প্রথমেই বলতে চাই আমি লেখক নই এবং লেখালেখির মত গুন আমার নেই…এটাই আমার লিখা প্রথম আর্টিক্যাল…আমি শুধু এখানে আমার অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু লিখার চেস্টা করেছি… তাই আমার ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন…আমার এই লিখা যদি কারো উপকারে আসে, তাহলেই আমার পরিশ্রম স্বার্থক হবে…

জার্মানীর সাথে আমার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই, তবুও আমি এখানে লিখছি, কারন আমার মনে হয়েছে আমাদের দেশের অনেকেই সঠিক ভাবে বাইরে এপ্লাই করার জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য জানে না…জার্মান প্রবাসে এমন একটা মাধ্যম যেখানে সকল প্রশ্নের উত্তর খুজে পাওয়া যায়…উচ্চশিক্ষার জন্য যত গুলো অনলাইন মাধ্যম আছে, সেগুলোর মাঝে সবচেয়ে সক্রিয় এবং তথ্যবহুল হলো এই মাধ্যম যার সাহায্যে সম্পূর্ন একা বিদেশে মাস্টার্স/পিএইচডি এর জন্য এপ্লাই করা যায়…  আর আমার মতে, এই ব্লগ শুধু জার্মানীর জন্য না, বিশ্বের যে কোনো দেশে এপ্লাই করার জন্য সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ন…আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি জার্মান প্রবাসের সকল এডমিন ভাই বোন দের প্রতি, যাদের নিঃস্বার্থ এবং অক্লান্ত পরিশ্রম এই মাধ্যমকে সুউচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে…সাহায্য পাচ্ছে আমাদের দেশের অসংখ্য মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী…

যাইহোক, আসল কথায় আসি… আমরা অনেক সময় বুঝে পাই না পড়া শেষ হলে কি করবো…চাকুরী করবো নাকি বাইরে যাবো উচ্চ শিক্ষার জন্য… সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে..আমার এই লেখা যেহেতু আপনারা পড়ছেন, আমি ধরে নিবো আপনাদের বাইরে পড়তে যাবার ইচ্ছে আছে…

যদি তাই থেকে থাকে, তাহলে আমি বলবো শুরু থেকেই মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে যেন ভালো একটা সিজিপিএ অর্জন করা যায়…তবে এটা মাথায় রাখতে হবে সিজিপিএ সব না, তবে অনেক গুরুত্বপুর্ন একটা অংশ…কারন সিজিপিএ এর উপর সবচেয়ে বেশি মার্ক বরাদ্দ থাকে…সাধারনত এডমিশন কমিটি ওভার অল প্যাকেজ দেখে…আর তাই এডমিশন এবং স্কলারশিপ এর জন্য সিজিপিএ এর সাথে মোটিভেশন লেটার, সিভি, পাবলিকেশন এসব ই গুরুত্বপূর্ন…

❒ জার্মান প্রবাসে আড্ডা দিতে চাইলে যোগ দিন! (বিশ্বস্ততার সাথে ৬০,০০০+ সদস্য নিয়ে!) 

IELTS:

প্রথম বর্ষ থেকেই ইংলিশের প্রতি মনোযোগ দেয়া উচিত…অনেকের বেলায় আমি দেখেছি ইংলিশ অনেক ভালো পারে কিন্তু তারা যখন কথা বলে তখন কেমন জানি জড়িয়ে যায় কথা গুলো, পরিষ্কার শোনা যায় না…এতে স্পিকিং এর নাম্বারে উপর প্রভাব পড়ে…কথা বলতে হবে স্পষ্ট ভাবে…কোন প্রশ্নের উত্তর হঠাত করে শেষ করে দেয়া যাবে না… আমরা যখন কথা বলি, হঠাত করে কিন্তু শেষ করি না…ইংলিশ এ ও তাই… উত্তর যেন সঠিক ভাবে শেষ হয়, অন্তত পরীক্ষক যেন বুঝতে পারেন যে আপনার উত্তর দেয়া শেষ হয়েছে…এছাড়া ফ্লুয়েন্সি থাকা খুব ই জরুরী…কিন্তু ফ্লুয়েন্টলি বলতে যেয়ে শুধু ভুল করেই গেলাম, এমন যেন না হয়…আর সেজন্য ইংলিশ এর চর্চা রাখতে হবে…ইংলিশ পেপার পড়তে বা ইন্টারনেট এ ইংলিশ আর্টিকেল পড়তে ইচ্ছে না করলে ইংলিশ গল্পের বই পড়া যেতে পারে…এতে যেমন রিডিং স্কিল বাড়বে, তেমনি অনেক নতুন শব্দ শিখতে পারা যাবে…তাছাড়া সিনেমা দেখা বা খবর শোনার মাধ্যমে লিসেনিং স্কিল ভালো হবে… IELTS এর জন্য ক্যামব্রিজ সিরিজ এর কথা সবাই জানে, আমি ৫-৯ পর্যন্ত বই গুলো ফলো করেছিলাম তবে ৯ নাম্বার বই এর একটি টেস্ট দিতে পেরেছি…বাকিগুলো পারিনি সময়ের অভাবে …

অনেক পোস্টে দেখেছি IELTS নিয়ে অনেক লিখা আছে…সেগুলো আপনাদের সাহায্য করবে ভালো স্কোর করতে… তাই এটা নিয়ে বেশি আলোচনার দরকার নেই…তবে এটুকু বলবো, একটা ভালো মার্ক অনেক সময় আপনার সম্পর্কে ধারনা বদলে দিতে পারে…

সিভিঃ

সিভির অনেক ফরমেট আছে, আপনি যে কোনো টা ই ব্যবহার করতে পারেন… তবে বেশি ফ্যাশানেবল যেন না হয়…খুব সাধারন তবে তথ্য বহুল সিভি আপনার সম্পর্কে খুব ভালো একটা ধারনা দিবে এডমিশন কমিটিকে… সেখানে আপনি যা যা করেছেন, মোটামুটি গুরুত্বপূর্ন সব কিছু যুক্ত করুন… প্রজেক্ট, পাবলিকেশন, টেকনিক্যাল স্কিল, সেচ্ছাসেবক হিসেবে কোনো কাজ বা লিডারশিপ অভিজ্ঞতা এসব যুক্ত করুন সিভি তে…  আমি যতটুকু দেখেছি, প্রজেক্ট, পাবলিকেশন, টেকনিক্যাল স্কিল কে তারা খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে…ভালো কিছু প্রজেক্ট, ভালো পাবলিকেশন এবং আপনি কি কি জানেন আপনার কোর্সের বিষয়ে, এসব আপনাকে অন্য আবেদনকারীর থেকে অনেক এগিয়ে রাখবে…প্রোগ্রাম অনুযায়ী সিভিকে পরিবর্তন করুন… যেমন আপনি এপ্লাই করেছন মলিকুলার বায়োলজিতে… সেখানে আপনি বায়োলজি রিলেটেড কিছু কাজ উল্লেখ করবেন যা আপনি ব্যচেলর এ করে এসেছেন… মনে করি আপনি প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ খুব ভালো পারেন…কিন্তু মলিকুলার বায়োলজিতে হয়ত প্রোগ্রামিং স্কিল এর দরকার নেই এবং সেখানে বলে দিয়েছে সিভি ২ পেইজের বেশি হতে পারবে না…তখন আপনি এই স্কিল বাদ দিতে পারেন যদি দেখেন সেখানে বাড়তি কিছু লিখলে পৃষ্ঠা বেড়ে যাচ্ছে…অন্যথায় সিভিতে লিখলে সমস্যা নেই…আবার ইঞ্জিনিয়ারিং রিলেটেড কোনো প্রোগ্রামে এপ্লাই করলে আপনি ব্যচেলর লেভেলে যদি কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং রিলেটেড কাজ করে থাকেন তা উল্লেখ করবেন…তবে এটা আপনাকে বুঝতে হবে কোন প্রোগ্রামের জন্য কোনো টপিক গুলো উল্লেখ করা উচিত, কারন অনেক সময় বলে দেয় সিভি ২ পেইজে সীমাবদ্ধ হতে হবে… তখন হয়তো দেখা যাবে অনেক গুরুত্বপূর্ন টপিক ই বাদ পড়ে গেছে…তাই আপনাকেই বুঝতে হবে ব্যচেলরে অর্জন করা স্কিল গুলোর মাঝে কোনটা  কোন প্রোগ্রামে উল্লেখ করলে তা আপনাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে…

মোটিভেশন লেটারঃ

এডমিশন এর জন্য গুরুত্বপূর্ন একটা ডকুমেন্ট হলো মোটিভেশন লেটার…এখানে আমি বলবো কোনো মিথ্যের আশ্রয় না নিতে… এডমিশন কমিটি এত এত লেটার পড়ে, আপনি যদি মিথ্যে কিছু লিখেন তাহলে সেটা তারা খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারে… সবচেয়ে বড় কথা হলো, আপনার সত্যি যদি হাই মোটিভেশন থাকে, তা আপনার লেটার পড়লেই বুঝতে পারা যাবে… সংক্ষেপে আপনার সম্পর্কে বলার পর ব্যাচেলর এ কি কি কোর্স পড়েছেন যা আপনার এপ্লাই করা প্রোগ্রামে কাজে আসবে, কি কি স্কিল অর্জন করেছেন, কোনো voluntary experience আছে কি না এবং তা থাকলে সেটা কি তা লিখতে পারেন… আপনি কেনো সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লাই করেছেন, আপনি পড়া শেষ করে কি করতে চান সেসব লিখলেই যথেষ্ট… তবে আমি বলবো, মোটিভেশন লেটারে রিসার্চের দিকে জোর একটু বেশি দিতে… মানে আপনার সাবজেক্ট বা আপনার মেজর নিয়ে রিসার্চ করবেন এমন কিছু লিখলেই ভালো…অন্তত আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে… আপনি উদ্যোক্তা হবেন এবং এমন কিছু প্ল্যান আপনি বর্ননা করেন, সেটা ও অনেক ভালো… খেয়াল রাখবে এডমিশন রিকোয়ারমেন্ট এ কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি না, অনেক সময় মোটিভেশন লেটার ১ পেইজের মধ্যে শেষ করতে …নয়ত এই লেটারে যে নাম্বার বরাদ্দ আছে তা থেকে কিছু নাম্বার কাটা যাবে…কাজেই সব খেয়াল রাখতে হবে…

পাবলিকেশনঃ

চেস্টা করতে হবে যেন পাবলিকেশন থাকে… ভালো পাবলিকেশন এর মূল্য ই আলাদা…আমরা অনেকেই ইন্ডিয়ান জার্নালে আর্টিক্যাল পাবলিশ করি… আমার মতে নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো… ভালো পাবলিকেশন হলে তো আলহামদুলিল্লাহ…তবে মোটামুটি হলেও চলবে, কারন এতে এডমিশন কমিটি বুঝতে পারবে অন্তত আপনি আপনার চেস্টা করেছেন..

রেকমেন্ডেশন লেটারঃ

একটা ভালো রেকমেন্ডেশন নেবার চেস্টা করবেন প্রফেসর এর কাছ থেকে…আমি মনে করি যে বিষয়ে আপনি খুব ভালো মার্ক পেয়েছেন বা এ+ আছে, সেই বিষয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে রেকমেন্ডেশন লেটার নিন… তবে এটা মাথায় রাখবেন যেই শিক্ষকের কাছ থেকে রেকমেন্ডেশন নিচ্ছেন, তিনি যেন আপনাকে ভালো ভাবে জানে…কারন অনেক সময় এডমিশন কমিটি মেইল করতে পারে…

চাকুরীর অভিজ্ঞতাঃ

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এডমিশন এর জন্য  যে সকল বিষয় এর প্রতি এডমিশন কমিটি মার্ক বরাদ্দ করে তার মাঝে একটি হলো চাকুরীর অভিজ্ঞতা… এটা যে কোন ধরনের হতে পারে…ফুলটাইল হলে ভালো…তবে কারো ফুল টাইম অভিজ্ঞতা না থাকলে সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ, খন্ডকালীন চাকুরী এসব দেয়া যেতে পারে…

❒ জার্মান প্রবাসে আড্ডা দিতে চাইলে যোগ দিন! (বিশ্বস্ততার সাথে ৬০,০০০+ সদস্য নিয়ে!) 

Erasmus স্কলারশিপ প্রোগ্রাম কিভাবে বাছাই করবো?

এখন আসি কিভাবে সঠিক প্রোগ্রাম বাছাই করবো সে ব্যপারে…আমরা যখন ব্যচেলর লেভেলে পড়াশোনা করি, তখন অনেক আকাশকুসুম চিন্তা আমাদের মাথায় থাকে… হয়তো কোনো এক কল্পবিজ্ঞান সিরিজের বই পড়ে বা সিনেমা দেখে খুজতে থাকি সেই রিলেটেড কোনো প্রোগ্রাম আছে কি না…কিন্তু সেটা করে আসলে কোনো লাভ হয় না… সত্যি বলতে আমি নিরুৎসাহিত করছি না…কাউকে না কাউকে তো কিছু শুরু করতেই হবে…তবে প্রোগ্রাম বাছাই এ একটু সময় দেয়া উচিত… যেমন প্রোগ্রামের রিকোয়ারমেন্ট এ আপনার ব্যাচেলর কোর্সের নাম সরাসরি উল্লেখ আছে এমন প্রোগ্রামে আপনার যদি ইন্টারেস্ট থাকে তাহলে এপ্লাই করতে পারেন…

Erasmus এর প্রোগ্রাম বেশির ভাগ ই Interdisciplinary..সেখানে অনেকেই এপ্লাই করতে পারে, তবে এটা খেয়াল রাখবেন আপনার ব্যচেলর ডিগ্রির নাম যেন রিকোয়ারমেন্ট এ সরাসরি থাকে, নয়ত এডমিশন পাবার সম্ভাবনা অনেক কম থাকবে…এডমিশন পাবেন না এমন বলছি না, তবে সম্ভাবনা কমে যাবে…যেমন ধরুন আপনি ইলেক্ট্রিক্যাল এ পড়েছেন…এখন একটা প্রোগ্রাম বাছাই করলেন যেখানে এনার্জি সম্পর্কিত একটা স্পেশালাইজেশন ই আছে… আপনি এপ্লাই করে ফেললেন কিন্তু দেখলেন যে এডমিশন রিকোয়ারমেন্ট এ আপনার ব্যচেলর ডিগ্রি (অর্থাৎ ইলেক্ট্রিক্যাল) এর নাম ই নেই, বরং সিভিল, মেকানিক্যাল এসব আছে…এবং এটা বলে দেয়া আছে যে অন্য ডিগ্রি হলেও এপ্লাই করা যাবে… সেক্ষেত্রে আপনার এডমিশন পাবার সম্ভাবনা ই কমে যাবে… স্কলারশিপ তো পরের কথা… আর আপনার থিসিস/প্রজেক্ট রিলেটেড প্রোগ্রাম হলে তো আরো ভালো… অর্থাৎ যা ই করুন, আপনার ব্যচেলরের সাথে মিল আছে এমন প্রোগ্রামে এপ্লাই করবেন…  একটা সঠিক প্রোগ্রাম আপনাকে এডমিশন তথা স্কলারশিপ পেতে খুব সাহায্য করবে…

উপসংহারঃ

সব শেষে আমি বলবো, আপনি আপনার ব্যচেলরের সাথে মিল রেখে যেই প্রোগ্রাম গুলো আপনাকে আকর্ষন করে তার একটা লিস্ট করে ফেলুন…এরপর সেই প্রোগ্রামের খুটিনাটি সব দেখুন…কি কি বিষয়ে তারা মার্ক বরাদ্দ রেখেছে, রিকোয়ারমেন্ট কি কি, এবং সেই প্রোগ্রামে কোন কোন কোর্স আছে ইত্যাদি সব দেখুন এবং যেটা আপনার জন্য ভালো ম্যাচ করে সেটায় এপ্লাই করুন… Erasmus এর প্রোগ্রামে এপ্লাই করায় একটু সাবধানতা অবলম্বন করুন… কারন এক সেশনে সর্বোচ্চ ৩ টা প্রোগ্রামে এপ্লাই করতে পারবেন…নয়তো European Union আপনাকে স্কলারশিপ দিবে না… প্রোগ্রাম বাছাই হয়ে গেলে একে একে বাকি ডকুমেন্টগুলো রেডি করে ফেলুন…চাইলে মোটিভেশন লেটার আগে থেকেই তৈরী করে রাখতে পারেন… পরবর্তীতে প্রোগ্রাম অনুযায়ী একটু পরিবর্তন করে দিলেই হবে…মনে রাখবেন, এপ্লাই করার পর প্রতিযোগীতা কিন্তু পুরো বিশ্বের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে… কাজেই নিজেকে সেভাবেই তৈরী করুন একদম শুরু থেকে…

পরিশেষে, আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস রেখে আত্মবিশ্বাসের সাথে এপ্লাই করুন… ধৈর্য্য ধরতে হবে…এবং আল্লাহর কাছে চাইতে হবে… দোয়া করতে হবে… দেখবেন জয় সুনিশ্চিত… আজ এ পর্যন্তই… ইচ্ছে আছে কিছু দিনের মাঝে অনলাইন ইন্টারভিউ নিয়ে লিখবো… সবার জন্য শুভ কামনা…


আরো পড়তে পারেনঃ