৪ঠা নভেম্বর ২০১৫। জীবনের প্রথমবার আকাশযানে চড়বো, গন্তব্য ডুসেলডর্ফ জার্মানী। সকাল থেকেই আমি একটু নার্ভাস। নিজেকে কেমন জানি একা-অসহায় লাগছে। আশেপাশে বাবা-মা, ভাইবোন, দুলাভাই-ভগ্নিপতি, আত্নীয় স্বজন, আমার অতি আদরের পিচ্ছিরা সবাই জড়ো হইছে। সবার উপস্থিতি আমার মনকে আরও বিরহ বিভোর করে তুলছিল। নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে গেলাম। কক্সবাজার বিমানবন্দর হয়ে পৌঁছে গেলাম ঢাকায়। আমার ফ্লাইট ছিল পরেরদিন অর্থাৎ ৫ই মে বাংলাদেশ সময় সকাল ৬:০০ টায়। ঢাকাতে কামরুল, ফণী, নিপুন, বাহার আগে থেকে অপেক্ষা করছিল। বিকেলটা কাটালাম তাদের সাথে। একসাথে খেলাম অনেকদিন পর, হলের দিনগুলোর কথা মনে পরছিল বারবার। রাতে আজিজের নিকুন্জের বাসায় সবাই আড্ডা দিলাম।

রাত তিনটায় বের হলাম বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে। সাথে কামরুল, ফণী, বাহার আর আমার ছোট ভগ্নিপতি। ওদের কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে আবারও মনটা বিষন্নতায় ভরে উঠলো। ইমিগ্রেশন পার হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এই প্রথম সত্যিকারের দেশ ত্যাগের কষ্টটা অনুভব করতে পারলাম। সবকিছু অচেনা, প্রিয়জন নেই কোথাও, কোথায় যাচ্ছি আমি! কষ্ট আর উত্তেজনার ধুম্রজালে আবদ্ধ হয়ে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। ডাক পড়লো, সবাই একটা টানেল ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছুদুর হেঁটে যেতেই চোখে পড়লো টার্কিশ এয়ারলাইন্সের সেই কাঙ্খিত এয়ারবাস। নিজের আসনে চুপচাপ বসে পড়লাম। আশপাশ চোখ ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম। বিজনেস ক্লাস কেবিন। যাত্রী খুববেশী না। হঠাৎ দেখি আমার পাশের সিটে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রো ভিসি ড. আলাউদ্দিন স্যার (বর্তমান ভিসি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়)। স্যারকে সালাম করে পরিচয় দিয়ে কথা বললাম। স্যার জিজ্ঞেস করলেন আমি কোথায় যাচ্ছি, বললাম জার্মানি যাচ্ছি। শুনে স্যার খুশি হলেন এবং দোয়া করলেন। স্যার কোন একটা কনফারেন্সে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন। আমাদের সবারই ইস্তান্বুলে ট্রানজিট আছে, ওখান থেকে গন্তব্য আলাদা হয়ে যাবে। স্যারের সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলাম। মাঝখানে কয়েকবার স্যার নিজের সিট থেকে উঠে আমার খোঁজ নিয়ে গেলেন। আমার খারাপ লাগছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন।

ঢাকা টু ইস্তান্বুল লম্বা ফ্লাইট। তাই ভাবছিলাম বাকি সময়টা কি করা যায়। একটা মুভি দেখলে মন্দ হয়না। খোঁজে একটা মুভি দেখা শুরু করলাম। ভালই লাগছিল। মাঝখানে খাবার দিয়ে গেল এয়ারহোস্ট্রেস। বেশ কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম পুরো বিমানে একটা ঘুমের আবহ তৈরি হয়ে আছে। মোটামোটি সবাই ঘুমাচ্ছে বা ঘুমানোর চেষ্টা করছে। আমিও ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কোথায় যেন কিসের ঘোষণা আসছে। চোখ খুলে দেখি সবাই সবকিছু গোছগাছ করছে। এক ঘুমেই ইস্তান্বুল চলে আসছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমান ল্যান্ড করবে ইস্তান্বুলে। আমি জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম। মনে হল কি অপরুপ সুন্দর শহর ইস্তান্বুল। বিমান থেকে নামার আগে স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। বিমান থেকে নেমে বাসে করে এয়ারপোর্টে ডুকলাম। ব্যস্ত এয়ারপোর্ট, অনেক যাত্রী। সবাই যে যার মতো হাঁটছে শেষ গন্তব্যের বিমান ধরতে। আমিও হাঁটছি,আরেকদফা নিরাপত্তা ব্যবস্তার ভেতর দিয়ে গিয়ে ওয়েটিং স্পেইসে বসলাম। ওয়াইফাই কানেক্ট করতে হবে। বাসায় বলে আসছিলাম ইস্তান্বুল গিয়ে ফ্রি ওয়াইফাই কানেক্ট করে কল করবো। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো ওয়াইফাই আর কানেক্ট হয়না। অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। বাসায় সবাই নিশ্চয় দুশ্চিন্তা করবে। আশেপাশে কারও কাছ থেকে কোন সাহায্য নেয়া যায় কিনা দেখলাম। আমার পাশে ষাটোর্ধ এক ভদ্রমহিলা খুব মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়ছেন। কথা বলতে সংকোচ লাগলো, জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করলাম না। এরমধ্যে সবাই ডুসেলডর্ফের বিমানে ওঠে বসতে লাগলো। মাত্র তিন ঘন্টার ট্রানজিট কখন কেটে গেল টেরই পেলাম না।

এয়ারবাস এ৩৮০, বিশালাকার এক বিমান। বেশ সুন্দর-পরিপাটি সবকিছু। এরাবিক মিউজিক বাজছে লো ভলিউমে। আবার কিছুক্ষণ টার্কিশ এয়ারলাইন্সের থিম মিউজিক। যথারীতি আশেপাশে তাকিয়ে দেখছিলাম। মনের মধ্যে বাড়িতে কল করতে না পারার একটা যন্ত্রণা কাজ করছে। আমার পাশের সিটে সেই ষাটোর্ধ মহিলার আসন। উনি হ্যালো বলে বসলেন। কিছুক্ষণ পর ওনি নিজ থেকেই কথা বললেন। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন-আমি ইফা। অসম্ভব সুন্দর ইংরেজি বলেন উনি। আমি আমার নাম বলে আমার হাতটাও বাড়িয়ে দিলাম। জিজ্ঞেস করলেন আমি কোন দেশী এবং কোথায় যাচ্ছি। বললাম আমি বাংলাদেশী,জার্মানি যাচ্ছি পড়তে। শুনে বললেন গ্রেট- ওয়েলকাম টু জার্মানি। ওনি বলে চললেন। ওনি জার্মান নাগরিক। একটা সংস্থার হয়ে শরনার্থীদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করেন। মাসে কয়েকবার তার ইস্তান্বুল আসা লাগে। জার্মানির ডুসেলডর্ফেই তার বাড়ি। কার্ড বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন এটা রাখ, কখনো দরকার পড়লে আমাকে মেইল করো অথবা কল করো। ওনার বাড়িতে ওনি আর ওনার হাসবেন্ড থাকেন শুধু। ছেলে আছে দুইটা, দুইজন জার্মানির অন্য দুই শহরে থাকে। প্রতি বছর ক্রিস্টমাসে শুধু একবার দেখা হয়।

ভদ্র মহিলার সাথে গল্প করতে বেশ ভালই লাগছে। ওনি আমাকে সংক্ষেপে জার্মান লাইফ-কালচার সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনছি। আমি গিয়ে কোথায় উঠবো, কোন ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছি সব জিজ্ঞেস করলেন। আমাকে কেউ রিসিভ করতে আসবে কিনা জিজ্ঞেস করলেন। বললাম আমার বন্ধু আসবে। কাগজ বের করে তাতে আমার ইমেল এড্রেস লিখে দিতে বললেন। আমি ওনাকে প্রশ্ন করলাম বাংলাদেশ সম্পর্কে তার কোন ধারণা আছে কিনা। উনি বললেন আমি বাংলাদেশ সম্পর্কে জানি, তবে তা খুবই অল্প। বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনেক বেশী, ম্যানপাওয়ার সহজলভ্য এবং সস্তা হওয়াতে পোষাক শিল্পে তোমরা বেশ এগিয়ে আছ। কিছুদিন আগেতো মনে হয় তোমাদের একটা পোষাক কারখানায় দূর্ঘটনায় অনেক লোক মারা গেছে। মাঝে মাঝে খবরের কাগজে এবং সংবাদে পড়ে এতটুকুই জেনেছি।

গল্প করতে করতেই কবে যে চার ঘন্টা কেটে গেল বুঝতে পারলাম না। ডুসেলডর্ফ পৌঁছে গেলাম, ল্যান্ডিংয়ের ঘোষণা আসছে। ইফা আর আমি একসাথে বের হলাম। আমার লাগেজ না আসা পর্যন্ত ওনিও অপেক্ষা করলেন। লাগেজ আসলে দুইজন মিলে ইমিগ্রেশনের দিকে হাটতে লাগলাম। ওনি আমাকে বললেন ইমিগ্রেন পার হয়ে সোজা করিডোর দিয়ে হেঁটে সামনের খোলা জায়গায় ওনার জন্যে অপেক্ষা করতে। আমি অকে বলে সামনে এগিয়ে গেলাম। ইমিগ্রেশন শেষ করে বের হয়ে বন্ধু বিল্লাহ কে খুঁজতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর সে চলে আসল। অনেকদিন পর বন্ধুকে কাছে পেয়ে সব কষ্ট-ক্লান্তি মুহূর্তের জন্যে ভূলে গেলাম। আগপিছু আর না ভেবে সোজা বন্ধুর বাসার দিকে রওনা হলাম। ভাবলাম ভদ্রমহিলা হয়তো আমার কথা ভূলেই গেছেন। ভূলে যাওয়ারই কথা।

নতুন জার্মানিতে এসেছি, অনেক কাজ করতে হবে। হেল্থ ইনস্যুরেন্স করা, ব্যাংক একাউন্ট একটিভ করা, ইউনিভার্সিটি তে এনরোলমেন্ট কমপ্লিট করা সব কাজ করতে হবে। সবকিছু শেষ করতে এক সপ্তাহ লেগে গেল। একদিন অচেনা একটা মেইল পেলাম। ইফা পাঠিয়েছে।
ওনি লিখেছেন-হ্যালো শফিকুর আশা করি ঐদিন তোমার বন্ধু তোমাকে সঠিক সময়ে পিক করেছে। আমি বলেছিলাম তোমাকে ইমিগ্রেশন পার হয়ে অপেক্ষা করতে। হয়তো তুমি অনেক ক্লান্ত ছিলে অথবা আমার কথা খেয়াল করনি তাই বন্ধুকে পেয়ে খুশি হয়ে চলে গেছিলে। আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করেছিলাম এবং তোমাকে খুঁজছিলাম। আশাকরি তোমার কোন প্রব্লেম হয়নি এবং তুমি সঠিকভাবে তোমার ইউনিভার্সিটির সব ফরমালিটিজ শেষ করতে পেরেছো। ভাল থেকো, শুভ কামনা। ওনার মেইলের জন্যে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এবং খোঁজ নেয়ার জন্যে ধন্যবাদ দিয়ে রিপ্লাই লিখলাম। বেশ কয়েকবার আরও মেইল চালাচালি করলাম।

তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ল্যাব আর ক্লাস নিয়ে। ইফা কে আর মেইল লিখা হয়নি। ডিসেম্বর ২০১৫, আবারও ইফার মেইল। ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছে। আমিও উইশ করলাম। আবার মাঝে মাঝে ওনাকে মেইল করতে লাগলাম। বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইতেন আমার কাছে এই যেমন জার্মানি কেমন লাগছে, ল্যাবে কাজ কেমন, এখানকার ওয়েদার কেমন লাগছে, ল্যাঙ্গুয়েজ শিখছি কিনা এসব। মাঝখানে আবার গ্যাপ পরে গেল। অনেকদিন আর ওনাকে মেইল লিখা হয়নি। ২০১৬ এর ডিসেম্বর, ক্রিস্টমাস এর ছুটি চলছে। একদিন ইফা এর মেইল পেলাম-ক্রিস্টমাসের শুভেচ্ছা পাঠিয়ছে। আমিও রিপ্লাইতে শুভেচ্ছা জানালাম। ডিসেম্বরর পর আজকে আবারও ওনার মেইল পেলাম। আমার কুশলাদি জানতে চাইলেন, সাথে একটা দাওয়াত। ওনার বাসায় একটা গেট টুগেদার হবে। ওনার বিভিন্ন দেশের বন্ধু-বান্ধবরা আসবেন। আমিও যেন যাই। অবাক লাগলো একজন অপরিচিত মানুষের আন্তরিকতা দেখে। সম্মানিত বোধ করলাম নিজে নিজে। কোন প্রয়োজন ছাড়াই আজ পর্যন্ত ওনি আমার খোঁজ নিয়ে যাচ্ছেন। যতবারই উনার কথা ভাবি শ্রদ্ধায় মনটা গলে যায়। ভাল থাকুক ভাল মুক্তমনা মানুষগুলি, রেসপেক্ট!

শফিকুর রহমান

মাস্টার্স, রসায়ন

রুহর ইউনিভার্সিটি, বকুম।

এছেন, জার্মানি
(চলবে)