মানুষের সবপ্নগুল সবসময় সাদাকাল হলেও বাস্তবতা হয়ত কিছুটা রঙ্গিন হয় কিন্তু জীবনের ক্যানভাসটা ফেসবুকের টাইম লাইনের মত এতটা সহজ নয়। রঙ্গিন ক্যানভাসের রং পেতে হারিয়ে যায় অনেকটা সময়, অনেক ভাললাগা মান অভিমান।

৭ মাস আগে যখন এই শহরে আসি তখন বুঝতে পারতাম না উত্তর দক্ষিণ কোন দিকে। বিছানার চাদর কিনে এনে দেখি লেপের কাভার, চিনি কিনে দেখি টক চিনি ( চিনিও যে টক হয় জানতাম না) মাঝ রাতে বাসায় ফিরতে যেয়ে চলে গিয়েছি শহরের বাইরে, ইলিশ মাছ হয়ে গিয়েছে সুরমা মাছ, কেক কিনে দেখি কেকের পাউডার, যাব এক শহরে চলে গিয়েছি আরেক শহরে, আর ট্রেন বাস ভুল করা সঠিক ঠিকানা খুঁজে বের করতে না পারাটা নিয়মিত ব্যাপার। প্রতিদিনের এত ভুলের মাঝেও একটা ভাল দিক আছে তা হল আমি প্রতিনয়ত শিখছি, ভুল করে হলে অনেক কিছু শিখেছি।

ভুল শব্দটা থেকে একটা গল্প মনে হয়ে গেল, আজ কে গল্পটায় ভাগ করি সবার সাথে।

গল্পঃ কিছু দিন আগে জার্মানি বাংলাদেশ সহ ইউরোপের অনেক দেশের মিডিয়াতে একজন বাংলাদেশি কূটনীতিকের খবর এসেছিল। যিনি বুয়েট থেকে ব্যাচেলর শেষ করে বিসিএস পরীক্ষায় বেস্ট পরিক্ষার্থী হিসাবে উতীর্ন হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পর হল্যান্ডে বাংলাদেশ মিশনে একজন শিক্ষানিবশ কূটনীতিক কর্মকর্তা হিসাবে যোগদেন এবং ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনশিপের উপর উচ্চতর শিক্ষারত ছিলেন। কিছুদিন আগে হল্যান্ডের একটা সুপার মার্কেটে হেডফোনের সিকিউরিটি স্টিকার সরিয়ে চুরি করতে যেয়ে হাতে নাতে ধরা খেয়ে পুলিশের কাছে জরিমানা দিয়ে ছাড়া পায়। পরে জানা যায় সে গত কয়েক মাস থেকে মনরোগ চিকিত্সকের কাছে চিকিত্সা নিচ্ছেন।

এমন একটা গল্প শেয়ার করার পেছনে দুইটা কারণ . …

১। একজন মানুষ যখন দেশের বাইরে থাকে তখন সে শুধু তার থাকে না, সে তখন তার দেশের একজন প্রতিনিধি, ১৬ কোটি মানুষের প্রতিনিধি সমস্ত পৃথিবীর কাছে। একজন কূটনীতিক যখন চুরির দায়ে সাজা পায় তখন তা ১৬ কোটি মানুষের জন্য লজ্জার। যে এক কোটি বাঙ্গালী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে তাদের কে মাথা নিচু করে থাকতে হয় এদের মত কূটনীতিকের জন্য । কারণটা খুব স্বাভাবিক আমি নিউজটা অনেক বার অনেক খানে পড়েছি কিন্তু তার নাম মনে রাখতে পারি নাই শুধু মনে আছে বাংলাদেশের নামটা। এখানে যারা আছে তারাও বাংলাদেশের নামটাই মনে রেখেছে। আমার কলিগ বা বন্ধুদের মধ্যে অনেকে আছে যারা আমি বাংলাদেশের যতটা খবর রাখি তার চেয়ে অনেক বেশি খবর রাখে। আর এমন খবরে বাংলাদেশিদের সম্বন্ধে তাদের কি মনে হয় তা আর নতুন করে না বলি।

২। এহেন ঘটনার আসল কারণ সে মানসিক ভাবে পুরপুরি সুস্থ নয়। আর তার অসুস্থতার কারণ হল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা। বুয়েটে পড়া অবস্থায় সে সমাজ সংসার সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছে, তার সামাজিক বা মানসিক যে বিকাস হওয়ার কথা ছিল তা তো হয়নি বরং দিন দিন তার একাকীত্ব তাকে অসুস্থ করে তুলেছে কিন্তু মজার ব্যপার হল সে কখন তা বুঝতেও পারেনি। নিজের দেশে নিজের আলো বাতাস মাটির মাঝে থেকে যদি এই অবস্থা হয় তাহলে যারা দেশ ছেড়ে হাজার হাজার কিমি দূরে আছে সম্পূর্ন আলাদা একটা পরিবেশে আলাদা সমাজে তাদের কি অবস্থা ?

এবার সেই অবস্থাটা একটু ব্যাখ্যা করি!!

দেশ থেকে যারা দেশের বাইরে আসে বিশেষ করে জার্মানী বা ইউরোপে তাদের যে বেসিক তিনটা সমস্যা হয় এক ভাষা, দুই খাবার, তিন কালচারাল শক। প্রথম দুইটার সাথে কোন ভাবে মানায় নিতে পারলেও ৩য় টা আর হয়ে ওঠে না। এখানে এসে ৩ ভাগে ভাগ হয়ে যায় একদল নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নেয় এমনকি নিজেদের কমিউনিটি থেকেও এবং এনাদের সংখ্যায় সব চেয়ে বেশী হবে। ২য় দলটা আসলে র্স্মাট বাংলাদেশদের এরা জীবনের আল্টিমেট স্বাধীনতাকে উপভোগ আর জার্মানদের বা তাদের সমাজ কে না বুঝে জার্মান হয়ে বসে। আর এই জার্মান হতে যেয়ে নিজেদের মান সন্মানের সাথে সাথে দেশের মান সন্মানের ও বারোটা বাঁজায়। যদি আর সহজ ভাষায় বলি তবে নিজেরে কুকুর ছাগলের পর্যায়ে নিয়ে যায় । বাকি ৩য় শ্রেণীর সংখ্যাটা খুবই কম যাদেরকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয় দুইটা পৃথিবীকে ব্যালেন্স করার জন্য, নিজেকে ট্রানজিশন লাইনের মাঝ খানে রাখতে ।

বাংলাদেশিদের খুব কমন একটা সমস্যা নিজেদের বাইরে কোথাও যাওয়া যাবে না, কারো সাথে মেশা যাবে না এমনকি জার্মানদের সমাজ কালচার এগুলো জানা যাবে না। সমাজ থেকে বিছিন্ন হয়ে বেঁচে থাকা তা আপনার নিজের জন্যই ক্ষতিকর সে আপনি নিজ দেশে আর অন্য কার দেশেই বাস করুন না কেন। আর সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যপার হল অনেকে চিন্তা করে পড়াশুনা শেষে চাকরি বা একটা লম্বা সময় থাকার, এক্ষেত্রে আমি আপনারে লিখে দিতে পারি অন্তত জার্মানীতে একটা ছেলে কতটা কোয়ালিফাইড ( সাউথ এশিয়ানদের জন্য ) তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন তার জার্মান সোসাইটির সাথে ইন্টিগ্রেশন কতটা ভাল, সে অফিসে সবার সাথে নিজেকে কতটা মানায় নিতে পারবে (অন্তত এইটুকু আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলা )