আমরা ছাত্র, কেমন ছাত্র?
ইউসুফ দিনার
মাস্টার্স ইন কম্পিউটেশনাল মেকানিক্স
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ মিউনিখ

আমরা যারা বাইরে পড়াশুনা করি কমবেশি সবাই কিছু কমন প্রশ্নের সমক্ষীন হই। যেমন বিদেশের পড়াশুনা কি অনেক কঠিন। অন্য প্রশ্নগুলার মধ্যে থাকে ফিউচার কেমন, অন্যদেশে জব নিয়ে যেতে পারব কি ইত্যাদি। এইখানে কিছু ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া জরুরি। একটা হল কঠিন ব্যাপারটা আপেক্ষিক। একটা ব্যাপার কখন কঠিন হয়ে যায় আমাদের সেইটা বুঝতে হবে। দ্বিতীয়ত ফিউচার ফিউচার বলে তুবড়ি ছড়ালেই ফিউচার হাতে ধরা দেবে না। এইটার জন্যে রাতদিন কাজ করতে হবে। আপনি যদি আপনার স্বকর্মের জবাব দিতে না পারেন, ভালবোধ না করেন তবে বুঝবেন আপনি বাস্তবতা থেকে দূরে অবস্থান করতেছেন।

দেশ থেকে যখন একটা ছেলে বিদেশের পথে পা বাড়ায় কেউই শুধু পাশ করে যাব চিন্তা করে আসে না। দুইচোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে পরিবার ফেলে অজানার পথে পা বাড়ায়। তাদের সবারই মোটিভেশনের লেভেল ঊর্ধ্বে থাকে। পড়াশুনায় ভাল করার ইচ্ছে থাকে। কঠিনকে সহজ করার স্পৃহা থাকে। তাহলে কি এমন ঘটে যে স্বপ্নে ভাটা পড়ে। ধীরে ধীরে পড়াশুনা কঠিন হতে থাকে আর মোড চলে যায়। পরতে বসতে মন চায় না অথবা বই দেখলে জ্বর আসে। একটু খেয়াল করলে এইটার উত্তর পাওয়া যাবে আপনার আগের দিনগুলাতে। আপনি যখন বাবামায়ের কাছে থেকে পরেছেন তাদের হিলিং পাওয়ার আপনাকে উদ্দিপনা দিত। ঘরের খুব একটা কাজ করা হয়ত লাগত না। বাজার করা, রান্না করা তো অনেক পরের ব্যাপার পরীক্ষা আসলেতো অনেকেরা মায়ের হাতে তোলা ভাত না পেলে খাওয়ার সময় সামনেই আসতো না। তার উপর আমাদের চিরচারিত পড়াশুনার ধরণ যেমন পরীক্ষার প্রশ্ন সম্পর্কে ধারনা পাওয়া, আইত্ত করার মত সিলেবাস, গ্রুপ স্টাডি, মিড-টার্ম এক্সাম এবং অনেক অনেক এক্সারসাইজ যা আমাদের একধরণের কনফিডেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করত। তাছাড়া আমাদের সিনিয়র শিক্ষকদের কম টেকনোলজি জ্ঞান আমাদের অনুকূলে কাজ করত। আর অন্যদিকে বিদেশে পরতে আসা একটা ছেলেমেয়ে ভাল পড়াশুনা করলেই হয় না তাকে সব কিছুতে এক্সপার্ট হওয়া লাগে। টাইম ম্যানেজমেন্ট, প্রায়োরিটি সেট করা থেকে শুরু করে রান্না করা, বাজার করা, পরের দিনের পড়া গুছানো সব একা করতে হবে। কেউ পাশে হিলিং করার জন্যে থাকবে না। এইগুলা আস্তে আস্তে একধরণের অবসাদ তৈরি করে। এইটা হওয়া স্বাভাবিক। একই রুটিন আমাদের কর্মদক্ষতা কমিয়ে ফেলতে পারে। এইটার জন্যে দরকার সঠিক জীবন পরিচালনা।

এইখানে একটা জিনিস না বললেই নয় সেইটা হল পাশ্চাত্ত্যের পড়ার ধরণ আমাদের থেকে ভিন্ন। এইখানে ক্লাসে শুধু টপিক ধরা হয় এর বেশি কিছু না। বাকি ছাত্রের দায়িত্ব এইটার কাল মহাকাল খুঁজে খুঁজে পড়া। কোন গাদবাধা সিলেবাস নাই, কোন চৌঠা নাই, কোন আগের বছরের প্রশ্ন নাই। এত্তগুলা নাইয়ের মধ্যের হারায় যাবার আগে বলে রাখি পাশ্চাত্ত্যের স্নাতকের সিলেবাস অনেক সমৃদ্ধ হয় তাই এদের লোকাল ছাত্ররা অনেকখানি বেশি বুঝে, জানে এবং অভিজ্ঞতা রাখে। তারা কোন সময়ই যা তাদের ইনটেরেস্ট না সেইদিকে পা বাড়ায় না। তার মানে হল তারা তাদের পড়ার বিষয়খানি সম্পর্কে ভাল একটা আইডিয়া নিয়ে মাস্টার্স করতে আসে। তাদের ঐ সাবজেক্টগুলাতে ভাসাভাসা না বরং ভাল একটা ধারনা নিয়ে রাখে। এদেশের ছাত্ররা তাদের ক্যারিয়ার গোল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা রাখে তাই তাদের আউটপুট মানে পারফরমান্স ভালর দিকেই থাকে। দেশের ছেলেরা যারা পরিষ্কার ধারনা রাখে না তারা আসার পরে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। একেঅকে জিজ্ঞেস করে যা আরও বিভ্রান্তির কারন হয়ে দাড়ায়। অনেকে অডজব, গুডজব খুঁজতে খুঁজতে সময় নষ্ট করে আর জব পেলে সব কুলাইতে পারে না। এইভাবেই সহজ জিনিশটা কঠিন হয়ে যায়। তখন পড়তে মন বসে না এবং অন্য জিনিসে মন বসতে থাকে। তাহলে আমরা কি করতে পারি?

13900256_10208596141374146_8204782593561614863_n

প্রথম কথা হল আপনি কি জব করবেন নাকি পিএইচডি করবেন সেইটা ঠিক করুন মাস্টার্স শুরুর সময়। যদি জব হয় তাহলে কি ধরনের জব করবেন সেইটা ঠিক করুন। কোম্পানিগুলার চাহিদা দেখুন। সব নানা ওয়েবসাইটে পেয়ে যাবেন। তারপরে আপনার মাস্টার্সের সাবজেক্টগুলিতে ঐ চাহিদা মোতাবেক পড়াশুনা করুন। ভাল ধারনা রাখুন। রেজাল্ট যায় হোক না কেন আইডিয়া যেন পরিষ্কার থাকে। থিসিস ঐ মোতাবেক করবেন এবং অডজব না করে হিভি করেন যা পরে কাজে দেবে। আস্তে আস্তে সহজ জিনিসকে আরও সহজ পাবেন আশা করি। আর জার্মান শিখতে সময় দিন। রাতারাতি হবে না কিন্ত ইচ্ছে থাকলে উপায় হবে বলে রাখলাম। আবার যদি আপনি পিএইচডি করতে চান তবে আপনার জার্মান ভাষা থেকে রেজাল্টের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিৎ বলে জেনে রাখবেন। জার্নাল পাবলিশ করার কথা ভুলবেন না আর প্রফেসরের সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলুন। ন্যাকামি না এদেশের প্রফেসর ক্রিয়েটিভ মাইন্ডকে প্রশংসা করে। দেখবেন কোন কিছু আর কঠিন লাগবে না। এইবার অন্যদিকে দেখি। একগেয়ামিকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করব। নামাজে নিয়মিত হন, ঘরের কাজ করেন, নিজের যত্ন নেন, হালকা আড্ডা ঠিক আছে কিন্ত খেয়াল রাখবেন সেইটা নেশা যেন না হয়, ভালমন্দ রান্না করে খান, বন্ধুর সংখ্যা বাড়ান, পড়াশুনাকে আরও মজার করে নেন। আর হ্যাঁ, ঘোরাঘুরি করে কেও ফকির হইসে এমন নজির নাই তাই ঘুরে দেখতে পারেন উত্তর-দক্ষিণ, পূর্বপশ্চিম সব দিক। আসা করি জীবনের লক্ষ্য পাল্টে যাবে না। মনে রাখবেন মন খারাপ করে বসে থাকলে কেও ভাল করতে আসবে না কিন্ত আপনি একই স্থানে বসে রইবেন। তারচেয়ে ভাল হল সব কষ্ট, একগেয়েমি ঝেড়ে ফেলে উঠে পড়ুন আর সামনের সোনালি দিনগুলুর অপেক্ষা করুন। আসেপাশে অনেকদের অনেক কিছু করতে দেখবেন। ভাববেন না ওইটার বেঁচে থাকার কারন। নফসের ডাকে পড়লে আর উঠা লাগবে না। বিবেককে উবে যেতে দিবেন না তাহলে মানুষ থাকবেন কি করে? আমাদের চিন্তাভাবনা একটু বদলালেই জীবনটা আরও পজিটিভ হয়ে আসবে।

আবার আসি ফিউচার নিয়ে। আপনি যদি পুরু দুইটা বছর পড়াশুনাতে, জার্মান শিখাতে, অভিজ্ঞতা অর্জনে পাশ করে থাকেন তবে ফিউচার ভাল হবে। শুধু ধৈর্য এবং চেষ্টা জারী রাখবেন। একবার না পারিলে দেখ শতবার, প্রবাদটি শুনে থাকবেন। এইবার মেনে নিন। সবাইকে জিজ্ঞেস করলে ফিউচার হাতে আসবে না। ফিউচার আসবে নিষ্ঠা সাথে চেষ্টা করলে। যারা অন্যদেশে জব নিয়ে যেতে পারব কি জিজ্ঞেস করে তাদের বলে রাখা দরকার পৃথিবীর সব দেশেই সব দেশের দক্ষকর্মীর কাজ থাকে। শুধু সঠিক দেশ, সঠিক সুযোগ খুঁজে নিতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই যে, স্বপ্ন দেখার সাথে সাথে আপনি কতখানি সেইটার জন্যে কাজ করতে পারবেন সেইদিকে মননিবেশ করুন। যা আপনার জন্যে সেইটা আপনার জন্যে বারদ্দ আছে। ওইটার জন্যে পরিশ্রম করতে হবে। ভাল থাকবেন।