরকে ফিরে আসতে হয়, পরবর্তীতে Federal Foreign Office এ আমরা আমন্ত্রণ পাই, তবে আমি প্রাগ ঘুরতে যাওয়ায় আর যেতে পারিনি, তবে সুযোগ থাকলেও ঐ বন্ধুটি পাচতলায় যায়নি 😉 ! সুতরাং যারা Bundeskanzleramt এ যাবেন, সাবধান!