সম্ভবত ২০১৭ এর জানুয়ারীর শুরুতে কোন এক সন্ধ্যার কনকনে শীতে ব্রেমেনে গেলাম বেড়াতে। রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে শুভদা আর হাসনাইন ভাই সুজনের কথা আমাকে বলল। প্রথম জানলাম বাংলাদেশের একটি ছেলে, যে আমার আরও অনেকের মত বড় একটি স্বপ্ন নিয়ে এই জার্মানিতে এসেছিল, অথচ নিয়তির কর্কশ পরিহাসে সে মরণব্যাধীতে আক্রান্ত হয়ে ডাক্তারের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে বেঁচে থাকার আশায়। সময় তখন এমনি নিদারুণ যে কিসের পড়ালেখা কিসেরই বা স্বপ্ন, বেঁচে থাকার প্রাণান্ত প্রচেষ্টাই তখন প্রধানতম। যে দুর্ভাগ্য সাথে করে সুজন বিদেশ বিভূঁইয়ে এসেছিল, ফেব্রুয়ারীর তারিখ শনিবার ভোর বেলায় সে দুর্ভাগ্য সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত হয়ে জনমের তরে দেখা করে গেছে। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া তিক্ত মধুর ঘটনা শোনাতে এসেছি এই লেখায়।

৩রা ফেব্রুয়ারীর সন্ধ্যা থেকেই ব্রেমেনের হাসনাইন আর রানা ভাইয়ের সাথে আলাপ হচ্ছে। ততক্ষণে সুজন হসপিটালে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। যেকোন সময় নিভে যাবে প্রাণপ্রদীপ। ব্রেমেনের সবার মধ্যে শোকচিন্তার চেয়েও বড় চিন্তা এই লাশ কীভাবে দেশে পাঠাবে। কঠিন বাস্তবতার সামনে বেদনা বেমানান। বিপুল অর্থের এই কারবার তাদের সবাইকে অস্থির করে তুলেছিল। রানা ভাই আমাকে জানালো ব্রেমেন থেকে এখন অব্দি ১২০ ইউরো সংগৃহীত হয়েছে। হাসনাইন ভাই আমাকে প্রস্তাবনা করলেন বিসাগের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অর্থ সংস্থান করা যায় কিনা। আমি আশ্বাস দিয়ে তানজিয়া আপু, আনিস সবার সাথে আলাপ করতে বসলাম। রাসেল ভাই, দেবযানীদি তখন জার্মানির বাইরে।

আমরা কখনো এই গ্রুপ থেকে কারো জন্য অর্থ সহায়তা চাইনি। তাই প্রথমে আমরা গড়রাজি। আরও একটা কারণ হল, বহুদিন পূর্বে ব্রেমেনের ফেসবুক গ্রুপে জার্মান প্রবাসের ম্যাগাজিনের পোষ্ট দেওয়ায় কেউ একজন অত্যন্ত কটু ভাষায় আমাদের আক্রমণ করেছিল কেন এমন মূলহীন অখাদ্য ম্যাগাজিন গ্রুপে পোষ্ট করি। সেদিন থেকে কখনো সেই গ্রুপে ম্যাগাজিন পাবলিশ করিনি সত্য, কিন্তু হৃদয়ের আঘাত তখনো দগদগে। কিন্তু কঠিন বিপদের দিনে এইরূপ অনুরাগ বড় করে দেখা হৃদয়হীন মানুষের কাজ, তাজনিয়া আপু বললেন পোষ্ট রেডি করতে। মৃত্যুর কয়েকঘন্টা আগে লিখলাম সুজন মারা যাবে, আমাদের সবার সহায়তা দরকার। এখানে সেই লিংকঃ http://www.germanprobashe.com/archives/14098

এরপর থেকেই ঘটতে থাকল অসামান্য ঘটনাগুলো। আমাদের কেউ চেনে না জানে না অথচ পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্ত থেকে ফোন করে মেসেজ দিয়ে সুজনের খোঁজ করতে থাকল বাংলাদেশের মানুষ। তারা প্রমাণ করলো তাঁদের হৃদয় পৃথিবীর যেকোন দেশের মানুষের চাইতে আকারে অনেক বড়। এমন অবাক করা ঘটনা ঘটবে আমাদের কল্পনায় তা ছিল না। বিদেশে থাকা প্রতিটি মানুষ সুজনের স্থানে নিজেকে কল্পনা করেছে, আমার আপনার এমন কিছু হলে প্রবাসের এই মানুষগুলোই এগিয়ে আসবে এমন করে ভেবেছে, তাই যার যা সামর্থ তার তাই নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। শনি রবিবার সব বন্ধ থাকায় আমরা বুঝে উঠতে পারছিলাম কত টাকা জমা হচ্ছে। সোমবার দিনও টাকা খুব কম কিন্তু শত শত মানুষের অস্থিরতা দেখে বুঝে গেলাম আমাদের আর চিন্তা নেই। তাই পূর্ণ অর্থ সংগৃহীত না হওয়া স্বত্বেও মানুষের ভালবাসার উপর ভর করে সেদিনই আমরা আর টাকা পাঠাতে বারণ করলাম। হাসনাইন, রানা, আরিফ, হিমেল, মুস্তাফিজ, আতিফ ভাইসহ ব্রেমেনের অনেকেই নিজের কাজ ফেলে কাগজপত্র যোগাড়যন্ত্র শুরু করলো। মনে আছে, পরিদন অনেকের এক্সাম ছিল, বিশেষ করে হাসনাইন ভাইয়ের। লাশ কিভাবে কম খরচে দেশে পাঠানো যায় তানজিয়া আপু সেদিকটা খোঁজ নিচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকে শুভদা, মানহাইমের আসিফ ভাই, ডুইসবুর্গের মাহিন ভাই, ফ্রাঙ্কফুর্টের আরিফ ভাইসহ নাম না জানা বহু মানুষ যে আকুলতা দেখিয়েছেন সেকথা কোনদিন ভোলা সম্ভব নয়। ফ্রান্স থেকে এক নতুন ছাত্র কাঁদতে কাঁদতে ফোন করেছে, কিভাবে টাকা ট্রান্সফার করতে হয় সে জানে না কারণ সে নতুন এসেছে। এমতাবস্থায় সুজনের লাশ যখন হাসপাতালে একা, সবার অলক্ষ্যে ব্রেমেনের কতিপয় অদূরদর্শী কাঁচাবুদ্ধির মানুষের পেয়ে বসলো খ্যাতিলাভের লোভ!

হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া আমাদের যতখানি অবাক করেছে তার থেকেও দ্বিগুণ অবাক করে দিয়ে ব্রেমেন থেকে কয়েকজন আমাকে এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিলেন। প্রতিমুহুর্তে সুজনের আপডেট আমি আমাদের সাইট গ্রুপ থেকে প্রকাশ করছিলাম, তাদের দাবি হল সেই আপডেটের পোস্টে ব্রেমেনবাসী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ফেসবুক পেইজের লিঙ্ক বসিয়ে দিতে হবে (যাতে করে লাইক বাড়ে)!! অনেক কাচু মাচু করে একজন বলেই বসল, জার্মান প্রবাসের তো একাই অনেক নাম কাম হচ্ছে, তাদেরও তো অনেক অবদান, তাদেরও নাম হবে না কেন! এমনতর প্রস্তাব পেয়ে অবাক হব না হাসব বুঝে উঠার আগেই ব্রেমেনের সেই পেইজে গিয়ে দেখলাম সেখানে সর্বশেষ পোষ্ট করা হয়েছে ডিসেম্বর ১৪, ২০১৬ তে, সুজনের মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আগে। বন্ধু মারা গেছে, তাঁর লাশ পাঠানো নিয়ে কতকিছু এখনো বাকি, সেই গুরুতর সময়ে এহেন আহাম্মকী প্রস্তাব যারা দিল তাঁদের আমি বললাম, সুজন মারা গেছে আজ দুদিন হল, আপনাদের পেইজে এখনো কোন পোষ্ট নাই, আজ হঠাৎ করে যদি বলি আপডেটের জন্য এখানে চোখ রাখুন সেটা কতখানি হাস্যকর হবে? এরপর তারা থামল। ভাঙ্গা আয়নায় চোখ দেখা যায় না, চোখ কচকচ করে। সেটি তারা ক্ষণিকের জন্য ভুলে গিয়েছিল।

স্রোতের মত টাকা আসছে, আসছে মানুষের ফোন। প্রয়োজনের চেয়েও প্রায় চারগুণ বেশি টাকা জমা হল। ব্রেমেনের কেউ কেউ ভাবল এই অর্থের উপর তাঁদেরসামষ্টিকঅধিকার আছে, তাই তারা একটি ফান্ড করতে চায় যাতে ভবিষ্যতে কারো সুজনের মত কিছু হলে এই টাকা কাজে লাগে। কিন্তু মানুষ কি ব্রেমেনের কথায় টাকা দিয়েছে নাকি জার্মান প্রবাসের আহ্ববানে টাকা দিয়েছে এই হিতাহিত জ্ঞানের পরিচয় তারা অনেকেই দিল না। কথা সেটি নয়, কথা হল, ফান্ড হলে ব্রেমেনবাসী কেন, জার্মান প্রবাসে করবে এবং এটিই ডোনারদের কাছে যৌক্তিক বলে বিবেচিত হবে। এছাড়া জার্মানির জটিল আইনানুযায়ী এমন অনুদানের অর্থ রাখতে পারে শুধুমাত্র রেজিস্ট্রিকৃত সংগঠন। জার্মান প্রবাসে ওই সময় রেজিস্ট্রেশন করার জন্য কাগজপত্র অনেক আগে থেকেই গুছিয়ে এনেছিল। তাই আমরা প্রস্তাব দিলাম, ফান্ড হলে জার্মান প্রবাসের অধীনেই হওয়া উচিত। ব্রেমেনবাসী চুপ। এরপর আমরা বললাম, ফান্ড হতে হলে মানুষের মতামত নেওয়া উচিত, কারণ মানুষ টাকা পাঠিয়েছে। ব্রেমেনবাসী এবারো চুপ। এরপর গ্রুপে আমরা মানুষের ভোট চাইলাম। ফান্ডের পক্ষে ২৭২, বিপক্ষে পড়লো ৪৮ ভোট। এবার ব্রেমেনবাসীর মুখে রা শোনা গেল। তারা এমনভাবে ফান্ডের বিপক্ষে লেগে গেল যে ফান্ড করা একটা অপরাধ। যে ফান্ডের কথা তারা তুলল, কর্তৃত্ব থাকবে না বিধায় তারা আবার সেটির বিরোধিতা করলো।

বহুজনের সহায়তায় সুজনের লাশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে পাঠানো গেল, কিন্তু আমাদের স্বস্তি নেই। কারণ আমাদের হাতে তখন প্রায় একুশ হাজার ইউরো। সব খরচ মিটিয়ে বাকি টাকা পরিবারের কাছে ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া এক কঠিন প্রক্রিয়া। একে আমরা আরও সিরিয়াসলি নিলাম যখন দেখলাম সুজনের ভাইয়েরা অর্থ হাতে পাওয়ার জন্য পাগলপ্রায়। প্রায় প্রতিদিন তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে করতে অস্থির করে তুলল। আমরা দেখলাম মায়ের নামে ফিক্সড ডিপোজিট করা না হলে এই অর্থ সুজনের পরিবারের অনেকের দ্বারা বেহাত হতে পারে। বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে অবশেষে গেল অক্টোবরে মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের উপস্থিতিতে সবকিছু সুজনের পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হয়। এই সুকঠিন কাজে তানজিয়া আপু যে সময় ব্যয় করেছেন, হাসনাইন ভাই পরিশ্রম করেছে তা তুলনাহীন। এখানে সেই লিংকঃ http://www.germanprobashe.com/archives/15393
এছাড়া হিসাবের বিস্তারিত নিয়ে পরবর্তীতে আরও লেখা
আসবে।

ভ্রান্তি
স্বাভাবিক, সেই ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সমগ্র কাজে আমরা আয়োজকরা যে ভুল করেছি তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রচেষ্টা আমাদের থাকবে। ভবিষ্যতে সুজনের মত এমন দুর্ভাগ্য কারো হবে না এটি নিশ্চিত নয়, কাম্য তো নয়ই। তবু যেকোন পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশীরা একযোগে একসাথে কাজ করতে দ্বিধা করেনা সে প্রমাণ আমরা পেয়েছি। সেই প্রমাণের কারণ বার বার ঘটুক তা প্রত্যাশিত নয়, কিন্তু তার জন্য সর্বদা আমরা যেন প্রস্তুত থাকি।

ভেবেছিলাম এই এক বছরের মাথায় সুজনের মাকে একবার ফোন দিব। বুকের পাঁজরে অসুন্দরের বজ্রাঘাত ঠেকিয়ে সে কি আজও সুজনের আশায় পথ চেয়ে বসে থাকে? বড়ই জানতে ইচ্ছে করে। বিপন্নউদ্বাস্তূ মানুষেরও আশা থাকে, এই মায়ের কী আছে? হায় জীবন এত ছোট কেনে!