অনেকদিন যাবত লিখবো ভাবছিলাম, কিন্তু একদম ই সময় করে উঠতে পারিনি, রান্না শেখা, ক্লাস করা, পড়াশোনা, সব মিলিয়ে হুলস্থুল ব্যপার…অবশেষে লিখতে পারছি এতেই আমি সন্তুস্ট…

আমার মনে পড়ে, কোনো এক সময় জার্মান প্রবাসের কোন এক আর্টিক্যাল পড়েছিলাম যে বিদেশে যাবার পর অনেকে দৌড়ে আসে আর জিজ্ঞেস করে ইন্ডিয়ান নাকি পাকিস্তানী… এবং এটাও মনে আছে ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানী মানুষজন জিজ্ঞেস করে হিন্দি বা উর্দু জানে কি না…তখন লেখক একটা কথা স্পস্ট বলেছিলেন “তারা কি আমার দেশের ভাষা জানে? তাহলে আমি কেনো তাদের সাথে হিন্দিতে কথা বলবো?”

 

দেশের বাইরে এসেছি ১ মাস পূর্ন হলো… এখানে আসার পর ভালো মন্দ দুই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে… মানুষ নিজের স্বার্থে কিভাবে ব্যবহার করে তা জানতে পারছি, এখানে সব ই কেমন জানি স্বার্থ.. তবে আমার মতে এক কালে ভারতবর্ষ যে অঞ্চল গুলো নিয়ে গঠিত হয়েছিলো, সেই অঞ্চলের মানুষের মাঝে খারাপ দিক গুলো বেশি দেখা যায়, যেখানে ইউরোপীয়ান মানুষ জন যথেস্ট আন্তরিক… তবে তারা সাহায্য করেই যাবে এমন নয়…এখানে সবাইকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট হতে হয়… নিজের কাজ নিজেকে ভালো ভাবে করতে জানতে হয়…

 

যাইহোক, আসি মূল কথায়… আমার সাথে কিছু পাকিস্তানী, ভারতীয় এবং নেপালি আছে… আমাদের অনেকেই দেখি খুব আগ্রহ নিয়ে তাদের সাথে হিন্দি বা উর্দু তে কথা বলে… এমন অবস্থা যে খুব কম ইংলিশ বলে… ক্যায়া হ্যায়, কাহা জানা হ্যায় এসব বলাতে আমাদের দেশের মানুষ অভিজ্ঞ এবং খুব আগ্রহী হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হিন্দি বলে…

 

আমি প্রথম থেকেই বলে এসেছি যে আমি হিন্দি জানি না… মানছি, আমাদের দেশের প্রায় সবাই হিন্দি জানে…এখন ইন্ডিয়ান সিনেমা বা টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য হিন্দি বুঝতে পারা কোনো সমস্যা ই না…  কিন্তু আমাকে কেনো বলতে হবে আমি হিন্দি জানি… আমার দেশের ভাষা কি ওরা জানে? আমার সাথে দুজন নেপালি ছেলে আছে, আমরা একই প্রোগ্রামে পড়ি…এদের মাঝে এক নেপালি ছেলে খুব ভালো বাংলা বলতে পারে… কারন তার মা বাবা কলকাতার মানুষ… অথচ সেই ছেলে ইংলিশ এবং নেপালি বলে, কিন্তু আমার সাথে বাংলা বলতে তার রাজ্যের বিরক্তি… নিজে থেকে কথা বলবে না, কিন্তু জিজ্ঞেস করলে বাংলা বলবে…সবসময় গম্ভীর মুখ দেখে আসা এই ছেলেকে ঠিক ই আমি অন্যদের সাথে হাসি মুখে ইংলিশ বা নেপালি বলতে দেখি…এমন কি সেই ছেলে হিন্দি এবং উর্দু ও জানে, কারন সে ব্যাচেলর ডিগ্রি ইন্ডিয়াতে কমপ্লিট করেছে…সে যতটা খুশি মনে হিন্দি উর্দু বলে, বাংলা সে বলে ই না…অথচ সে বাসায় যখন ফোন করে বাংলা তে কথা বলে তার মা বাবার সাথে…তার বাসার কথ্য ভাষা বাংলা…আর আমাকে বলেছিলো সে বাংলা তেমন ভালো পারে না.. অথচ কোন এক সময় আমার পাসপোর্ট দেখতে যেয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত সে খুব ফ্লুয়েন্টলি পড়ছিলো…তখন আমি অবাক হয়েছিলাম…

 

এখানে বিরিয়ানি, রুটি, ডাল এসব কিছুই ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানী খাবার বলে জানে… অথচ সত্যিই কি এসব ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানী খাবার? বাংলাদেশী খাবার নয় কি? কেউ এটা নিয়ে কিছু বলে না… ফলস্বরুপ আমার দেশ এর নাম কেউ জানেই না…

 

আমার এখনো মনে আছে, প্রথমদিন যখন চাইনিজ এক ছেলে কে বাংলাদেশ এর নাম বলেছিলাম, সে আকাশ থেকে পড়েছিলো, আর ভাবছিলো এটা আবার কোন দেশ… তাকে তখন ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ এর ইতিহাস শোনাতে হয়েছিলো… সে পাকিস্তান বা ভারত এর নাম শুনেছে, কিন্তু বাংলাদেশ এর নাম শুনে নি… যে অনুষ্ঠানে সেই ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছিলো, সেই ছেলে অনুষ্ঠান শেষ করে বাইরে বের হয়ে তার আরো কিছু চাইনিজ বন্ধুর সাথে দেখা করেছিলো এবং আমাকে দেখিয়ে বলেছিলো আমি বাংলাদেশ থেকে এবং এই দেশ সম্পর্কে তার বন্ধুরা কিছু জানে  কি না…

 

যাইহোক, গতকাল গেলাম ব্যাংকে, সেখানে গিয়েছিলো আরো কয়েকজন পাকিস্তানি… তাদের মাঝে একজন  এক বাংলাদেশী কে বলছে আমার ব্যপারেঃ “হামারা কুছ দোস্ত হ্যায় বাংলাদেশী, ও লোগ হিন্দি অউর উর্দু বহত আচ্ছি তারিক্যাসে বলতে হ্যায়, তো ইসকো ক্যায়সে নেহি আতা”… ওরা ধরনা ই করে রেখেছে যে আমরা হিন্দি জানি, বরং আমি জানি না শুনে ওরা অবাক হয়… তাছাড়া আমি নিজে বিভাগীয় শহরে বড় হই নি, আর এই খবর কোন এক মাধ্যমে পাকিস্তানীদের কাছে চলে যায়… আর তাদের হাবভাব এ আমি বুঝতে পারি যে তারা ধারনা করছে আমি ছোট শহরে বড় হয়েছি বলেই হিন্দি জানি না, বড় শহরে বড় হলে জানতাম…

 

আমি সেই পাকিস্তানী ছেলের কথা শুনে মনে মনে শুধু হেসেছি, তবে রাগ লেগেছে এই কারনে, শুধুমাত্র আমাদের দেশের কিছু মানুষ এর জন্য ইন্ডিয়া বা পাকিস্তানীরা ধারনা করে বসে যে বাংলাদেশী মানেই হিন্দি বা উর্দু জানবে… কেনো? তারা কি আমার দেশ এর ভাষা জানে? আমার সাথে আমার ভাষায় কথা বলে? আমার ভাষার প্রতি কোনো আগ্রহ দেখায়? কখনো না… হিন্দি, উর্দু, বাংলা ভাষার শব্দ গুলো একে অন্যের সাথে মিলে যায়, কিন্তু আজ পর্যন্ত আমি ওদের একবারের জন্য বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ দেখি নি…কেনো ই বা দেখবো, কারন আমরা ই তো আগ্রহ নিয়ে তাদের সাথে হিন্দিতে কথা বলি…গর্ব নিয়ে কথা বলি… এতে করে আমার ভাষার অনেক শব্দকে তারা হিন্দি বা উর্দু শব্দ বলে জানছে… মেক্সিকো, জর্ডান, ইরাক এসব জায়গার ছেলে গুলো হিন্দি শিখে যাচ্ছে…কিন্তু বাংলা একটা শব্দ ও শিখতে আগ্রহী না…

 

তবে ভালো খবর হলো, সেই চাইনিজ ছেলে এখন আমার খুব ভালো বন্ধুর মত হয়ে গেছে, একই হোস্টেলে থাকা ২ চাইনিজ এর সাথে আমি বাজারে যাই, তারা আমার এবং আমি তাদের মতামত কে শ্রদ্ধা করি…যখন বাইরে যায় আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি যাবো কি না…অথচ আমাদের দেশের কারো সাথে গেলে কে কার সাথে কি নিয়ে তর্ক আর মাতাব্বরি করতে পারবে তা নিয়েই ব্যস্ত থাকে… নিজের কাজ সবার আগে আধাঘন্টা এক ঘণ্টা লাগিয়ে শেষ করে অন্যদের কে ৫ মিনিট পর পর তাড়া দিবে যেন কাজ দ্রুত শেষ করে… অথচ সেই চাইনিজ ছেলেগুলো একে অন্যের প্রতি আন্তুরিক… যার যখন যেটা দরকার সেখানে যেয়ে একে অন্যকে সাহায্য করছে, এবং তারা গ্রুপ স্টাডি ও করে একসাথে… শুধু পারি না আমরা… কোনো কোনো বাংলাদেশীকে ক্লাস লেকচারের ব্যপারে কিছু জিজ্ঞেস করলে এমন ভাবে উত্তর দিবে যেটা শুনে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে সে বলতে চায় না, এড়িয়ে যেতে ইচ্ছুক…

আমার এখনো মনে আছে, ইরাস্মুস এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আশিক ভাই বলেছিলেন, আমি আমার দেশ কে বিদেশে রিপ্রেজেন্ট করছি… তাই আমাদের সেভাবেই চলতে হবে… আমি আমার দেশের সংস্কৃতি সেই চাইনিজ দের জানাচ্ছি, তারা কিছু বাংলা শব্দ শিখছে আমার কাছ থেকে… আমি আমাদের দেশের রান্না তাদের খাওয়াচ্ছি… যেন তারা আমার দেশ সম্পর্কে জানতে পারে… কারন তাদের দেখা প্রথম বাংলাদেশি মানুষ হলাম আমি… আমি চেস্টা করছি যেন তাদের এই সময়টুকু স্মরনীয় হয়ে থাকে…এবং যেন জানতে পারে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষ মহান…

 

বিঃদ্রঃ এখানে আমি শুধুমাত্র আমার মতামত তুলে ধরেছি, সবাই সমান নয় … কাজেই কারো মনে কস্ট লাগলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত…