বলতে দ্বিধা নাই আমার জার্মান লেভেল একদম প্রাথমিক। দুই বছর হল জার্মানিতে আছি তাও জার্মান লেভেল প্রাথমিক!!!! আশ্চর্য হওয়ার মতই। এরকম না জানার একমাত্র কারন জার্মান ভাষা শেখার প্রতি আমার  কোন আগ্রহ নাই, ইচ্ছাও জাগেনা। যদিও আমি জানি মানি বিশ্বাস করি জার্মানিতে টিকে থাকতে হলে জার্মান শেখা অপরিহার্য।

প্রসঙ্গতই আমাকে শুরু থেকেই শুরু করতে হচ্ছে। ভিসা ওয়ার্ল্ড যেই টাকাখেকো এজেঞ্চির মাধ্যমে আমার জার্মানীতে আগমন। ওইখানকার সুভাষিণী (পুং লিঙ্গ কি জানিনা) পরামর্শদাতাদের মধ্য থেকে একজন আমার সাথে জার্মান শিখা নিয়ে তর্ক করতে করতে বলেছিল

“ আরে ভাই একজন অশিক্ষিত লোক দুবাই গিয়া ছয় মাসেই আরবি ভাষা শিখে ফেলে। আর আপনি একজন অনার্স মাস্টার্স করা লোক আপনার জার্মান ভাষা শিখতে ম্যাক্সিমাম চার মাস লাগবে।“

উনার কথা মাঝে মাঝে মনে পরে। হাঁসি পায়। আবার মেজাজও খারাপ হয়। কিছুটা অভদ্র হইতে পারতাম আর যদি শক্তি সামর্থ্য থাকত তাইলে দেশে যাইয়া উনাকে কানপট্টীর নিচে একটা বসাইয়া বলিতাম,

“Entschuldigen! Ich kann immer noch nicht gut Deutsch sprechen”

“দুঃখিত, আমি এখনও ভাল জার্মান বলতে পারি না।”

(উপরের বাক্যটিতে ভুল থাকিতে পারে,  ক্ষমা করবেন)

জার্মানি আসার আগে মনের ভিতর অনেক আশা ছিল প্রেরণা ছিল জার্মান ভাষা শিখার। আসার পর শুরুও করেছিলাম। কিন্তু আর্থিক মানসিক ইচ্ছাশক্তির অভাব আর পারিপার্শ্বিক চাপের কারনে বেশিদূর আগাতে পারিনি। টেনেটুনে এ২ লেবেল।

ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয় আর সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। এই দুটি বাক্য আমার অতীব প্রিয়। যদিও বাক্যদুটি আমার কাছে জানি কিন্তু মানিনা টাইপের হয়ে গেছে। অনেকটা নামাজ পড়ার মত। নামাজ পড়া ফরয এটা জানি কিন্তু পড়তে মন চায়না। সারাদিনের শত ব্যস্ততার মাঝেও অনেক সময় থাকে নামাজ পড়ার জন্য কিন্তু আমরা পড়িনা। জার্মান ভাষা শিখাটাও সে রকমি।

জব ক্লাস রান্নাবান্না করেও সপ্তাহে অনেক সময় থাকে যে সময়টা বাসায় শুয়ে বসে আড্ডা দিয়ে মুভি (ইংলিশ) দেখে নষ্ট করি। হাইস্পিড ইন্টারনেট দিয়ে আজাইরা ইউটিউব ভিডিও দেখি। কিন্তু একবারের জন্যও ইচ্ছা করেনা অভিধান থেকে দুইটা শব্ধ শিখি কিংবা হাজারো ওয়েবসাইট থেকে একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করি যেখানে ফ্রী জার্মান ভাষা শিখা যায় অথবা ইউটিউব থেকে জার্মান ভাষা শিক্ষামূলক দু একটা ভিডিও দেখি। এটা পুরাই ইচ্ছাশক্তির অভাব। আর এজন্যই দুই বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও জার্মান ভাষা একশতাংশও শেখা হয়নাই।

কর্মসূত্রে বুলগেরিয়ান এক জনের সাথে পরিচয়। নাম তার মারটিন। বয়স ২৭। জার্মানি তে আছে ৪ মাস হল। দুই বছরে আমি যতটুকু ভাষা পারি চার মাসেই সে আমার থেকে বেশি পারে। সে পারছে কারন তার প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি আর ভাষা শিখার প্রতি আগ্রহ। যেটা আমার মাঝে নেই থাকলেও সুপ্ত অবস্থায় আছে। আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। মজার ব্যাপার হল ইদানিং মাঝে মাঝে মারটিন বাংলায় দু একটা শব্দ বলে। যে শব্দ গুলা আমাদের কাছ থেকে শোনা অথবা আমাদের কাছ থেকে জেনে নেয়া । মজা পাই যখন সে বলে “ তুমি কেমন আছ?? তাড়াতাড়ি, তুমি কি নতুন…ইত্যাদি ”।  ভাষা শিখার প্রতি তার চরম আগ্রহ। সে একাদারে স্প্যানিশ ইংলিশ ফ্রেঞ্চ অ্যান্ড তার নিজের মাতৃভাষায় পারদর্শী। জার্মান ভাষা ভালই শিখছে বলে মনে হয়। আমার বিশ্বাস মাস তিনেক পরেই অনর্গল জার্মান বলতে পারবে। মারটিন কে দেখে মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় আমিও শুরু করি। নাড়াচাড়া দিয়ে উঠি।

কথায় আছে নিয়ত আমল বরকত, সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।

জার্মান ভাষার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এটা আমরা সবাই জানি। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কাজেই সব জায়গাতে দরকার হয়। জব মার্কেট থেকে শুরু করে সুপার মার্কেট সব জায়গাতেই।

১। প্রথমেই কিছু অভিজ্ঞতা বলি, তীক্ত অভিজ্ঞতা। বয়স ৩ মাস ( জার্মানি আসার)। অনেক শখ করে সুপার মার্কেট থেকে এক প্যাকেট কেইক নিয়া আসলাম। প্যাকেটের গায়ে  কেইকের একটা ছবি। দেখতে অনেকটা দেশিও কেইক যেটা বাংলাদেশের টং দোকানে পাওয়া যায়। আমি নিশ্চিত ছিলাম অনেক স্বাদের কেইক। প্যাকেটের গায়ে চোখ বুলিয়ে ছিলাম টিকি কিন্তু আগামাথা কিছুই বু্ঝি নাই। কিনে আনার পর বাসায় এসে আবেগ আপ্লুত হয়ে প্যাকেটখানা খুলেই আমার চোখ চড়ক গাছ। ওমা! এ দেখি কেক বানানুর পাউডার। আমার কষ্ট আর দেখে কে।

২। প্রিয়তমেশুকে কিছু প্রসাধনী পাঠানোর অভিপ্রায় হইল। রসমান DM ঘুরিয়া ফিরিয়া কিছু প্রসাধনী কিনিলাম। এক ভাই এর মাধ্যমে পাঠাইলাম। প্রিয়তমার হাতে প্যাকেট যাওয়ার পর বুঝিতে পারিলাম শ্যাম্পু একটাও দেইনি সব শাওয়ার-জেল।

৩। জার্মানির প্রথম কর্মস্থল ছিল একটা আইস ক্যাফে তে। দুই দিনের বেশি টিকিতে পারিনাই। আমাকে যাহা করিতে বলিত তাহা আমি না বুঝিয়া অন্য কিছু বুঝিতাম। মালিক সাহেব আমাকে ভদ্রতার সহিত কাজ থেকে বাদ দিলেন।

৪। ইউনিভার্সিটির ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম এর দিন আমাদের সম্মানিত শিক্ষকমহোদয় কি কি উপদেশ আদেশ দিয়েছিলেন তার আগামাথা কিচ্ছু বুঝিতে পারিনাই। হাত তালি অবশ্য বাংলায় আর ইংলিশে দিয়ে ছিল । তাই ওইটুকু বুঝিতে পেরেছিলাম।

এই রকম উদাহারণ আরও অনেক আছে। পদে পদে ঠেকে ঠেকে পার করেছি দুই বছর। কিন্তু এখনও জার্মান ভাষা শুনলে বোকার মত তাকিয়া থাকিতে হয়। কারো সাথে আলাপচারিতা করতে গেলে প্রথমেই বলি Sprechen Sie English? অনেকের কাছ থেকে হ্যাঁ শব্দটা শুনি কিন্তু বেশির ভাগ সময় না শুনতে হয়।

নির্দিষ্ট কিছু বাক্য ছাড়া এখনও তেমন কিছু জার্মান ভাষায় ঘোছাইয়া বলিতে পারিনা। জার্মান শেখা এজন্যই জরুরি। আমি সব সময় খুব আশাবাদী। আশাকরি আমার উপলব্ধি আমার মনের ভিতরটাকে নাড়া দিবে। সে নাড়ানোর তাড়নায় উদ্দীপ্ত হয়ে আমারও জার্মান ভাষা শিখার আগ্রহ বাড়বে যেমনটা আমি দেখি বুলগেরিয়ান মারটিন এর চোখে। আমি আপনাদের সকলের দোআ প্রত্যাশী।

বিঃ দ্রঃ বাংলা আমার মায়ের ভাষা। ৫২র ভাষা আন্দোলন কে  যতাযত সম্মান প্রদর্শন পুর্বক জানাতে চাচ্ছি যে , উপরের লেখাটিতে বানান ভুল সহ সাধু চলিত ভাষার ব্যাপক অনিয়ম রয়েছে। আশা করি ক্ষমার চোখে দেখবেন।

 

মোঃ সাজ্জাদুর রহমান (সাজু)

এসেন,  জার্মানি