শুরুতেই একটি ধাঁধা হয়ে যাক। ৭*৭*৭=২১। মানে কী ?

সাত দেশ। সাত দিন। সাত জন। সাতকাহন। আমরা সাতজন বন্ধু সাত দেশের রাজধানী ঘুরে  আসতে সময় লেগেছে  মাত্র সাত দিন! তো, একুশ মানে ? আরে দিনটা ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি! কিন্তু গানিতিক সংখ্যা গুলো  এমন অদ্ভুতভাবে  মিলে যাবে নিজেও কখনো ভাবিনি।

যেভাবে শুরু

তখন সবেমাত্র আমি নেদারল্যান্ডে পড়াশুনা করতে এসেছি। শুরুটা ভালো হয়নি। আমার ফ্লাইট ছিল কুরবানের ঈদের দিন। তাছাড়া আসার এক সাপ্তাহের মধ্যেই চোখে সমস্যা দেখা দেয়। মনটা খুব স্বাভাবিকভাবেই খারাপ । তবে স্কলারশিপের টাকা হাতে পাওয়ার পর বেশ ভালোই লাগলো।  ধীরে ধীরে কয়েকজনের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হোল।  চারজন ইন্দোনেশীয় ,ভুটান ও তাঞ্জানিয়ার দুইজন সহ আমরা সাতজন নিয়ে একটি দল গঠন করি। দলের নাম দিই, ‘ঘুরে বেড়াই’। আমরা  প্রায়ই গুগল ম্যাপ থেকে  চমৎকার সব স্থান খুঁজে করি। ।বাসা থেকে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে, রেলওয়ে ষ্টেশনে রেখে ট্রেন ও বাসে ঘুরতাম। সবার কাছে সাইকেল ,ট্রান্সপোর্ট কার্ড আর সপ্তাহিক ফ্রি প্যাকেজ আছে।

একদিন ট্রেনে সবাই মিলে তুমুল আড্ডা দিচ্ছি। হটাৎ কেউ একজনের মাথা থেকে আইডিয়াটা আসলো। সামনে দুই সাপ্তাহের বন্ধ।চল, কোথাও ঘুরে আসি। তখনো এই  ‘সাতকাহন’ কারো জানা ছিল না। সেদিনের মতো বাসায় ফিরে আমরা হোম ওয়ার্ক নিয়ে বসি। আগে থেকেই আমাদের প্যারিস ও ব্রাসেলস দেখা ছিল। সবাই মিলে দেশ ঠিক করলাম। কিন্তু বেশ মুশকিলে পড়ে যাই। শিডিউল ঠিক করতে গিয়ে দেশ মিলাতে পারছিনা। বাজেট ও একটা ফ্যাক্টর। পরে ইন্দোনেশীয় দুই বন্ধু দায়িত্ব নিল। তিন দিনের মধ্যেই ওরা ট্রান্সপোর্টসহ অসাধারণ প্ল্যান বের করে ফেলল। শুরুটা নেদারল্যান্ড থেকে ফ্লাইটে ডেনমার্ক (কোপেনহেগেন)। দিয়ে। এরপর হাঙ্গেরি (বুদাপেস্ট), স্লোভাকিয়া (ব্রাতিস্লাভা); অস্ট্রিয়া (ভিয়েনা); চেক প্রজাতন্ত্র (প্রাগ);  হয়ে জার্মানি (বার্লিন)। দাম দেখে ফ্লাইট, ট্রেন, বাসের জন্য আগাম টিকেট বুকিং দিই । এরপর সবাই মিলেই বসি আবাসন সহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনায়। দুইজন ট্রান্সপোর্ট, আর দুইজন হোটেল বুকিং’র দায়িত্ব, খাবার ও নিরাপত্তা দুইজনকে, বাকী একজনকে বিশেষ পরামর্শক দায়িত্ব দেওয়া হয়। বেশ !  প্লানিং শেষ। এখন শুধুই অপেক্ষা।

প্রিয় স্মৃতি।

প্রিয় স্মৃতি।

বৃষ্টিভেজা শহর

তখন রাত। বৃষ্টি নামছে। নেদারল্যান্ড থেকে সরাসরি ফ্লাইটে আমরা কোপেনহেগেনে পোঁছাই। এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হল। এখন প্রথম কাজ বুকিং দেওয়া হোস্টেল খুঁজে বের করা। গুগল মামা বলছে, নির্দিষ্ট হোটেলটা একটু  দূরে। অথচ আমরা ধরে নিয়েছিলাম এয়ারপোর্ট থেকে হেটে যাওয়া যাবে।

ট্রামে করে হোটেলের কাছাকিছি পোঁছে হোটেলে ফোন দেই। কেউ রিসিভ করলোনা। ঠিকানা ধরেই দরজায় হাজির হই। দুটি বিল্ডিঙের মধ্য দরজা পেরিয়ে সামনে খোলা মাঠ নিয়ে তিন তলার একটা বাসা। দেয়ালে কোন নাম ঠিকানা নেই। সন্দেহ বাড়ছেই। ‘সবাইকে আবার হাইজ্যাক করবে নাতো’-টাইপের একটা ভয়মিশ্রিত  রোমাঞ্চ কাজ করছে। কলিং বেলের সংকেত পেয়ে একজন এসে হাজির। পুরো শরীর জুড়ে ট্যাটু । হাতে, নাকে কানে ও  কী সব পরে আছে! আমরাদের পরিচয় পেয়ে ভিতরে আসতে দিলেন। রুমে ঢুকেই দেখি, দেওয়ালে হরিণের বিশাল এক শিং টাঙ্গানো। এক কোণায় কোন এক সরীসৃপ প্রাণীর কংকাল ঝলানো। তারপাশে একটি বইয়ের তাকে ভ্রমণ ও ইতিহাস নিয়ে আছে নানান বই। সব মিলেই অন্যরকম এক পরিবেশ। নিজেদের একটু গুছিয়ে হয়ে সবাই বের হই খাবারের খোঁজে।

বৃষ্টিতে ভেজে আছে পুরো শহর রাত তেমন বেশি না হলেও সব খাবারের দোকান বন্ধ। রাস্তায় বেশ কিছু মাতাল যুবক আর আশ্রয়হীন শরণার্থীর দেখা গেলেও কোন খাবারের সন্ধান পাইনি।

মধ্যরাতের গল্প

ব্রাতিস্লাভা। স্লোভাকিয়ার রাজধানী। খুব ছোট্ট, পরিপাটি একটি শহর। আমারা সাইকেল নিয়েই পুরো শহর ঘুরেছি। দানিয়ুব নদীর চমৎকার  দৃশ্য দেখতে হলে উঠতে হয় ক্যাসেলের উপরে ।আগের দিন হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট  এয়ারপোর্টে রাত কেটেছে। কোন  হোটেল বুকিং দিতে পারিনি। বেশ ক্লান্ত হয়ে উঠছি। তাই বিকেলে ব্রাতিস্লাভা থেকে একটু আগেই আমরা অস্ট্রিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করি। রাতে একটু বিশ্রাম দরকার। কিন্তু ভিয়েনাতে নেমে আমরা কিছুতেই হোটেলের ঠিকানা মিলাতে পারছিনা। আমাদের বুকিং দেওয়া হোটেল ছিল ভিয়েনার মেইন ষ্টেশনের পাশে। কিন্তু গুগল বলছে অন্যকথা। এখান থেকে প্রায় ৩৫ মিনিটের পথ। তো, কী আর করা। সবাই গুগলের ম্যাপ ধরেই হাঁটছি। বেশ রাত হয়ে আসছে। ভিয়েনা শহরের রাস্তা বেশ প্রশস্ত। নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দে হাঁটা যায়। প্রায় ৪০ মিনিট হাঁটার পর  দেখলাম, আমরা ঠিক আগের জায়গায় এসে থেমেছি। সবাই খুব অবাক হলাম। শরীর জুড়ে ভর করে আসছে রাজ্যের সব ক্লান্তি। বলে রাখা ভালো, এর আগে বুদাপেস্টে এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ওয়ালাকে ফোন করে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে পরে ওই রেস্টুরেন্টের সন্ধান পাওয়া যায়নি।সবার খুব আগ্রহ ও কৌতূহল ছিল বাংলা খাবার নিয়ে। বাস ধরার তাড়া ছিল তাই হোটেল সন্ধানে বেশি সময় দিতে পারিনি। ঘটনাটা মনে পড়তেই সবাই বেশ হাসাহাসি করলাম।

মেতে উঠি উল্লাসে। ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া।

মেতে উঠি উল্লাসে। ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া।

রাত বাড়ছে। হোটেলের দেখা নেই। তাই একটু ঝিরিয়ে নিয়েই আবার ‘তল্লাশি’ শুরু করলাম সবাই। রাস্তায়  লোকজন কমে আসছে। আমাদের সমবয়সী  একজনকে  কাছে পেয়ে সব খুলে বললাম। সে ও ইন্টারনেটে দেখে অবাক হল। কিছুতেই ঠিকানা মিলাতে পারছেনা। তারপর আমাদের কে নিয়ে চলল। আমারা সবাই তাকে ফলো করছি। ১৫ মিনিট হাঁটতেই আমরা হোটেলের সামনে হাজির।(বলে রাখি, পরে একদিন ভিয়েনাতে গিয়ে জানলাম, ভিয়েনার গুগল ম্যাপ বেশ অসংগতিপূর্ণ)।

12743632_10207848923608571_2920970528230975511_n

সকাল বেলায় ভিয়েনার সেই হোস্টেলের সামনে।

রুমে ঢুকে বেশ ভয় পেলাম আমরা তিনজন। দ্বিতল খাটে ছয়টি বেড। যেখানে আগে থেকে তিনজন তিনটি খাটে আড়াআড়ি ভাবে শুয়ে আছে। খুব জোরেই নাক ডাকার শব্দ হচ্ছে। মেঝেতে, টেবিলে মদ আর বিয়ারের বোতল।রুমজুড়ে উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছে। টেবিলে উপর রাখা নতুন কেনা দুটি ছুরি। হায় আল্লাহ্‌। কোথায় এসে পড়লাম। রাত প্রায় বারোটা। কোনরকম রাত পার করেই সকালেই আমরা রুম থেকে বেরিয়ে যাই।

নিখোঁজ সংবাদ  

গন্তব্য চেক রিপাবলিক। ভিয়েনা বাস ষ্টেশনে সবাই বসে আছি।পাক্কা তিন ঘণ্টা হাতে আছে।বেশ অলস সময় কাটছে। আমি সবাইকে বলি, বসে থাকতে ভাল লাগছেনা।একটু হেঁটে আসছি। এরপর আমি পুরো মার্কেটটা ঘুরে  দেখি। ‘ওয়ান ইউরো শপ’ দেখে বেশ  একটু আগ্রহ হল।।  এখানে সব জিনিসের ডাল এক ইউরো! হঠাৎ কেন জানি মনে হল বেশ দেরি করে ফেলছি। ফিরে এসে দেখি, আগের জায়গায় আর কেউ নেই। এখন কী হবে ! আমি বেশ হতবিহবল হয়ে  পড়লাম। সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেল! কোথায় কী করবো কিছু  বুঝে উঠতে পারছিনা।

আমি সোজা হাঁটছি। একটু সামনেই দেখি দুইজন বন্ধু আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কী রাগ ওদের চোখে মুখে! আমি খুব করে ক্ষমা চাইলাম। অনেক খুঁজাখুঁজির পর আমাকে না পাওয়ায় সিদ্ধান্ত নিল, দুইজন আমার জন্য আপেক্ষা করবে, বাকিরা বাসে চলে যাবে। পরে প্রাগে গিয়ে সবার দেখা হবে। এখন পরের বাসের জন্য টিকেট করতে হবে। ষ্টেশনে গিয়ে সত্যিই আবাক হই।  আগের বাসটা এখনো আসেনি। আহা কী কপাল! বিশ মিনিট দেরি। সবার চোখে মুখে কী তৃপ্তির হাসি! একটু পরেই বাস এল। কিন্তু আমার অপরাধবোধ তখনো কমেনি।

সিমান্ত কাহিনি 

প্রাগে বেশ মজার সময় কাটলো। রাতে থাকার জায়গাটা ছিল খুবই চমৎকার।এক  ভদ্রলোক আমাদেরকে একটি বাসায় নিয়ে গেলেন। তিন তলার একটা বাসা।পুরোটা খালি। ভদ্রলোক বললেন, আপনারা যেখানে খুশি থাকতে পারেন।

আলাদা আলাদা বেড। চমৎকার রান্নাঘর। বাহ,বেশতো ! রাতটা ভালোই গেল। সকাল উঠেই বাজার করে নিয়ে আসলাম। হলুস্থুল খবার দাবার হল। সকাল দশটার আগেই আমরা চাবি বুঝিয়ে দিয়ে বের হয়ে গেলাম।  প্রাগ শহর দেখতেই কখন সন্ধ্যে হয়ে গেলো। আহা, চার্লস ব্রিজ। নদীর ওপারে ‘প্রাগ ক্যাসেল’ আমার দেখা খুব অবাক করা একটি স্থাপনা। পৃথিবীর অন্যতম বড় একটি কমপ্লেক্স এটি। প্যারিসের সেইন নদীর পর, ‘প্রাগ রিভার ক্রুইস’ মনে রাখার মতো। ১৮ ইউরো দিয়ে এক ঘণ্টার ট্রিপ।

চার্লস ব্রিজ, প্রাগ।

তো, আসল কথায় আসি।

সারা দিনের ক্লান্তি শেষে বাস যাত্রা। সরাসরি প্রাগ থেকে বার্লিন। পুরো বাস জুড়ে যাত্রী।সবার চোখ বুঝে আসছে। চলতে চলতে হটাৎ থেমে যায় বাস।ভেতরের সব লাইট জ্বলে উঠলো। দুই  দরজা দিয়ে চার জন পুলিশ ঢুকে সবার পরিচয়পত্র চেক করছে। ইউরোপ এটা খুবই স্বাভাবিক,  যেকোনো সময় পুলিশ পাসপোর্ট বা পরিচয় পত্র চাইতে পারে।সবাই যে যারটা দেখাই। বাদ পড়ছে আমাদেরই একজন, সে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছেনা। সব তন্ন তন্ন করে দেখলাম। আমরা কয়েকজন পুলিশকে কনভিন্স করার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। না ওরা কিছুতেই ছাড় দিবেনা। চেক সিমান্ত দিয়ে জার্মানিতে প্রবেশের একটু পর। আশাপাশে কিছু নেই। বেশ অন্ধকার ও। সবাই এক এক করে নেমে এলাম। পনের মিনিট হয়ে গেলো । কিন্তু কোন যাত্রীদের মধ্যে কোন অস্বস্তি দেখলাম না। সবাই যে যার মতো বসে আছে। আমরা যখন সবাই আশা ছেড়ে দিলাম এমন সময় তার পরিচয়পত্র পাওয়া গেলো। আহা কী স্বস্তি !

বার্লিনে পৌঁছতেই রাত হয়ে গেলো। বুকিং ছিল দ্যা কেটস পাজামা হোস্টেল । হোস্টেলের ভেতরকার দৃশ্য বেশ অন্যরকম। একটা মিউজিক্যাল আবহ আছে।দাম টাও বেশ কম।   খুব সকালেই নাশ্তা সেরেই বের হই। জার্মানিতে এসে আমি বেশ বেকায়দায় পড়লাম। চোখ নাক দিয়ে পানি ঝরছে। ঠাণ্ডা বাতাশ । অবশ্য পরে জার্মানিতে যে কয়বার গিয়েছি, বেশ ভালোই কেটেছে।

বার্লিন টাওয়ার, জার্মানি

বার্লিন টাওয়ার, জার্মানি

বাড়ি ফেরা

তারুণ্যের একটা সুবিধা হচ্ছে, ইচ্ছেমত পাগলামো আর স্বপ্ন দেখা যায়। আহা, মানুষের কতো বিচিত্র স্বপ্ন থাকে! এসব ছোট ছোট স্বপ্ন আর অভিজ্ঞতা নিয়েই তো জীবন।  ইউরোপ থাকার সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে, যখন যেখানে খুশি ভ্রমন করা যায়।

আমরা রাতে বার্লিন থেকে নেদারল্যান্ড ফিরছি। ইউরো লাইন।,পুরো বাসে আমরা সাতজন।আর কেউ নেই। খুব ভোরেই আমরা নেদারল্যান্ডে পৌছাই। ট্রেনে করে বাসায় ফিরছি।জানালার পাশে বশে ভাবছি…গানে ডুব দিতেই চোখ বুঝে আসছে…

“অনন্ত ঐ আকাশের বুকে আমি আজ দিলাম লিখে

আমার ভালবাসার সাতকাহন,

বন্ধু প্রিয় তুমি বুঝে নিও এ হৃদয়ের না বলা কথন

আমার ভালবাসার সাতকাহন”।

বাসায় ফিরতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। ক্লান্তি লাগছে।

ব্রাসেলস। ৮ মার্চ, ২০১৭।

(ফ্লিক্স বাস, স্টুডেন্ট এজেঞ্চি, ইউরো লাইনসহ অনেক বাস নানা অফার দেয়।  খুব কম খরচে বাসে পাশাপাশি অনেক দেশে যাওয়া যায়। ভ্রমনে আগ্রহী কেউ নিচের লিঙ্ক দেখতে পারেন)।

https://www.youtube.com/watch?v=R7vmHGAshi8&feature=youtu.be

https://www.facebook.com/ELLEDECORmag/videos/10154072402521710/?pnref=story