গত বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি দেশ ছেড়ে পা রাখি জার্মানিতে। একে তো দেশ কে মিস করি, সেই সাথে এক বছর হয়ে গেল প্রবাস জীবনের। বিদেশের মাটিতে বসে একুশে ফেব্রুয়ারির উদযাপন কিভাবে করা যায় ভাবতে ভাবতেই শুনলাম গুটি কয়েকজন মিলে উদযাপন করবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ঘরে বসে দেশীয় সংস্কৃতির আমেজ পাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে যোগ দেই সেই আয়োজনে।

বলছি গত চব্বিশে ফেব্রুয়ারির কথা। মিউনিখে ঘরোয়া পরিবেশে ছুটির দিনে আয়োজন করা হয়েছিল ভাষা শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন অনুষ্ঠান। তিন ঘণ্টার এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নতুন প্রজন্মের মাঝে একুশের চেতনা ছড়িয়ে দেয়া। অনুষ্ঠানের চালিকাশক্তি বেলি আপু পুরো অনুষ্ঠানটাই কথা, কবিতা, উপস্থাপনায় এত সুন্দর করে চালিয়ে গেছেন যে বাচ্চারাও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ছিল পুরোটা সময়। পুরো অনুষ্ঠানকে তিনি ভাগ করেছিলেন তিনটি পর্বে। প্রথম পর্বে ছিল গল্পের ছলে দেশ ভাগের ইতিহাস, ভাষার জন্য সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের ইতিহাস। এ যেন রূপকথার গল্প- যেখানে রাক্ষস আছে, অনেক গুলো রাজার কুমার আছে। শত্রুপক্ষের হাত থেকে ভাষা উদ্ধারের জন্য নিজেদের প্রানভ্রমর বিকিয়ে দিয়েছিল এই রাজার কুমাররা। ছোট ছোট বাচ্চারা গল্প থেকে জেনেছে শহীদমিনার কি, ভাষা শহীদ কাদের বলে। এখন তারা অকপটে বলে দিতে পারে সালাম, বরকতসহ আরও অনেক রাজার কুমার কিংবা ভাষা শহীদদের নাম। অল্প সময়ে একটা গল্প কে মাথায় ধারণ করে সেটাকে ছবির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা চাট্টিখানি কথা না। এই কঠিন কাজটাই বাচ্চারা করেছে চমৎকারভাবে।

দ্বিতীয় পর্বের আয়োজনে ছিল দেশাত্মবোধক গান আর কবিতা। এ পর্বেও বাচ্চাদের উপস্থিতি প্রশংসার দাবীদার।

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়, আবার আসিবো ফিরে, আমি বাংলায় গান গাই কি ছিলোনা এই পর্বে! আয়োজনকে সর্বাত্মক সফল করতে বাদ্যযন্ত্রেরও কমতি ছিলনা। ছিল হারমোনিয়াম, পিয়ানো, তবলা এমনকি কাহনের ব্যবহার।

শেষ পর্বে ছিল শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি, বাচ্চাদের ছবি আঁকার পুরষ্কার প্রদান, খাওয়া দাওয়া আর ছবি তোলার আয়োজন।

হাসি, গানে, গল্পে আর কবিতায় অসাধারণ একটা দিন ছিল মিউনিখ-বাসীর। মাঝে একটা ভিন্নধর্মী প্রশ্নোত্তর পর্বের প্রশ্ন ছিল টেবিল, রেসিপি, প্রফেশনাল এসব শব্দের বাংলা অর্থ আর শুদ্ধ বাংলায় বাইন মাছের রন্ধনপ্রণালী বর্ণনা।

আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের সন্তানেরা বিদেশের মাটিতে থেকেও শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে শিখবে। ইংরেজি, জার্মান কিংবা স্প্যানিশ ভাষার চাপে ভুলে যাবেনা মায়ের ভাষা, কথা বলবে না ইংরেজি/বাংলার মিশ্র বা জগাখিচুড়ি ভাষায়। যে বৈচিত্র্যময় ভাষাকে ভালোবেসে নিজের জীবন দিয়ে ভাষাকে অমরত্ব দান করলো ভাষা শহীদরা, সেই মধুর ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার, লালন করার দায়িত্ব তো তাদের উপরেই বর্তাবে। তারা দেশকে ভালবাসতে শিখুক, বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, কোন এক ভাষা সৈনিকের উত্তরসূরি হিসেবে গ্রীবা উঁচু করে বাঁচতে শিখুক, তারা জানুক একুশ মানে গর্ব, একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশের আছে স্বকীয় কিছু রঙ। তারা অবশ্য একুশের রঙকে পোশাকে ধারণ করতে ভুল করেনি।

এত সুন্দর একটা আয়োজনের পর প্রত্যাশা অনেকটাই বেড়ে যায় আগামী বছর এই আয়োজন বিশাল পরিসরে দেখার জন্য আর সবশেষে একটা ধন্যবাদ দলের সবাইকে – বিশেষ করে তুষার ভাই দম্পতি এবং ফাহিম ভাই দম্পতি কে দিতেই হয়। 🙂