বেশ কয়েকদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন  পর্যায়ের শিক্ষকরা খবরের শিরোনাম হচ্ছেন। এতে আছে অবৈধ নিয়োগ-বাণিজ্য, সহকর্মীর বিরদ্ধে মামলা, যৌন হয়রানিসহ নানা  নৈতিকস্খলন সম্পর্কিত অপরাধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নৈতিক মান কতটা অধপতিত হলে ধারাবাহিকভাবেই এইসব ঘটতে পারে! অথচ এর বিপরীতে আমরা কখনো তাদের গবেষণা, কনফারেন্স কিংবা পাঠদান বিষয়ক কোনো ভালো খবর পাইনা। বরং শিক্ষকদের আমরা দেখি দলীয় রাজনীতির দাসানুদাস হয়ে থাকতে।  সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে একজন গবেষক শিক্ষকের চেয়ে রাজনৈতিক শিক্ষকের প্রভাব ও মর্যাদা যেন বেশি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনসহ শিক্ষকের সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে রেখেছে। এতে করে শিক্ষকের মধ্যে শুধু বিভাজন বাড়ছেনা, বরং তুলনামূলক কম ‘শক্তিশালী’ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবহীন সহকর্মীকে অপদস্ত করার মতো ঘটনা ঘটছে। এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবেই বেড়ে চলেছে।

আর কতো নিচে নামবো ?

সম্প্রতি ফেসবুকে প্রকাশিত তথ্যের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন একই  বিভাগের আরেকজন শিক্ষক। মজার ব্যাপার হলো, এই দুই সম্মানিত শিক্ষক গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে পাঠদান ও ৫৭ ধারা বাতিল চেয়ে আন্দোলন করেছেন। এমন কি আদালতে রীটও করেছেন। একথা অনস্বীকার্য যে, যিনি মামলা করেছেন তিনি নিশ্চিতভাবেই অপর শিক্ষকের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। জানা গেছে, তিনি মামলা করার আগে সরকারদলীয় প্রভাবশালী শিক্ষকদের সাথে শলা পরামর্শ করেছেন। অন্যদিকে, অপর শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। এই সুযোগে প্রভাবশালী সংশ্লিষ্ট শিক্ষক কৌশলী হয়ে তাকে শায়েস্তা করতে নেমেছেন। আরো একটি ঘটনা। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১ জন শিক্ষক অভিযোগ দিয়ে বলেছেন,তারা সংশ্লিষ্ট  শিক্ষকের সঙ্গে কাজ করবেন না। অবাক করার মতো ব্যাপার হচ্ছে,  অভিযুক্ত বেক্তিকে না জানিয়েই অত্যন্ত দ্রুততা সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিলো। প্রশ্ন হচ্ছে ,জোটভুক্ত শিক্ষক আসলে কারা ! তাদের এই ঐক্যের পেছনের খবর জানা গেছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ফেসবুক স্টেটাস থেকে। তিনি জানিয়েছেন, ”কয়েক মাসে বিভাগে একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে অনিয়ম হচ্ছে এই জানিয়ে আমি বিভাগীয় চেয়ারপার্সন ম্যাডামকে সাতটি চিঠি দেই এবং এই সব অনিয়ম হতে দেয়ার জন্য তাকে কঠোর সমালোচনা করি। সেই সাথে অন্য কিছু শিক্ষক শিক্ষিকারা যারা এই অনিয়ম করছেন এবং এই অনিয়ম হচ্ছে জেনেও প্রতিবাদ করছেন না সেইজন্য ক্ষোভ প্রকাশ করি”। এই শিক্ষকের অপরাধ তিনি রাজনৈতিক পদলেহী শিক্ষকদের পাকা ধানে মই দিয়েছেন। অন্য আরেকটি খবরে দেখি,  বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সূত্র মতে, ‘ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস’ বিভাগে মোট নয়জন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। অথচ বিজ্ঞাপনে বিভাগটিতে সাতজন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ এখানে বিজ্ঞাপনের অতিরিক্ত দু’জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের মধ্যে ছয়জনই শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ করতে পারেননি।অন্যদিকে, ‘বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি’ বিভাগে দুটি খালি পদের বিপরীতে চারজনকে নিয়োগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। তাদের মধ্যে কমপক্ষে দু’জন ফলের দিক থেকে প্রথম চারজনের মধ্যেও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ,  দুটি বিভাগে বিজ্ঞাপনবহির্ভূত চারজন শিক্ষক নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা সিলেকশন কমিটির বিষয়'(যুগান্তর,১৩ জুলাই)।প্রশ্ন হলো, সিলেকশন কমিটি যদি আইন বহির্ভুতভাবে রাজনৈতিক মেশিনারি হিসেবে কাজ করে তাহলে, মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে? একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ভিসি হয়ে তিনি কিভাবে এই অনিয়মের পক্ষে প্রকাশ্যে যুক্তি দেন?  কিছুদিন আগে ও আমরা দেখেছি, স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কারণে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অশ্লীল চিত্র প্রদর্শনের অভিযোগ এনে বরখাস্ত করা হয় । যা ইতোমধ্যেই আদালত কর্তৃক মিথ্যা প্রমাণ হয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন কোনও তদন্তের উদ্যোগ না নিয়ে নিজেই (প্রোভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান)সক্রিয়ভাবে প্রপাগান্ডা চালিয়েছে(বাংলা ট্রিবিউন,জুলাই ১৪)।

দেশের মেধা পাচার রুখতে হবে

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও সীমাহীন অনিয়ম কারণে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে চলে আসছে।যাদের বেশির ভাগই অধ্যয়ন শেষে রাজনৈতিক অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে দেশে ফিরতে চায়না। দেখা গেছে, বাইরে আসার প্রবণতা প্রতি বছর ক্রমাগত বাড়ছেই। সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনেস্কোর  প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৫ সালে মোট ৩৩ হাজার ১৩৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ১১২ জন। এই দুই বছরের হিসাবে দেখা যাচ্ছে ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ৩৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছে (বাংলা ট্রিবিউন,জুলাই ১৩)। অবাক করার মতো  খবর হচ্ছে , মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, শ্রীলংকা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এমন কী ভারতে পাশাপাশি অনেকেই আফ্রিকার নানা দেশে যাচ্ছে। অনেকেই প্রতারিত হয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কিংবা  মোটা অংকের টাকা দিয়ে দেশে ফিরে আসে। আর যেসব বড়োলোকের ছেলেরা পড়তে যাচ্ছে তাদের পেছনে অভিভাবকরা খরচ করছেন কালো টাকা। এতে করে প্রতিবছর শুধু কোটি টাকা অর্থ বাইরে যাচ্ছে না, দেশের একটু বিশাল মেধাদীপ্ত তারুণ্যকে দেশের গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজে লাগানো যাচ্ছেনা। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়া শিক্ষার্থীদের দেশে কাজে লাগানো গেলে শিক্ষাখাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। প্রতিবছর উন্নত দেশসমূহ বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি অথবা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সহায়তা দিয়ে বিশেষত উন্নয়নশীল দেশসমূহ থেকে অনেক ছাত্র তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দেশ উন্নতমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা আর গবেষণার সুযোগ করে দিচ্ছে। পরবর্তীতে সেই দেশের উন্নয়ন,গবেষণা ও অর্থনীতিতে অবদান রাখছে।  এই মেধাকে কাজে লাগাতে হলে রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত থেকে  বিশেষ নীতিমালা ও প্রনোদণাসহ শিক্ষা ও গবেষনানির্ভর অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।বিশ্ববিদ্যালয়কে  সার্বিকভাবে পড়াশুনা ও গবেষণামুখী করতে বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরি কমিশনকে আরো কার্যকরি ভূমিকা নিতে হবে। দেশের জন্য তো অবশ্যই, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য প্রতিযোগিতামূলক যোগ্যতা অর্জন করে শিক্ষক নিয়োগ দরকার। অথচ, বাংলাদেশে এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।যেমন খুশি শিক্ষক নিয়োগ তো দিচ্ছে সঙ্গে অপ্রতুল ও হাস্যকর গবেষণার জন্য আর্থিক প্রণোদনা। বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরি কমিশন হয়তো মনে করেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে তো গবেষণাধর্মী কোনো পরিবেশ নেই; দক্ষ শিক্ষক নেই, সুতারং বেশি বরাদ্দ দিয়ে কী লাভ!যেমন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি অর্থ বছরের বাজেট ২৯৫ কোটি ২০ লাখ টাকা৷ যার মধ্যে গবেষণার জন্য রাখা হয়েছে মাত্র দুই কোটি টাকা! যা মোট বাজেটের প্রায় ০.৬৮ শতাংশ! অথচ বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক আছেন প্রায় ৮৭৪ জন!

আপনারা কী চান ?

উন্নত দেশসুমূহ সৃজনশীল ও গবেষণা ও প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনাময় তথ্য ও তত্ত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাগার না বানিয়ে রাজনৈতিক ক্লাব বানিয়ে রেখেছি।ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার সুবাধে দেখেছি, পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া কোনো শিক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন করেনা।ইউরোপ,আমেরিকা ছাড়াও এমনকি ভারত, পাকিস্তানেও একাডেমিক পজিশন খুবই প্রতিযোগিতামূলক। শিক্ষকদের বলব, রাজনীতি ছেড়ে নিজেদের মধ্যে গবেষণা চর্চার পরিবেশ গড়ে তুলুন। আপনারা জাতির কারিগর। আগামী প্রজন্মের নির্মাতা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক-প্রশাসন কী প্রকাশ্যে বিশ্ববিদ্যালযে আবাসন-হল-নিয়োগ-পদন্নতি সব দলবাজ বানাবার প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ করছেন!নিজেদের বিভাগে অন্তর্কোন্দল তৈরী করে, সহকর্মীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে লড়াইয়ে নেমেছেন- তা খুবই অস্বস্তিকর ও অপ্রত্যাশিত! এতে করে প্রতিনিয়ত শিক্ষার স্বাভাবিক ও সুষ্ট পরিবেশ ধ্বংস করে জাতির মেরুদন্ড ভেঙে ফেলার একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উল্লিখিত ঘটনার মধ্যে দিয়ে যা আরো পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠেছে। আমরা আশা করি, মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অর্জিত দেশে সবার জন্য সাম্য-মর্যাদা-ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবেনা। কিন্তু দেশের প্রধানতম উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মুক্তচিন্তার প্রতিষ্ঠান, ক্রমশ অনৈতিকতার ধারক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলে এই স্বপ্ন ব্যাহত হবে।রাজনৈতিক দুষ্টচক্র এবং মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষকদের কোনঠাসা করে রেখে দলীয় বিবেচনায় যোগ্যতাহীনদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নীতি থেকে সরে না আসলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। তাই নীতি নির্ধারকের কাছে প্রশ্ন প্রশ্ন রাখছি, আমরা আর কতো নিচে নামবো ? আপনারা কী চান, শিক্ষা না রাজনীতি ?

ব্রাসেলস,বেলজিয়াম

১৬ জুলাই , ২০১৭