rp_33-300x2251-300x2251-300x225.jpg

লিখেছেন: মাকসুদুল হক

আগের পর্বে পেপার লেখার কিছু মৌলিক বিষয় নিয়ে এসেছিলাম। এবার পেপার সাবমিট করার পরের অংশ নিয়ে লিখব। পেপার লিখার পরেই আপনার দ্বায়িত্ব শেষ হলো না। পেপারটি এখন নানান ধাপে মূল্যায়ন হবে, মুল্যায়নের যেকোন ধাপে আপনার পেপারটি রিজেক্টেড হতে পারে। প্রথমেই যেসব কমেন্ট আসতে পারে তা আলোচলা করি।

প্রথম ধাপঃ জার্নাল এডিটর বা জার্নাল ম্যানেজার
এটাকে বলা হয় টেকনিকাল চেক। এদের হাতে নানান অত্যাধুনিক সফটওয়ার আছে। জার্নাল এডিটর বা ম্যানেজার আপনার পেপারটি প্রথমেই যেইসব কারনে রিজেক্ট/কমেন্ট দিতে পারেন-

১) আপনার পেপারটি আমাদের জার্নালের স্কোপে পড়ছে না। দুঃখিত। (অনেক পেপার এভাবে হিটেই বাদ পড়ে যায়। তাই সঠিক জার্নাল খুজে বের করা জরূরী, নইলে মূল্যবান সময় নষ্ট হতে পারে। সাবমিশনের আগে স্কোপ দেখে নেয়া উচিত। পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চাইলে এডিটরের কাছে ইমেইল লিখে জানতে চাইতে পারেন)

২) অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, আপনার লেখার গুনগত মান আমাদের পেপারের উপযোগী না। বা, আপনার লেখার অরিজিনালিটি নাই।
এরকম একটি কমেন্ট আপনার পেপার লেখার আগ্রহ-উৎসাহ শেষ করে দিতে পারে। কিন্তু হতাশ হবার কিছুই নাই। অনেক বিজ্ঞ প্রফেসরের পেপার এভাবে রিজেক্ট হতে দেখা যায়। Bornmanm & Daniel (1993), Liesegang et al. (2007), Ray et al. (2000) এবং আরো অনেক গবেষক স্ট্যাটিসটিক্স ঘেটে দেখেছেন, ৫০% এর বেশি রিজেক্টেড পেপার পরবর্তীতে অন্যকোন কম ইম্প্যাক্টের জার্নালে ঠিকই পাব্লিশ হয়ে যাচ্ছে। সুত্রাং লেগে থাকতে হবে। একটি রিজেকশন আসলে, কমেন্টগুলো পড়ে পেপারটাকে আবার শুধরে নিয়া অন্য জার্নালে দিতে হবে।

৩) আপনার পেপারের রেফারেন্সগুলার স্টাইল সঠিক নাই। লাইন নাম্বার দেন নাই। অমুক ফিগারের ক্যাপসন নাই। ফিগার আছে কিন্তু তার বর্ননা নাই। ফিগার বা চার্ট খুবই অস্পষ্ট। লেখা বেশি বড় হয়ে গেছে, ইত্যাদি।
এই ভূলগুলান স্বাভাবিক। পেপার লেখা শেষ হলে, অনেকেই অতি উৎসাহে তাড়াহূড়া করে একটি জার্নালে সাবমিট করে ফেলেন। এই তাড়াহুড়ার কারনে জার্নালে “অথার গাইডলাইন” পড়ে পেপারটিকে ফরম্যাট করতে ভুলে যান। যারা প্রথমবার কোথাও সাবমিট করছেন, তাদের কমপক্ষে ২ দিন সময় দিয়ে ধীরে সুস্থে সাবমিট করা উচিত। তাহলে সহজেই এই ভূলগুল এড়ানো যায়।
৪) আপনার ইংরাজির অবস্থা ভালো না। উন্নত একাডেমিক ইংলিশ লেখেন।
এইটা এশিয়ান অথার দেখলেই এডিটরদের কমন বরাদ্দের কমেন্ট। মোটেও ভয় পাবেন না। আপনার জিয়ারি ১৪০০ থাকলেওও এই কমেন্ট হজম করতে হবে, কারন আপনার নামের মধ্যে এশিয়ান গন্ধ আছে। যাহোক, এই সমস্যা মেটাতে আপনার বন্ধু/কলিগকে পেপারটি পড়তে দিন। পাঠকের চোখে অনেক ভুল ধরা পরে যা লেখকের চোখ এড়িয়ে যায়। এছাড়া অনেক ইংলিশ এডিটীং সাইট আছে। Elsevier নিজের একটি সার্ভিস খুলেছে Elsevier English LanguageEditing Service। প্রায় প্রতিটি পাব্লিশারের এমন সার্ভিস আছে। পেপার আপ্লোড করে দিয়ে ক্রেডিট কার্ডে ডলার ছাড়ুন- এডিট করে দিবে ২/৩ দিনে। তবে চার্জ অনেক।

দ্বিতীয় ধাপঃ রিভিউয়ার

প্রথম ধাপে ছাড়া পেলে আপনার পেপারটি দ্বিতীয় ধাপে রিভিউতে যাবে। পেপার লিখার পরের একট লম্বা সময় যাবে রিভিয়ারের কমেন্টের প্রতিক্ষায় । সময়টা জার্নালভেদে বিভিন্ন হতে পারে। আবার এমন হতে পারে, আপনার লেখা পেপারটি যেসব রিভিউয়ারের কাছে পাঠানো হয়েছে তারা সময় করে কমেন্ট দিতে পারছেন না…তাই আটকে আছে। এরপরে দুই/তিন রাউন্ড রিভিউ ও তার উত্তর চালাচালির পরে হয়ত আপনার পেপার এক্সেপ্ট হবে…বা রিজেক্ট। তবে কিছুক্ষেত্রে সরাসরি এক্সেপ্টেড হতে পারে।

পিয়ার-রিভিউড জার্নালে রিভিউয়ার নির্বাচনে আপনার কোন হাত নাই। কিছু ক্ষেত্রে রিভিয়ারের নাম চাইতে পারে পাঠকের কাছে কিন্তু জার্নালের এডিটর সাহেব নিজের ইচ্ছা মত দুই/তিন জন রিভিউয়ার সিলেক্ট করবেন। সমস্যা হচ্ছে, রিভিউয়াররা নানান কিসিমের হয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যস্ত প্রফেসররা নিজে রিভিউ না করে প্রিয় পোস্টগ্রাজুয়েটের কাছে দিয়ে দেন, রিভিউ করে দেবার জন্য। আবার অনেক ক্ষেত্রে এডিটর নিজেই আরেকজন মাস্টার্স বা পিএইচডি ছাত্রকে রিভিউ করার আমন্ত্রন জানান। অনেক ক্ষেত্রে আপনার রিজিওনের একজনকে রিভিউয়ার নির্বাচন করতে পারে।

কিছু রিভিউয়ার সামান্য ৩/৪ লাইন লিখে ক্ষান্ত দেন, এরা বেশ শান্তি প্রিয় রিভিউয়ার। তবে কমেন্ট যত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হোক, আপনাকে তার জবাব দিতে হবে খুবি মোলায়েম ভাষায়।

আবার অনেকে আছে বিশাল দুই তিন প্যারাগ্রাফ লিখে আপনার ধৈর্যবিচ্যুতি ঘটিয়ে একটি খুব সাধারন প্রশ্ন করেন। কয়েক পাতা রিভিউ কমেন্ট মোকাবেলা করতে হতে পারে। দমে যাবেন না। উত্তর দেবার বেলায় আপনি একইভাবে বিশাল গল্প ফেদে বসবেন না। উত্তর হবে সংক্ষিপ্ত, বর্ননামূলক ও সম্পূর্ন প্রাসঙ্গিক।

কমেন্ট দেবার পাশাপাশি রিভিউয়াররা একটি কাজ করে থাকেন। তা হলো পেপারটি কি পাব্লিশ করার উপযুক্ত কিনা তা নির্ধারন করা। এক্ষেত্রে তাদের জবাব ৪ ধরণের হতে পারে।

ক। এক্সেপ্টড
খ। এক্সেপ্টড উইথ মাইনর কারেকশন (এর মানে সামান্য ঘষামাজার পরে পাব্লিশ করা যাবে)
গ। এক্সেপ্টড উইথ মেজর কারেকশন (এরমানে ব্যাপক পরিমার্জন-পরিবর্তন- পরিবর্ধন করতে হবে, মন মতো না হলে বাতিল)
ঘ। রিজেক্টেড বা বাতিল।

তিন/দুইজন রিভিঊয়ারের ভোটের গড় করে মূল সিদ্ধান্তটি এডিটর নিয়ে থাকেন। যেমন তিন জনের ২ জন যদি মাইনর কারেকশন দেন, আর একজন এক্সেপ্টেড দেন -তাহলে সিদ্ধান্ত আসবে মাইনর কারেকশন। আবার একজন মাইনর কারেকশন আর দুইজন মেজর কারেকশন দিলে আপনার মেজর কারেকশন পাবার সম্ভাভাবনা বেশি।

বাতিল হলে আপনার করার কিছুই নাই। ২ সপ্তাহ পরে পেপারটি নিয়া আবার বসেন। কমেন্টগুলা পড়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করে, আরেকটি জার্নালে পাঠিয়ে দিন। আর যদি এক্সেপ্টেড হয় তাহলে কিছুই করনীয় নাই, এডিটর সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইমেইল করুন। কো-অথারদের নিয়ে কাচ্চি খেতে যান।

যদি মাইনর কারেকশন পান, তাহলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করুন। বিনা হাঙ্গামায়, কোন তর্কে না গিয়ে নামে নামে কমেন্টগুলোর জবাব দিয়ে দ্রুত পাঠিয়ে দিন।

আসল সমস্যা মেজর কারকশনে। অনেকে কমেন্ট সহ্য করতে না পেরে পেপার উইথড্র করে অন্য জার্নালে দেন। এইটি একটি ভূল সিদ্ধান্ত। বুঝতে হবে, নুতুন সাবমিশন করলে আরো বেশি সময় যাবে। কারন সেক্ষেত্রে আবার প্রথম ধাপ থেকে রিভিউ শুরু হবে। তাই সময় নিয়ে (১- ২ মাস) হলেও কমেন্টগুলোর জবাব দেয়া উচিত।

* কমেন্টের জবাব একটি আলাদা ফাইলে জমা দিতে হয়। এটাকে বলে “রেস্পন্স লিস্ট”।
* প্রতিটি কমেন্টের সাথে আলাদা রঙ দিয়ে পরিস্কার করে একটি জবাব দিন। জবাবের সাপোর্টে সূত্র, রেফারেন্স দিতে পারেন। ছবিও দিতে পারেন।
* প্রতিটি উত্তর হতে হবে খুবই নম্র ভাষায়। ভূলেও রিভিয়ারকে আক্রমন করবেন না। রিভিয়ারের পয়েন্ট ভূল হতে পারে, তারাও মানুষ। তাড়াহুড়ায় তারা আপনার পেপার পুরোটা না পড়েই কমেন্ট করতে পারেন, যা কিনা আপনি পেপারে ব্যাখ্যা করেছেন। “We totally disagree”, “For your information”, “Please go through the book bla, page no 16”- এই রকম কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন। সবক্ষেত্রে রিভিউয়ারের যুক্তি মেনে নিতে হবে এমন কথা নাই। তবে পালটা যুক্তি খুব জুতসই ভাষায় দিতে হবে।
* প্রত্যেক কমেন্টেই রিভিউয়ারের সবগুলো আঙ্গিক বুঝতে হবে এবং প্রতিটি আঙ্গিকেই উত্তর দিতে হবে। আংশিক উত্তর দেয়া পরিহার করতে হবে।
* ক্ষেত্র বুঝে রিভিউয়ারকে সামান্য তেল দিন। এর বিকল্প নাই।
* জ্ঞানী রিভিউয়ার সম্পূর্ণ নূতন বিষয় বা আঙ্গিকের অবতারনা করতে পারেন। এবং প্রশ্ন দিতে পারেন, কেন এই আলোকে পেপারে কিছু লেখা হয় নাই। হয়তো উক্ত বিষয়ে রিভিউয়ারের জ্ঞান অগাধ। তাই সে আপনাকে গভীর জলে টেনে নিতে চাইবে। এমতাবস্থায়, সাইড দেয়াই সমীচীন। “The reviewer have pointed out a very unique research aspect. But unfortunately current research article is focused in KKK only. We hope to shade more light in future research endeavor.”

* অনেক রিভিউয়ার একদম আনাড়ি কমেন্ট করতে পারেন। বা কনফ্লিক্টীং কমেন্ট দিতে পারেন। ধরেন, প্রথম কমেন্টে একটি জিনিস কেন যুক্ত করেন নি সেটি বললেন। আবার পঞ্চম কমেন্টে একই জিনিস কেন যুক্ত করেছি তা জানতে চাইলেন। অনেকক্ষেত্রে একই পেপার ২ মাস পরে দ্বিতীয়বার রিভিউ করার সময়, একই কমেন্ট দুবার করে ফেলতে পারেন। কারন প্রথম বার কি কমেন্ট করেছিলেন উনি, সেটা ভূলে বসা স্বাভাবিক। এসবক্ষেত্রে নম্রতা বজায় রেখে জবাব দিন। আর সরাসরি এডিটরের কানে ব্যাপারটি তুলুন।

রিভিউয়ায়দের যেসব বিষয়ে নজর রাখতে বলা হয়, সেগুলা নিচে দিলাম। আশা করি এ থেকে পাঠক কোন কোন বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, তা বুঝতে পারবেন
1. Does the subject fall within the general scope of the journal?
Is the topic of the manuscript appropriate for the Journal?
2.Is this a new and original contribution?
3.Is the information of significant interest to the readers?
4.Is the title accurate and sufficiently descriptive of the content?
5.Is the abstract sufficiently informative, especially when read in isolation?
6.Are appropriate keywords given? Are the statistical methods used correct and adequate?
7.Is the organisation of the article satisfactory?
8.Does the content justify the length?
9.Are the methods appropriate and scientifically sound?
10.Are the conclusions supported by the data presented?
11. Are the tables and figures well designed and add to understanding of the text?
12.Is information in the tables and figures redundant?.
13. Are the references cited the most appropriate to support the manuscript?
14.Should the manuscript be shortened?

এতকিছু শিখে-বুঝে এবং বছর ব্যাপি গবেষনা করেও আপনি ভয়াবহ রিভিউ কমেন্ট পেতে পারেন। “আমি এমন খারাপ আর্টিকেল জীবনে রিভিউ করি নাই”, ” লেখকদের আবারো স্কুলে গিয়ে পড়া উচিত”, “বিজ্ঞানের কোন শাখাতেই এই ধরনের কোন পেপার পাব্লিশ করা সম্ভব না”। অভদ্র রিভিউয়ারের পাল্লায় পড়লে নিজেকে দূর্ভাগা ভাবুন। পেপার ইউথড্র করে এডিটরকে জানান আপনার অনুভূতির কথা। এবং অন্য একটি জার্নালে সাবমিট করুন। হ্যাপী পাব্লিশিং!

 

মাকসুদুল হক